নগরীতে গণপরিবহন সংকটে ফায়দা লুটছে সিন্ডিকেট

33

নগরীতে গণপরিবহনের সংকট দীর্ঘদিনের। ৫৫টি রুটে নির্ধারিত পাঁচ হাজারের বেশি গাড়ির চাহিদা থাকলেও আঞ্চলিক ট্রান্সপোর্ট কমিটি (আরটিসি) অনুমোদন দিয়েছে মাত্র চার হাজারের। এতে ৬২ লাখ জনগণের এ নগরে প্রায় এক হাজারেরও বেশি গণপরিবহন সংকট রয়েছে। ফলে একদিকে বাড়ছে জনদুর্ভোগ, অন্যদিকে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী অনটেস্ট এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামিয়ে ফায়দা লুটছে। আবার গাড়ির মালিক-শ্রমিক মিলে আদায় করছে ইচ্ছেমতো ভাড়া।
পরিবহন নেতাদের দাবি, আঞ্চলিক ট্রান্সপোর্ট কমিটি নতুন গাড়ি নামানোর অনুমোদন দিলে আমরাও সংযোজন করতে পারবো, ফলে আর সংকট থাকবে না।
বাংলাদেশ রোড এন্ড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্যমতে, চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৬টি রুটে বাস-মিনিবাস চলাচল করছে। এসব রুটে এক হাজার ৫৪৫টি গাড়ির চাহিদা থাকলেও আঞ্চলিক ট্রান্সপোর্ট কমিটি অনুমতি দিয়েছে এক হাজার গাড়ি চলাচলের। একই সঙ্গে আরও ১৮টি রুটে চলাচল করছে হিউম্যান হলার। এ ১৮ রুটে হিউম্যান হলারের চাহিদা রয়েছে এক হাজার ৪৫৬টি। কিন্তু চলার অনুমতি পেয়েছে এক হাজার ১১৭টি। একই সঙ্গে ২১ রুটে অটোটেম্পু চলছে। এ ২১ রুটে চাহিদা দুই হাজার ৩৯৭টি, আরটিসি অনুমোদন দিয়েছে এক হাজার ৮৭২টি। ফলে চাহিদার তুলনায় প্রায় দেড় হাজার গাড়ি কম চলাচল করছে এ রুটে। এর মধ্যে আবার অধিকাংশ গাড়ির ফিটনেস না থাকায় নিয়মিত চলাচল করতে পারছে না।
নগরীর ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত অক্সিজেন থেকে চকবাজার হয়ে বারেকবিল্ডিং পর্যন্ত ১নং রুট। এ রুটে সিএনজিচালিত অটোটেম্পু (টিকটিকি) চলাচল করে। আনুমানিক চাহিদা রয়েছে ২৬২টির। অনুমোদনের প্রায় গাড়ির চলাচলের অনুমতি থাকলেও রুটটিতে নিয়ম মানা হচ্ছে না। বর্তমানে রুটটিতে অটোটেম্পু দুইভাগে বিভক্ত হয়ে চলছে। অক্সিজেন থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত এবং চকবাজার থেকে বারেকবিল্ডিং পর্যন্ত চলাচল করছে অটোটেম্পু। এতে প্রয়োজনের তুলনায় গাড়ির সংকট দেখা দিয়েছে। আর বিপাকে পড়েছেন চকবাজার থেকে বারেকবিল্ডিং রুটের যাত্রীরা। চকবাজার এলাকায় বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকার কারণে অন্যান্য রুট থেকে কয়েকগুণ বেশি যাত্রীর চাপ থাকে। ফলে পরিবহন সংকটের কারণে প্রতিদিন ভোগান্তির পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া গুণতে হচ্ছে যাত্রীদের।
এদিকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কয়েক দফা অভিযান চালিয়েছে বিআরটিএ। অভিযান চলাকালে অসাধু পরিবহন মালিকরা ওই রুটে গাড়ি চলাচলসহ বন্ধ করে দেন। এতে বিপাকে পড়েন জনসাধারণ। আবার গাড়ির ত্রæটি থাকলেও মামলা এবং জরিমানা গুণতে হয় চালক-হেলপারদের।
কলেজ ছাত্রী মেহনুর জান্নাত বলেন, প্রতিদিন দেওয়ানহাট থেকে চকবাজার আসা-যাওয়া করতে হয়। অনেক সময় জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভিড় ঠেলে অটোটেম্পুতে উঠতে হয়। একটি অটোটেম্পুতে ১২ থেকে ১৪ যাত্রী উঠেন, অনেকে পিছনে ঝুলে যান। এটা খুবই বিরক্তিকর।
