নগরীতে ৩০ দিনে গড়ে ৩৭ জনের আত্মহত্যা

27

তুষার দেব

নগরীতে বছরের ব্যবধানে আত্মহননের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রথম ৭ মাসে দুইশ’ ৫৯ জন আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। সেই হিসেবে প্রতি মাসে অর্থাৎ ৩০ দিনে গড়ে ৩৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। সর্বশেষ ১৫ দিনে আত্মহত্যা করেছেন নারীসহ চারজন। এর মধ্যে এক শিশুকেও ঝোলানো হয়েছে রশিতে।
নগর পুলিশের বিভিন্ন থানায় রেকর্ড হওয়া তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত এই সাত মাসে শুধুমাত্র মহানগরীতে দুইশ’ ৫৯ জন আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। এছাড়া, নগরীর বাইরে প্রত্যন্ত জনপদেও আত্মহত্যার আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। গত বছরের তুলনায় চট্টগ্রামে আত্মহত্যার ঘটনা অনেকগুণ বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে চট্টগ্রামে মোট আত্মহত্যা করেছিলেন পাঁচশ’ ২৬ জন। আর তার আগের বছর ২০২১ সালে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল তিনশ’ ৯৭টি। নগরীর বিভিন্ন এলাকার মধ্যে শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত অধ্যুষিত বন্দর ও ইপিজেড এলাকায় আত্মহত্যার হার বেশি। উল্টোদিকে ভিআইপি এলাকা হিসেবে পরিচিত খুলশীতে আত্মহ্যার ঘটনা তুলনামূলক কম। পরিবারের তরফে অভিযোগ না করার কারণে আত্মহত্যার ঘটনায় সাধারণত অপমৃত্যু মামলা রেকর্ড করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যদি আত্মহত্যার মামলাগুলো তদন্ত করা যায় তাহলে বেশিরভাগ আত্মহত্যার নেপথ্যে প্ররোচণাকারী শনাক্ত করা সম্ভব হত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। পুলিশ জানায়, বিদায়ী মাসের শেষদিকে গত ২৭ আগস্ট নগরীর সদরঘাট থানাধীন পোস্ট অফিস গলি এলাকায় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে রিমঝিম দাশগুপ্ত (২০) নামের এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। পরীক্ষার প্রবেশপত্র হারিয়ে ফেলায় সে আত্মহত্যা করে। দু’দিন আগে কলেজ থেকে ফেরার সময় এইচএসসি পরীক্ষার প্রবেশপত্র হারিয়ে ফেলে ওই শিক্ষার্থী। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারার হতাশা থেকে ওই শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এর পরদিন গত ২৮ আগস্ট নগরীর ইপিজেড এলাকায় পারিবারিক কলহের জের ধরে তিন বছরের শিশুসহ এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করে। ইপিজেড থানা সংলগ্ন ব্যাংক কলোনির শাহ আলম কন্ট্রাক্টরের মালিকানাধীন ভাড়া বাসায় এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের ধারণা, শিশুকন্যাকে হত্যার পর ওই গৃহবধূ তাকে নিয়েই নিজেই গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার পরিদন গত ৩০ আগস্ট পারিবারিক কলহের জেরে জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নে নুর আয়েশা বেগম (৪০) নামে এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেন।
আত্মহত্যা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, নগরীতে ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সের তরুণরাই আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকছে বেশি। পিছিয়ে নেই তরুণীরাও। চলতি বছরে ১৬ থেকে ২৫ বছর বয়সী ৬৫ জন তরুণ এবং ৫৮ জন তরুণী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। এছাড়া ১০ থেকে ১৫ বছরের আট কিশোর ও ১৪ কিশোরী, ২৬ থেকে ৩৫ বছরের ২৬ পুরুষ ও ২৮ নারী, ৩৬ বছরের ঊর্ধ্বে ৪৩ পুরুষ ও ১৭ নারী নিজেই নিজের হন্তারক রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তুচ্ছ কারণে অভিমানের বশে অনেক কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যাকে ‘মুক্তির পথ’ হিসেবে বেছে নিচ্ছে। মোবাইল ফোন অথবা শখের মোটর বাইক কিংবা অন্য কোনও শখের বস্তু কিনে না দেওয়ায় অনেক কিশোর বয়সীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া যায়। এমনকি পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলাফল করতে না পেরেও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। পরিণত বয়সীরাও বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ। এক্ষেত্রে পারিবারিক কলহ, আর্থিক অনটন, জীবিকার সংকট ও অনিশ্চয়তা, দেনাগ্রস্ত হওয়া, প্রেমঘটিত বিবাদ, মা-বাবার সঙ্গে অভিমান, হতাশা, যৌতুক ও মানসিক বিষাদ অন্যতম। গবেষণার তথ্যমতে, চট্টগ্রামে শুধুমাত্র পারিবারিক সমস্যায় আত্মহত্যার হার ৪১ দশমিক দুই শতাংশ। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় ১১ দশমিক আট শতাংশ, বৈবাহিক সমস্যায় ১১ দশমিক আট শতাংশ, ভালোবাসায় প্রতারিত হয়ে ১১ দশমিক আট শতাংশ, বিবাহবহির্ভূত গর্ভধারণ ও যৌন স¤পর্ক নিয়ে ১১ দশমিক আট শতাংশ, স্বামীর নির্যাতনে পাঁচ দশমিক নয় শতাংশ এবং আর্থিক অনটনে পাঁচ দশমিক নয় শতাংশ নারী-পুরুষ আত্মহত্যা করেন।
সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় বলেন, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের পাশাপাশি আইনের চোখেও আত্মহত্যার ঘটনা অনাকাঙ্খিত। প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনা সমাজকে নাড়া দিয়ে যায়। এটা পুলিশ প্রশাসনকেও ভাবাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে কী করা যায় তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রণয়নের পথে এগোচ্ছে পুলিশ। আশা করছি দ্রুত এর সুফল আসবে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া আত্মহত্যার ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নগরীর শ্রমিক অধ্যুষিত বন্দর ও ইপিজেড থানা এলাকায় আত্মহত্যার ঘটনা বেশি। এখানে মূলত পারিবারিক কলহ বা অশান্তির জের, আর্থিক অনটন ও দেনা শোধ করতে না পারার কারণেই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। তবে এর বিপরীত চিত্র খুলশীতে। অভিজাত এই এলাকাটিতে এক বছরে আত্মহননের ঘটনা ঘটেছে মাত্র একটি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আনিসুল ইসলাম পূর্বদেশকে বলেন, সামান্য ঘটনায় জীবনকে যারা তুচ্ছ মনে করেন তারাই আত্মহত্যার মত ‘দুই ক‚ল হারানো’ পথ বেছে নেন। পারিবারিক এবং নৈতিক শিক্ষার অভাবে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনাগুলো ঘটছে। এ থেকে মুক্তির অন্যতম উপায় হচ্ছে পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধনকে মজবুত করা। জীবনের চলার পথে যে কোনও সমস্যা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করা। আত্মহত্যা কোনও সমস্যারই যে সমাধান হতে পারে না- তা উপলব্ধি করতে হবে। সমাজে হতাশা থেকে আত্মহত্যার পাশাপাশি প্ররোচণার কারণেও অনেক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। প্ররোচণার ক্ষেত্রে ঘটনাগুলোর সঠিক তদন্ত ও প্রকৃত অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা গেলে এ ধরনের ঘটনা কমে যাবে।