নগরী ডোবার পর বোধোদয় চসিক-সিডিএ’র

37

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত ছয়দিন ধরে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। জলাবদ্ধতা নিরসনে ১০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ (৭২ শতাংশ), সিটি করপোরেশন (১৩ শতাংশ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (১৫ শতাংশ)। দুই বছরে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়ে গেলেও বর্ষায় জলাবদ্ধতা কোনো অংশে কমছে না। বরঞ্চ এবার নতুন নতুন এলাকা পানিতে ডুবেছে। আবার জমে থাকা পানি নামছে ধীরে। এর পেছনে কারণ অনুসন্ধান ও জরুরি ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জলাবদ্ধতার প্রকোপ নিরসনে করণীয় নির্ধারণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের বিশেষ সভায় এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। চসিক-সিডিএ’র যৌথ এ কমিটি ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রামের’ মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকার ভোগান্তি থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দেয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বর্ষার আগে দুই সংস্থা অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের তালে থাকলেও নগরীর ডোবার পর সমালোচনার মুখে এ যেন বোধদয়। তবে কথার ফুলঝুরি কিংবা কমিটি কমিটি খেলা নয়, সত্যিকার অর্থে দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চায় আশ্বাসে বিশ্বাস হারানো নগরবাসী। গতকাল বিকেলে নগরীর টাইগারপাসে চসিক মেয়রের অস্থায়ী কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে এ বিশেষ সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। এসময় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর, ওয়াসা, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে করণীয় নির্ধারণ করতে গঠিত চার সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয়েছে সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসকে। সদস্য হিসেবে আছেন চসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর মোবারক আলী ও প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। এছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালককেও কমিটির সদস্য করা হয়েছে।’ মেয়র আরও বলেন, ‘পানি উঠবে। কিন্তু পানি যাতে দ্রুত নেমে যায় তার সমাধান খুঁজতে চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি করা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে কোন খালে পানি প্রবাহে কি প্রতিবন্ধকতা আছে তা সরেজমিন পরিদর্শন করে বের করবে কমিটি। এরপর ক্র্যাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে খাল-নালায় পানি প্রবাহের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য পদক্ষেপ নিবে। কমিটিকে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সবগুলো সংস্থা সহযোগিতা করবে। আশা করছি জনগণের ভোগান্তি কমে যাবে।’ এবার জলাবদ্ধতায় বেশি ভোগান্তি হয়েছে স্বীকার করে সিটি মেয়র বলেন, ‘যেকোনো উন্নয়ন কাজ হলে ভোগান্তি পোহাতে হয়। এবার প্রবল বর্ষণ হয়েছে। এ জন্য ভোগান্তিটাও বেশি হয়েছে। বিষয়টা সব কর্তৃপক্ষকে নাড়া দিয়েছে। জনগণকে ভোগান্তি থেকে মুক্তি দিতে আমরা একযোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ শুরু করেছি।’
এসময় উপস্থিত সাংবাদিকরা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, ‘এমন উদ্যোগ আগে নেওয়া হয়নি কেন?’ জবাবে সিটি মেয়র রেজাউল বলেন, ‘ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সমস্যাগুলো চিহ্নিত হয়। কাজ করার জন্য খালগুলোয় বাঁধ ছিলো। আমরা আগেভাগে বাঁধগুলো অপসারণের দাবি জানিয়েছি, সিডিএ তা করেছে। কাজের স্বার্থে ফেলা মাটি তোলা সম্ভব হয়নি। তবে প্রত্যাশা ছিলো পানি আটকে থাকবে না। কিন্তু অন্যান্য সময়ের তুলনায় মানুষের কষ্ট বেশি হয়েছে। তাই জরুরী ভিত্তিতে দুর্ভোগ কমাতে বর্জ্য পরিষ্কার, নালা সংস্কার বা খালের মাটি উত্তোলন, যা-ই করতে হয় তা-ই করবে কমিটি।’
সিডিএ’র ‘ভুল’ দেখিয়ে দিল চসিক
সভার শুরুতে নগরের ১৮ খালের মধ্যে পানি চলাচলে ২০ প্রতিবন্ধকতার চিত্র তুলে ধরেন সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। এরমধ্যে নগরের পতেঙ্গায় নির্মাণাধীন কর্ণফুলী টানেলের মুখে ৬০ ফুটের একটি খালকে ৩ ফুটের নালায় পরিণত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়া নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে নিয়োজিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স গ্রæপ ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে একটি খালকে মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলেছে উল্লেখ করা হয়েছে। মঙ্গল ও বুধবার সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা সরেজমিন পরিদর্শন করে এসব চিত্র ধারণ করেছেন বলে সভায় জানিয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী। চিত্রগুলোতে দেখা যায়, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় খালগুলোর প্রতিরোধ দেওয়াল নির্মাণের জন্য যে লোহারপাত পোতা হয়েছে সেগুলো রয়ে গেছে। এছাড়া নির্মাণকাজের জন্য ফেলা মাটিতে খাল ভরাট হয়ে আছে। খালের এ অবস্থার কারণে পানি নামতে পারছেন না বলে দাবি সিটি করপোরেশনের।
প্রেজেন্টশনে ১৮ নং ওয়ার্ডের ৫নং ব্রিজের বির্জা খালের চিত্রে দেখা যায়, ৪০ ফিটের খালে বাঁধ দিয়ে রাখা হয়েছে ৩০ ফিট। নামমাত্রা ৮ ফিটের বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে। ফলে পাশের চলাচলের রাস্তা ডুবে খালের আকার ধারণ করেছে। ১৭ নং ওয়ার্ডের সুরভী খাল, ৩৪ নং ওয়ার্ডে শুটকি পট্টি কলাবাগিচা খাল, একই ওয়ার্ডের বান্ডেল খাল, কল্পলোক আবাসিক সংলগ্ন খাল, ৩৩ নং ওয়ার্ডের বারমাসিয়া খাল, ৩১ নং ওয়ার্ডে মনোহরখালী খাল, ৩৫ নং ওয়ার্ডে বক্সিরহাট এলাকার রাজাখালী খাল, ২৯ নং ওয়ার্ডে গোলজার খালের পশ্চিম বাড়ারবাড়ি অংশ, ৪১ নং ওয়ার্ডের ১৫ নং খাল, চাইনিজ খালের নির্মাণাধীন স্লুইস গেট অংশ, ৩৯ নং ওয়ার্ডে অবস্থিত ৭ নং খাল, ৪১ নং ওয়ার্ডে ভিআইপি রোড সংলগ্ন খালে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ঠিকাদার ম্যাক্স কোম্পানি মাটি ফেলে ভরাট, ট্যানেলের মুখে ৬০ ফুটের প্রশস্ত খালকে ৩ ফুটের ড্রেনে পরিণত করা, ১৬ নং চকবাজার ওয়ার্ডে শাহ মাজার সংলগ্ন চাক্তাই খাল, বহদ্দারহাট পুলিশ বিট সংলগ্ন খাল, ৮নং শুলকবহর ওয়ার্ডে সিডিএ এভিনিউ রোডের পাশের খাল, ১৫ নং ওয়ার্ডের পশুশালা থেকে প্রবর্তক মোড় পর্যন্ত হিজরা খাল, ৩ নং পাঁচলাইশ ওয়ার্ডে অক্সিজেন মোড় সংলগ্ন শীতল ঝর্ণা খালে বাঁধ অপসারণে গাফিলতি ও অব্যবস্থারপনা সচিত্র উপস্থাপন করে সিডিএ’র ভূমিকা স্পষ্ট করে চসিক।