নতুন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি এবং ইরানের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি

11

রতন কুমার তুরী
পারমাণবিক বোমা এবং পরমাণু অস্ত্র বানানো এবং পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষক বিষয়ে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের।
এখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বলবদ রেখেছে। অন্যদিকে ইরানও দমবারপাত্র নয় তারাও সমানে পারমাণবিক বিষয়ে সকল কাজ অব্যাহত রেখেছে। শোনা যায় ইসলামি বিশ্বে ইরানই একমাত্র দেশ যাারা পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর একেবারে শেষপ্রান্তে চলে এসেছে এমনতাবস্থায় দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিষিদ্ধ ইব্রাহিম রাইসি প্রেসিডেন্ট হওয়া বেশ গুরুত্ব বহন করে। এক্ষেত্রে বর্ডমানে দেশ পররাষ্ট্রনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কীভাবে নির্ধারিত হবে তা এই এমুহূর্তে বলা মুশকিল হলেও ইব্রাহিম রাইসি যে যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দসহ প্রেসিডেন্ট হবেননা তা বলাই যায়। প্রকৃতপক্ষে ইরানের ‘প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে ৬২ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন ইব্রাহিম রাইসি। তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন পরাজিত প্রার্থীরা। শনিবার তার বিজয়ের খবর প্রকাশ করে তেহরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। দেশটির রাজনীতিতে তার পরিচয় একজন কট্টরপন্থী নেতা হিসেবে। বিচারপতি থেকে দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তিনি।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাইসি ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান এবং তার মতাদর্শ অতি রক্ষণশীল। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং অতীতে রাজনৈতিক বন্দিদের মৃত্যুদন্ডের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল। তবে সুপ্রিম নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি রাষ্ট্রীয় বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন।
৬০ বছর বয়সী ইব্রাহিম রাইসি তার কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে কাজ করেছেন। তাকে ২০১৯ সালে বিচার বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর দুবছর আগে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি হাসান রুহানির কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হন।
১৯৮০ এর দশকে রাজনৈতিক বন্দিদের যেভাবে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে তাতে রাইসির ভূমিকা নিয়ে বহু ইরানি এবং মানবাধিকার কর্মী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইরান কখনো এই গণ মৃত্যুদন্ডের কথা স্বীকার করেনি। রাইসির ভূমিকা নিয়ে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে সে বিষয়ে তিনি কখনো কিছু বলেননি।
মনে করা হচ্ছে, রাইসির অধীনে কট্টরপন্থীরা ইসলামি অনুশাসন মেনে সরকার পরিচালনার ব্যাপারে আরও কঠোর হবেন। যার অর্থ সামাজিক কার্যক্রমের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ, নারীদের কর্মসংস্থান ও স্বাধীনতা কমে যাওয়া এবং সংবাদমাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি ও রাইসির জন্ম একই স্থানে; দেশটির উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে। খামেনির মতো না হলেও দেশটির সংখ্যাগুরু শিয়া সম্প্রদায়ের কট্টরপন্থিমহলে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক।
কট্টরপন্থীরা পশ্চিমাদের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করলেও রাইসি এবং সর্বোচ্চ নেতা খামেনি উভয়েই পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে ফিরে যেতে আগ্রহী বলে ধারণা করা হয়।
গত শুক্রবার এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৫ কোটি ৯ লাখ ভোটারের মধ্যে এ নির্বাচনে ২ কোটি ৮ লাখ ভোটার তাদের ভোট দেন। রাইসি ১ কোটি ৭ লাখ ৮০ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রেজায়ী পেয়েছেন ৩৩ লাখ ভোট। আর আরেক প্রতিদ্ব›দ্বী হিম্মতি পেয়েছেন মাত্র ২৪ লাখ ভোট।
এর আগে বিভিন্ন জরিপে ইব্রাহিম রাইসিই এগিয়ে ছিলেন। কারণ আহমেদিনিজাদের মতো শক্তিশালী প্রার্থীরা আগেই প্রার্থী তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। ইরানের এবারের নির্বাচনে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছেন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ইব্রাহিম রাইসি। বিভিন্ন জরিপে তিনিই এগিয়ে ছিলেন। যার ফলে ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজিত হওয়া ইব্রাহিম রাইসিই বিশ্বমিডিয়ায় ব্যাপকভাবে আলোচিত এক ব্যক্তি।
