নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষককে মনোযোগী হতে হবে

18

বাবুল কান্তি দাশ

মানুষ যে নিয়মনীতি আদর্শের আদলে গড়া পুতুল নয়, তার যে বোধবুদ্ধির বিকাশ ও বৈচিত্র্য আছে তার প্রমাণ- মানুষের জীবনে এল প্রগতি, আত্মা হল উন্নত, বিবেক হল প্রবল, সংস্কৃতি পেল উৎকর্ষ। এর মূলে কিন্তু সুশিক্ষার আলোকবত্মিকা। ফলশ্রুতিতে মানুষ বহুযুগের অভ্যস্ত নিয়মনীতি ও মূল্যবোধ ভেঙে চুরমাচুর করে দিতে চায়, যা মানতে নারাজ তথাকথিত সনাতনপন্থীরা। তাদের নিকট এরা বেয়ারা অসভ্য। এদের সাথে তাল মেলাচ্ছে যাদের স্বার্থে ঘা লাগছে সেসকল স্বার্থপর নির্লজ্জ বেহায়ারা। আধুনিক মননের মানুষের শিক্ষায় চক্ষুষ্মান হওয়া এদের নিকট চক্ষুশূল। এসকল উন্নত চেতনার মুক্ত বুদ্ধির মানুষদের দাবিয়ে রাখতে বিভিন্ন অপকৌশলের আশ্রয় নেয়। নোতুনকে মেনে না নেওয়ার কুপ্রবৃত্তি তা’দের মাথায় যক্ষের ধনের মতো সেঁটে আছে। তারা চায় না নবচেতনার অভিঘাতে তাদের সনাতনী ধ্যান ধারণা বিপর্যস্ত হোক। পুরানো মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে নতুনদের সাথে তাল মেলাতে, সভ্যতার চাকাকে সচল রাখতে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যেন খাপ খাওয়াতে পারে তার রসদ যোগাতে। স্নেহ মায়া মমতা ভালোবাসায় নতুনদের এগিয়ে দিতে হবে অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে।কিশোরকবি সুকান্তের ভাষায়- এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্হান। নতুনকে বরণ করতে হবে। সনাতনী চেতনায় সমৃদ্ধ যারা তারা সহজে এই নতুনকে সহজে গ্রহণ করতে পারে না। তবে পর্যায়ক্রমে তারাও এটা রপ্ত করেন। নতুবা পিছিয়ে থাকতে হয় যে। একসময় হাতল ঘুরিয়ে ফোন করা হতো। এখন স্ক্রিনে স্পর্শ করে তা করছি। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে নতুনরা অনেক অপবাদ সহ্য করেছে, ঐসময় যারা এই অপবাদ দিত এখন তারা এদের তুলনায় অনেক বেশি আসক্ত। ঠিক একইভাবে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে কারো কারো আপত্তি থাকতে পারে। দেখা যাবে ক্রমশ এই আপত্তি দূরীভূত হবে সম্যক ধারণায়। নতুন শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য নিয়ে আমরা যত না ভাবছি তারচেয়ে বেশী প্রাধান্য দিচ্ছি এর উপায়কে। উপায় আর লক্ষ্য যে এক জিনিস নয় তা বোধে আনতে অপারগ অনেকেই। শুধু অভিভাবক নয় শিক্ষকও এর মর্মমূলে প্রবিষ্ট হতে পারছে না বোধের সীমাবদ্ধতাজনিত কারণে। প্রতিনিয়ত জগৎসংসার পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময় যা ছিল আদরনীয় এখন তা বর্জনের খাতায়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানোর লক্ষ্যে নতুনের আগমন। মেনে নিতে হবে, মনে নিতে হবে নাহয় সময় আমাদের প্রত্যাখ্যান করবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন শিক্ষাক্রমের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে যা পর্যায়ক্রমে কাটিয়ে উঠা যাবে। বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে তার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে হবে। অন্যথায় যা হবে তা হয়ত চিলে কান নিয়েছে ধরনের নতুবা ধোঁয়াশা চেতনার অপরিপক্ক ধরনের। নতুন শিক্ষাক্রমে অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। অভিজ্ঞতামূলক শিক্ষার ধারণাটি অভিনব এবং পৃথিবীর খুব অল্পসংখ্যক দেশেই এটি চালু রয়েছে। এই শিক্ষাক্রম এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থী বাস্তব জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে এবং অর্জিত শিক্ষাকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারে। শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান অভিজ্ঞতা বাস্তবতায় যেন পর্যবসিত হয়। তা যেন তথাকথিত সনদপত্রের কলাপাতা সদৃশ না হয়। নতুন শিক্ষাক্রমে শিখনকালীন মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার্থী কতটুকু শিখল, তা নিয়মিত ক্লাসে যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীর দুর্বলতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে। এই সহযোগিতার কাজটি করবেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা বিষয়-সংশ্লিষ্ট যে কোনো ব্যক্তি। শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সহযোগিতার কারণে অনেকে মনে করছেন, এতে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা নষ্ট হবে, পড়াশোনার আগ্রহ কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঠিক উল্টো ঘটছে। শ্রেণিকক্ষে এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষার আনন্দময় পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখতে চাওয়ার আগ্রহও বাড়ছে। প্রতিযোগিতা হচ্ছে নিজের সাথে সবার সহযোগিতায়। নতুন শিক্ষাক্রমে শিখন-শেখানো প্রক্রিয়াটি হলো অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী যেকোনো যোগ্যতা অর্জন করতে হলে তা চারপাশের বিভিন্ন ব্যাক্তি (সহপাঠী, অভিভাবক, শিক্ষক,
এলাকার লোকজন) ও উৎস (পাঠ্যবই, অন্যান্য বই, ওয়েবসাইট, প্রকৃতি, সামাজিক পরিবেশ) থেকে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করবে এবং তা দলে আলোচনার মাধ্যমে বিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণ করে তার পারিপার্শ্বিক জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখবে। এরপরে সে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে প্রয়োগ করার জন্য দলীয় ও এককভাবে দৈনন্দিন জীবনের কোনো চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করে সমাধানের পরিকল্পনা করবে এবং তা প্রয়োগ করে দেখার চেষ্টা করবে। এর ফলে আগের মতো একেবারে মুখস্থনির্ভর খÐিত শিক্ষার বদলে জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীর সার্বিক শিখন হবে। চালুকৃত নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে কতিপয় লোকজনের মধ্যে যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে তা নিরসনে সকলকে সংঘবদ্ধ প্রয়াসী হতে হবে। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রচার, সভা, প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। সক্রিয় থাকতে হবে বিরুদ্ধাচরণকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ তথ্য উপাত্ত যুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে। দায়সারা গোছের কাজ করলে শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়বে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বৈত ভাবনার উদ্রেক ঘটলে তাদের শিক্ষাজীবন তমসাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। অভিভাবকদের মধ্যে যাতে করে নেতিবাচক ভাবনার জন্ম না নেয় সেবিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে। শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থায় আনতে হবে। নতুন শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়নে শিক্ষক মেরুদন্ড। শিক্ষকদের ধারণা স্বচ্ছ না হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নিঃসন্দেহে। প্রেক্ষাপটনির্ভর অভিজ্ঞতা, প্রতিফলন মূলক পর্যবেক্ষণ, বিমূর্ত ধারণায়ন ও সক্রিয় পরীক্ষণ শ্রেণি কার্যক্রমের এই চারটি ধাপ না বুঝে ক্লাস নেওয়া সম্ভব নয়। প্রক্রিয়াটি আসলে জটিল কিছু নয়, কিন্তু পরিভাষাগত জটিলতার কারণে শিক্ষকেরা সহজ ব্যাপারটিও জটিল করে ভাবছেন। অভিভাবকদের অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, ভাত রান্না করা শিখতে স্কুলে যেতে হবে কেন? প্রতিদিন অ্যাসাইনমেন্টের নামে এত টাকা খরচ করাবে কেন? তথ্য অনুসন্ধানের কাজে শিক্ষার্থীদের মুঠোফোননির্ভরতা বাড়াবে কেন? বাড়ির কাজ হিসেবে কেন দলগত কাজ দেওয়া হবে? এ রকম অনেক প্রশ্ন শিক্ষার্থীকেও দ্বিধায় ফেলে দিচ্ছে-আসলে পড়াশোনা কি ঠিকমতো হচ্ছে? পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে কি না, এর উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ, শিক্ষকেরা যদি শ্রেণি-কার্যক্রম বুঝে উঠতে না পারেন, তবে হবে না। নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পর দেখা যাচ্ছে, মাধ্যমিকে এখন গড়ে ৩৮ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। তবে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এই অনুপাত আরও বেশি। সেখানে গড়ে ৫২ শিক্ষার্থীকে পড়ান একজন শিক্ষক। শুধু তা-ই নয়, কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একেকটি শ্রেণিকক্ষে ৬০ থেকে ৭০ শিক্ষার্থী নিয়েও শিক্ষকদের ক্লাস করতে হয়। অথচ ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মধ্যে মাধ্যমিকে গড়ে প্রতি ৩০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষকের ব্যবস্থা করার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। প্রাথমিকেও গড়ে ৩৮ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। প্রাথমিকে এখনো শিক্ষকের ৩৮ হাজার পদ শূন্য। এনসিটিবি এক সমীক্ষায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যে চিত্র তুলে ধরেছে, তাতে দেখা যায়, যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম থাকা সিঙ্গাপুরে গড়ে ১২ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। মালয়েশিয়ায়ও একই চিত্র। থাইল্যান্ডে গড়ে ২৪ শিক্ষার্থীর জন্য একজন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৫ শিক্ষার্থীর জন্য একজন, কম্বোডিয়ায় ২৯ শিক্ষার্থীর জন্য একজন, অস্ট্রেলিয়ায় ৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন, ফিনল্যান্ডে গড়ে ১৩ শিক্ষার্থীর জন্য একজন এবং ডেনমার্কে ১১ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর শিক্ষায় বিশ্বসেরা হিসেবে স্বীকৃত। সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়। স্কটল্যান্ডে শিখন পরিবেশকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফিনল্যান্ডে শিখনের ক্ষেত্রে গঠনকালীন মূল্যায়নকে গুরুত্ব দেয়। শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে পরীক্ষাভীতি বা মানসিক চাপ কমাতে পাবলিক পরীক্ষার গুরুত্ব কম। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করতে হলে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে একটি পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে স্বতন্ত্রভাবে বিবেচনায় নিয়ে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ কম শিক্ষার্থীকেই শিখিয়ে ওপরের ক্লাসে পাঠানোর কথা। কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাতে এত ফারাক রেখে এটি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন উঠেছে। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রম নিঃসন্দেহে ভালো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা দরকার, তাতে এখনো ঘাটতি রয়েছে। তাই নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত শিক্ষকের ব্যবস্থা যেমন করতে হবে, তেমনি তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত উপকরণের ব্যবস্থাও নিতে হবে। নইলে সমস্যাটি থেকে যাবে। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে সকলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যারা এবিষয়ে ওয়াকিবহাল তারা যেমন মতামত দিচ্ছে একইভাবে অন্য একটি দল যাদের এবিষয়ে সম্যক ধারণা নেই তারাও মতামত দিচ্ছেন। মাধ্যমিক পর্যায়ে ২০২৩ সালে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু করা হয়েছে, ২০২৪ সালে অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে এই কার্যক্রম চালু করা হবে। ইতোমধ্যে এর প্রচার প্রসারে যেমন কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তেমনি এর অপপ্রচারে নিযুক্ত রয়েছে একটি শ্রেণি। ফলতঃ অভিভাবকেরা হচ্ছেন বিব্রত ও বিভ্রান্ত। বিশেষত প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং সেন্টার এবং নোট গাইড বই ব্যবসায়ীরা একাজে নিযুক্ত বলে খোদ শিক্ষামন্ত্রীও বিভিন্ন সভা সমাবেশে উল্লেখ করেছেন। প্রাইভেট টিউশনি ও কোচিং সেন্টার এবং নোট গাইড ব্যবসায়ীদের অদৃশ্য বিরোধিতার কারণে ১২ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন। ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে শিক্ষা আইন করার কথা বলা হয়েছে। এটি না হওয়ায় শিক্ষানীতির অনেক বিষয়ই বাস্তবায়ন হয়নি। আবার প্রাইভেট টিউশন কোচিং সেন্টার এবং নোট গাইড বই ব্যবসায় লাগাম টানার কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি। দেশের অধিকাংশ নাগরিক শিক্ষাবিদ শিক্ষক অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা নোট গাইড বই ও কোচিং বানিজ্যের লাগাম টানতে চান।
শিক্ষাবানিজ্য স্থায়ীভাবে রোধ করতে চান।তারা শিক্ষার্থীদের শতভাগ সৃজনশীল বিষয়ের উপর নির্ভরশীল করাতে চান। নতুন শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়নে শিক্ষার্থী শিক্ষক অনুপাত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে এবিষয়ে একটি পরিপত্র দেওয়া হয়েছে। প্রতি শাখায় ৫৫ জনের অধিক ভর্তি হতে পারবে না এবং নতুনভাবে কোনো শাখা খোলা যাবে না। পরিতাপের বিষয় এটিও সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কিনা। এবিষয়েও ইতোমধ্যে সোরগোল শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তে অটল না থাকলে তাও ভেস্তে যাওয়ার সমুদয় সম্ভাবনা বিদ্যমান। আমরা দেখেছি কোনো অদৃশ্য কারণে নিজ নিজ বিদ্যালয়ে প্রশ্নপত্র প্রণয়নের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত নির্দ্দিষ্টকরণ, শিক্ষা আইন বাস্তবায়ন, শিক্ষক স্থানান্তরকরণসহ বহু বিষয় মাঝপথে হোঁচট খেয়েছে। আমরা চাই না নতুন শিক্ষাক্রম কার্যক্রম ব্যাহত হোক। ইতোপূর্বে সৃজনশীল প্রশ্নপত্র নিয়েও বিরোধিতা হয়েছিল তা পর্যায়ক্রমে নিরসন হয়েছে। এখনও হচ্ছে হবে এবং তাও একপর্যায়ে বোধে এসে নিরসন হবে। আগামী ২০২৪ সাল থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের যে দুই শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে তা হচ্ছে অষ্টম ও নবম। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে এবং এনসিটিবির নতুন বই এর সূচী যা দেখলাম তাতে করে মনে হচ্ছে নবম শ্রেণির পাঠ্যবইসমূহে বিজ্ঞান গণিতের গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে। পদার্থ রসায়ন জীব বিজ্ঞান বিষয় কোনো গ্রুপ বিভাজন থাকবে না সবাই একই বই পড়বে। বর্তমানে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে যেরকম দশটি বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে ঠিক একই নামে ঐ দশটি বিষয়ই পড়তে হবে। এক্ষেত্রে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্বের বিজ্ঞান মানবিক ব্যবসায় শিক্ষাকে একীভূত করতে গিয়ে বিজ্ঞানের সহজীকরণ নিয়ে কেউ কেউ (বরেণ্য শিক্ষাবিদরা) দ্বিমত পোষণ করছেন। তাঁদের অভিমত যে লেখাপড়া করে শেখামাত্রই দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করা যায় সেটা হচ্ছে স্কিল, জ্ঞান নয়। গণিতের তো সরাসরি প্রয়োগ নেই তাহলে কি গণিত বাদ দিতে হবে? উচ্চতর গণিত কি সেজন্যই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে! গণিত উচ্চতর গণিত মেধা বিকাশের চর্চায় যে অবদান রাখে তার কোনো গবেষণা