নগরীতে আবারো জলাবদ্ধতা জনদুর্ভোগ লাঘবে দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি

13

 

শ্রাবণের বৃষ্টিভেজা দিন রসিক মানুষের মনে পুলক আনন্দ ছড়ালেও চট্টগ্রাম নগরবাসীর মন বিষিয়ে তুলছে। টানা ৪ দিনের বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে নগরীর বেশিরভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। একদিকে করোনা ভাইরাসের উর্ধ্বগতিরোধে কঠোর লকডাউন অপরদিকে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে নগরের নিম্নাঞ্চলগুলো ডুবে যাওয়ায় অসহায় হত দরিদ্র মানুষের জীবন চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় বের করতে হবে দ্রæত। কাজগুলো করতে হবে সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনকে। শুক্রবার দৈনিক পুর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, লঘুচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কয়েকদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে ভারী বৃষ্টি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানি। ফলে তলিয়ে গেছে নগরীর অনেক নিম্নাঞ্চল। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। প্রতিবেদনে আবহাওয়া অফিস সূত্রে উল্লেখ করা হয়, বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আগামী কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। তবে এটা ধীরে ধীরে কমে আসবে। টানা চার দিনের বৃষ্টিতে নগরীর আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক, বন্দর, হালিশহর, চকবাজার, বাকলিয়া, চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় নিচু সড়কগুলোতে হাঁটুপানি দেখা গেছে। লকডাউনের মধ্যে জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষকে পড়তে হয়েছে দুর্ভোগে। টিকাদানকেন্দ্র, ব্যাংক, হাসপাতালমুখী মানুষকে হাঁটুপানি মাড়িয়ে চলাচল কিংবা রিকশায় গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা গেছে।
একসময় সংবাদপত্রে শিরোনাম রিপোর্ট প্রকাশিত হতো, ‘চট্টগ্রামের দুঃখ চাকতাই খাল’ । বলার অবকাশ নেই যে, দুঃখ এখন আর চাকতাই কেন্দ্রিক নেই। চট্টগ্রাম শহরের বিশাল বিশাল জলাধার, খাল, বিল, নালা ভরাট করে আবাসিক এলাকা করা হয়েছে। পাহাড় কেটে অভিজাত আবাসিক ও সরকারিভাবে সড়ক বানানো হয়েছে। অনেক বড় বড় ড্রেন ও নালার অপরিকল্পিত ফুটপাত ও মার্কেট, সরকারি-বেসরকরি অফিস তৈরি করা হয়েছে। এসব করার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে কোন আপত্তির কথা শোনা যায়নি। ফলে আমরা মনে করি, চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার দায় নগর কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। তবে নগরবাসীর সামান্য দায় যে নেই তা নয়, এ দায়ের কথা নগর কর্তৃপক্ষ প্রায় বলে থাকেন। যেমনটি নাগরিকরা চিপসের প্যাকেট, খালি পানির বোতল আর পলিথিন ফেলে খাল ও নালা-নর্দমাগুলো ভরাট করে ফেলছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, কেন কিছু সংখ্যক মানুষ এ অশোভনীয় কাজ করে যাচ্ছে, এর কোন পর্যালোচনা বা প্রতিকারের ব্যবস্থাও করা হয়নি।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর আমলের পরবর্তী থেকে শুরু করে বর্তমান মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী পর্যন্ত প্রায় তিন দশক ধরে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি ইস্যু হিসেবে আছে। দীর্ঘ প্রায় ৩ দশক চাকতাই খাল খনন, তলা পাকাকরণ প্রকল্প থেকে শুরু করে জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত নানা প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু এর সুফল নগরবাসী পায়নি। অপরদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বর্তমানে জলাবদ্ধতা নিরসনে তাদের বাস্তবায়নাধীন ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাববধানে। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০২০ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল প্রকল্পটির কাজ। এরপরও কাজ শেষ না হওয়ায় এক বছর সময় বাড়িয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত করা হয় প্রকল্পের মেয়াদ। বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ না হওয়ায় আরও দুই বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। বলা যায় না এরমধ্যে প্রকল্প ব্যয় আরও কত বাড়বে। গতমাসে আমরা দেখেছি, মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ’র মেগা প্রকল্পের কাজের জন্য খালের মুখে যে বাঁধ দেওয়া হয়েছে সেগুলো অপসারণ করার দাবি জানিয়েছেন। দ্রুত এসব বাঁধ না সরালে চট্টগ্রাম নগরীতে বুক-সমান পানি হবে বলে তিনি সতর্ক করেছিলেন। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, খালে বাঁধ ও স্লুইসগেটের (রেগুলেটর) কাজ শেষ না হওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, বাঁধের কারণে বৃষ্টি হলে খালে পানি নামতে পারে না। আর জোয়ারের কারণে সাগরের পানি যা প্রবেশ করে তাও বন্ধ করতে পারে না। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেগা প্রকল্পের মাত্র ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। যতদিন পর্যন্ত স্লুইসগেট নির্মাণ ও মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না ততদিন জলাবদ্ধতা থাকবেই। এরপরও, মেগা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে খালের মধ্যে যে বাঁধ দেওয়া হয়েছে সেগুলো খুলে দেওয়ার জন্য। এছাড়া পানি দ্রুত নামার জন্য ড্রেন ও নালা দ্রæত পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে। কিন্তু এর আগেই আরা একবার তলিয়ে গেল চট্টগ্রাম নগর। এরপরও আমরা আশা করি, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সেবা সংস্থাগুলো পরস্পর সমন্বয় করে চট্টগ্রাম নগরীকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা করার উপায় বের করবেন দ্রুত।