অন্যদিকে শাহ আমানত সেতু থেকে চকবাজার হয়ে কোতোয়ালী পর্যন্ত ১নং রুট ও কালুরঘাট ব্রিজ থেকে চকবাজার হয়ে লালদিঘি পর্যন্ত ২নং রুটে আনুমানিক ১৭৫টি গাড়ির চাহিদা থাকলেও দুই রুট মিলে বাস চলাচল করছে মাত্র ৭৩টি। এর মধ্যে অধিকাংশ গাড়ির ফিটনেস না থাকায় চলাচলের অনুপযোগী।
অপরদিকে নগরীর প্রধান ও ব্যস্ততম ১০নং রুটে বাস-মিনিবাস চলাচল করে ২০৫টি। কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা সি-বিচ পর্যন্ত এ রুটে প্রয়োজনের তুলনায় গাড়ির সংখ্যা কম। বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যায় মারাত্মক পরিবহন সংকট দেখা দেয়।
আবার কিছু কিছু গণপরিবহন বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ইপিজেডে রিজার্ভ ভাড়ায় চলে। এ কারণে গাড়ি সংকট ভয়াবহ রূপ নেয়। এ সংকটকে পুঁজি করে ফায়দা লুটে বাস মালিক-শ্রমিকরা। যাত্রীদের জিম্মি করে আদায় করে অতিরিক্ত ভাড়া।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরিবহন শ্রমিক জানান, বর্তমানে বাস মালিকরা সিন্ডিকেট করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নতুন গাড়ি সড়কে নামাতে দিচ্ছে না। যে কেউ চাইলে এ ব্যবসায় আসতে পারেন না, এলেও মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়। ফলে যেসব মালিকের গাড়ি আছে, তারাই লাভবান হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রæপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বলেন, আমরা সিটিং সার্ভিসের জন্য নতুন ৭০টিসহ আরও গাড়ি নামানোর আবেদন করেছি। আরটিসি অনুমতি দিলে সড়কে নতুন গাড়ি নামানো হবে। এতে সংকট কিছুটা কমে আসবে।
শিল্প প্রতিষ্ঠানে রিজার্ভ ভাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, মহানগরের বিভিন্ন রুটের নিবন্ধিত যেসব গণপরিবহন রিজার্ভ ভাড়ায় চলে, তা অন্যায়। আমি চাইবো বিআরটিএ তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিক, এমনকি তাদের রুট পারমিট বাতিল করলেও আমরা প্রতিবাদ করবো না।
চট্টগ্রাম পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মুছা বলেন, সমাজের বিত্তশালীরা পরিবহনের দিকে নজর দিলে এ সমস্যাটা থাকবে না। এস আলম গ্রুপ নগরীর সড়কে কিছু গাড়ি নামানোর কথা রয়েছে। যদি তারা প্রয়োজনমাফিক গাড়ি সড়কে নামান তাহলে পরিবহন সংকট থাকবে না বলে আমি মনে করি।
বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এসএম মনজুরুল হক পূর্বদেশকে বলেন, ‘বন্দরনগরীখ্যাত এ শহরে মানসম্মত গণপরিবহননেই। যেগুলো চলছে এর কিছু চলাচলের উপযোগী হলেও বাকিগুলোর অবস্থা খুবই শোচনীয়। নগরীর নাজুক পরিবহন ব্যবস্থা দেখে খুব কষ্ট হয়। যে নগরীর হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে পুরো দেশ সে নগরবাসীর একমাত্র দুঃখ হচ্ছে গণপরিবহন। নগরবাসীকে গণপরিবহনের এ দুর্ভোগের হাত থেকে বাঁচাতে পারেন একমাত্র শিল্পপতিরা। তারা চাইলে সড়কে নামাতে পারেন উন্নত বিশ্বের আদলে আধুনিক বাস।’