আমাদের দেখা হয় না। তবে সাধারণ দৃষ্টিতেও কিন্তু বুঝা যায় যার গাণিতিক জ্ঞান বেশি তাকে যেখানেই দেওয়া হয় সেখানেই সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। গণিত এমন একটি বিষয় যার অনুশীলনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সরাসরি প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। যখন শিক্ষার্থী সমস্যার সফল সমাধান করতে সক্ষম হয় তখন তার মধ্যে আনন্দের উদ্রেক ঘটায় যা শিক্ষার্থীর মেধার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এবং শেখা ও অনুশীলনে আরো যত্নবান হয়ে উঠে। এখানে আরো উল্লেখযোগ্য যে বিজ্ঞানকে একীভূত করতে গিয়ে পদার্থ রসায় জীববিজ্ঞানকে তরলীকৃত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে এসছে। যদি তা হয় তা ভেবে দরকার বলে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। একটি দেশের মেইন স্ট্রিম শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো সুদুরপ্রসারি লাভ। ভবিষ্যতে বড় লাভের প্রস্তুতি হতে হয় স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলের শিক্ষায়। আর স্বল্পমেয়াদী লাভের বা যে লেখাপড়া শিখেই কাজে লাগানো যায় সেটাকে বলে কারিগরি বা ভোকেশনাল শিক্ষা। এমনই একটি দেশের শিক্ষার স্তরকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন জার্মানির মেইন স্ট্রিম শিক্ষাকে বলে জিমনাসিয়াম। কারণ এই শিক্ষাটা ব্রেইন স্টর্মিং। এই শিক্ষা সুদুরপ্রসারী। যে শিক্ষায় আইনস্টাইন, ম্যাক্স প্যাং গোদেল, হাইজেনবার্গ তৈরী হয়েছিল। সমাজের একটি শ্রেণির জন্য কারিগরি শিক্ষার একটি ধারা অবশ্যই থাকতে হবে। এবং তাদের জন্য উচ্চ শিক্ষার দ্বারও উন্মুক্ত রাখতে হবে। যার যখন ইচ্ছে তখন যেনো তার কাঙ্খিত উচ্চ শিক্ষা নিতে পারেন। সেটিও আমাদের দেশে ততবেশী সহজলভ্য নয় বলতে গেলে তার দ্বারও রূদ্ধ। এটিও সত্য যে, সবাই যেমন কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করবেন না তেমন উচ্চ শিক্ষাও। তবে সবার জন্যই সব দ্বার উন্মুক্ত রাখতে হবে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ব্যতিরেক। যেহেতু নতুন শিক্ষাক্রম পরীক্ষামূলক সেহেতু এর পরিবর্তন পরিবর্ধন ও পরিমার্জন এর সুযোগ রয়েছে।
মাঠ পর্যায় থেকে সুবিধা অসুবিধা এবং ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া আমলে নিয়ে কার্যকর ব্যবস্হা নেয়া যৌক্তিক বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। যত্ন ও ভালোবাসায় অনেক অযোগ্যও যোগ্য হয়ে উঠেন। শিক্ষা যেন হয়ে উঠে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এতে যেন কোনো চালাকি না থাকে। এখানে এও উল্লেখ্য যে ষান্মাসিক সামষ্টিক মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ততা নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে আশাব্যঞ্জক। সবকিছুই নির্ভর করে যতœ সেবা পরিচর্যা ও ভালোবাসার উপর। এমনতরো চেতনায় যদি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলে যতœবান হন তাহলে কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণে সক্ষম হবো নিঃসন্দেহে। এ পর্যন্ত নতুন শিক্ষাক্রমকে শিক্ষার্থীরা খুব ভালোভাবে নিয়েছে। তারা অভ্যস্ত হচ্ছে। অধিকাংশ শিক্ষকও ইতিবাচক। কিন্তু শিক্ষকরা মনে করেন, কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। তন্মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাপোকরণ, শিক্ষকদের আর্থসামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক যেন শিক্ষার্থী এবং শ্রেণী কক্ষ কেন্দ্রিক হয়, তাঁদের মধ্যে যেন অন্যকিছু ভর না করে। নিশ্চিন্ত মনে শিক্ষার্থীদের বিকাশ ও বর্দ্ধনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারে। একটা কথা আছে- খালি পেটে ধর্ম হয় না।
লেখক: প্রাবন্ধিক