নির্বাচনের আগে ইরানের বিভিন্ন রাস্তায় দেখা যাচ্ছে তার ব্যানার ফেস্টুন। প্রকৃতপক্ষে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত ইব্রাহিম রাইসি ইরানের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ৬০ বছর বয়সী রাইসি বর্তমানে দেশটির ক্ষমতাসীন সরকারের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচনী দৌড়ে শামিল হয়েছেন তিনি। এর আগে ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও একবার ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন, ওই সময় তিনি হাসান রুহানির কাছে পরাজিত হন।
ইরানের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা খামেনি এবং রাইসির জন্ম একই স্থানে, দেশটির উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে। খামেনির মতো না হলেও দেশটির সংখ্যাগুরু শিয়া সম্প্রদায়ের কট্টরপন্থিমহলে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক।
খামেনির মতো রাইসিরও দাবি, বিশ্বনবী হযরত মুহম্মদ (সঃ)-এর বংশধর তিনি। বিশ্বনবীর রক্তসম্পর্কিত উত্তরাধিকার হওয়ার কারণে সবসময় কালো রঙের পাগড়ি পরেন তিনি।
তবে ইরানের গণতন্ত্রপন্থি বলয়ে তার জনপ্রিয়তা বেশ কম। কারণ, আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় দেশটিতে তৎপর হয়ে উঠেছিলেন গণতন্ত্রপন্থিরা, যারা ক্ষমতাসীন ইসলামী কট্টরপন্থি সরকারের বিরোধী। যুদ্ধ শেষে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার কারণে শত শত গণতন্ত্রপন্থিকে গ্রেফতার করা হয় এবং তেহরানের রেভ্যুলুশনারি আদালত সংক্ষিপ্ত বিচারকাজের পরই তাদের অধিকাংশকে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়। সে সময় রেভ্যুলুশনারি আদালতের প্রধান বিচারক ছিলেন রাইসি।
ওই বিচার প্রক্রিয়ার পরই খামেনির আস্থাভাজন হিসেবে হিসেবে উত্থান ঘটে তার।
২০১৯ সালে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্থা আস্তান কুদস রাজাভি ফাউন্ডেশনের প্রধান হিসেবে রাইসিকে নিয়োগ দেন খামেনি। ইরানের শিয়া মুসলিমদের কাছে পবিত্র তীর্থ বলে বিবেচিত ইমাম রেজার মাজারের রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দাতব্য কার্যক্রম ও দেশের অধিকাংশ কোম্পানি পরিচালনাও করে থাকে এই ফাউন্ডেশন।
তিন বছর মোটামুটি সফলভাবে আস্তান কুদস রাজাভি ফাউন্ডেনের নেতৃত্ব দেওয়ার পর ২০১৯ সালে তাকে বিচার বিভাগের প্রধান পদে নিয়োগ দেন খামেনি। এ পদে থাকার সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় দেশের অভ্যন্তরে জনপ্রিয়তা কিছুটা বাড়ে তার।
নিজেকে ‘দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অভিজাতদের’ ঘোর বিরোধী হিসেবে প্রকাশ করা রাইসি রাজনৈতিক দিক থেকে শিয়া ইসলামি কট্টরপন্থার সমর্থক। দেশের গণতন্ত্রপন্থিদের পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য দেশগুলোরও কঠোর সমালোচক। তবে সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি প্রায় পঙ্গু হয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের বিষয়ে সুর নরম করেছেন তিনি।
ইরানের রাজনীতি ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলী রেজা ইশরাঘি দেশটির সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রসঙ্গে ‘ফরেন রিলেশনস’ সাময়িকীতে লিখেছেন, ‘এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইরানের রাজনীতিতে নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশটির গণতন্ত্রপন্থিদের সঙ্গে রক্ষণশীলদের দ্ব›দ্ব নতুনমাত্রা পাবে।’ তবে ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহীম রাইসি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি তার রক্ষনশীল মনোভাব কমিয়ে দেশের সবদলের সাথে কাজ করতে পারলে এবং মেধা এবং বুদ্ধি খাটিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমÐলে ইরানকে তুলে ধরতে পারলেই কেবল দেশটি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে বের হয়ে একটি শক্তিশালি অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে বের হয়ে আসতে পারবে সেক্ষেত্র দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনীরও সহযোগিতার তার বিশেষভাবে প্রয়োজন হতে পারে।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক