ধর্ষণ ও খুনে বেশিরভাগই প্রতিবেশী

48

তুষার দেব

চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে নিরাপরাধ শিশুর ওপর পাশবিকতার ঘটনায় দন্ডিত বা অভিযুক্তদের বেশিরভাগই প্রতিবেশী। নগরীতে সাম্প্রতিক সময়ে চাঞ্চল্যকর তিন কন্যাশিশু ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া তিন প্রধান আসামিও ভিকটিমের প্রতিবেশী হিসেবেই পরিচিত। প্রতিবেশী বড়দের হাতে অবোধ ও নিষ্পাপ ছোটরা নৃশংসতার শিকার হচ্ছে। একের পর এক শিশু খুনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি অভিভাবকদের ভাবিয়ে তুলেছে। প্রতিবেশীর কাছে শিশুর নিরাপত্তাহীনতা সমাজের জন্য অশনি সংকেত বলেও আদালত মন্তব্য করেছেন।জানা গেছে, পাঁচ বছর আগে রাজধানীর বাড্ডায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার বিচার শেষে গতকাল বুধবার রায় দেয়া হয়েছে। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক সাবেরা সুলতানা খানম রায়ে আসামি শিপনকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, শিশুরা যদি তাদের আশপাশের প্রতিবেশীদের কাছে নিরাপদ না থাকে, তা সমাজের জন্য অশনি সংকেত। আসামি একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে নিজের পাশবিক লালসা চরিতার্থ করতে ভিকটিমের জীবনে কালিমা লেপন করেছে এবং তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে। উক্ত কাজের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি প্রাপ্য।
সাম্প্রতিক সময়ে নগরীতে চাঞ্চল্যকর শিশু হত্যার ঘটনাগুলোতেও প্রধান আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছে ভিকটিমের প্রতিবেশীরাই। এ বিষয়টি নজরে আনা হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রাণা দাশগুপ্ত পূর্বদেশকে বলেন, শিশুরা যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিচিতজন কিংবা প্রতিবেশীদের দ্বারাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকমাত্রই যেখানে শিশুদের পরম মমতা ও ভালোবাসায় বুকে আগলে রাখার কথা, সেখানে চেনা-পরিচিতজনরা শিশুদের পাশবিকতার নির্মম শিকারে পরিণত করছে। এটা কোনও ভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সভ্য সমাজে এমন জঘন্য নিষ্ঠুরতা কল্পনাও করা যায় না। এখন প্রতিবেশী কতটা নিরাপদ সেটা ভেবে দেখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ছে।
কেবল অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করেই এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে নগর পুলিশের বন্দর জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) শাকিলা সুলতানা পূর্বদেশকে বলেন, নগরীতে সংঘটিত প্রতিটি শিশু হত্যার ঘটনায় অভিযুক্তদের দ্রুততম সময়ের মধ্যেই পুলিশ আইনের আওতায় এনেছে। কিন্তু তাদের উপযুক্ত শাস্তিই কী সমাজে প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে? আসলে এ ধরনের অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অপরাধীর শাস্তির পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। পাশবিকতার মূলোৎপাটনের উপায় খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি। এ ধরণের ঘৃণ্য কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নগরীতে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত পৃথক তিনটি শিশু খুনের ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। এর মধ্যে সর্বশেষ গত ১৫ নভেম্বর বিকেলে নগরীর ইপিজেড থানার দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ডের নয়ারহাট এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার পাঁচ বছর বয়সী আলীনা ইসলাম আয়াত নিখোঁজ হন। ১০ দিনের মাথায় পর পিবিআই আবির আলীকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে নিখোঁজ রহস্য উদঘাটন করে। পিবিআইয়ের ভাষ্যমতে, মুক্তিপণ আদায়ের জন্য আয়াতকে অপহরণের পরিকল্পনা করে তাদের বাড়ির ভাড়াটিয়া আজহারুলের ছেলে আবির আলী। পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ আবিরকে আয়াত ‘চাচ্চু’ বলে সম্বোধন করত। ঘটনার দিন বিকেলে বাসার অদূরে আয়াতকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে আবির ঢুকে যায় তার বাবার বাসায়। সেখানে তখন কেউ ছিল না। আয়াত সেখানে চেঁচামেচি শুরু করলে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর ধারালো কাটার ও বটি দিয়ে মরদেহ কেটে ছয় টুকরা করে ব্যাগে ভরে রাখে। পরদিন ১৬ নভেম্বর সকালে লাশের তিনটি টুকরা বেড়িবাঁধের পর আউটার রিং রোড সংলগ্ন বে-টার্মিনাল এলাকায় সাগরসংলগ্ন খালে ফেলে দেয়। রাতে মরদেহের বাকি তিন টুকরো আকমল আলী রোডের শেষপ্রান্তে স্লুইস গেটের প্রবেশমুখে ফেলে দেয়। আয়াতের খেলার সাথীদের কাছ থেকে তাকে কোলে নেয়ার তথ্য এবং সিসি ক্যামেরার ফুটেজে আবিরের গতিবিধি দেখে সন্দেহের পর তাকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। এ ঘটনায় আবিরের মা-বাবা ও বোনকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে গত ২৭ অক্টোবর বিকালে নগরীর জামালখান সিকদার হোটেলের পাশে ব্রিজ গলির বড় নালা থেকে মারজান হক বর্ষা (৭) নামে শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ২৪ অক্টোবর বিকালে ওই এলাকায় নিজেদের ভাড়া বাসা থেকে বিস্কুট কিনতে বের হওয়ার পর থেকে সে নিখোঁজ ছিল। নিহত বর্ষা নগরীর কুসুমকুমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী। তার বাবা আব্দুল হক মারা গেছেন। মা ঝর্ণা বেগম ও সৎ বাবা মোহাম্মদ ইউছুপের সঙ্গে ব্রিজ গলির বাসায় থাকতো। তার আরও দুই বোন আছে। লাশ উদ্ধারের পর তার মা বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় হত্যা মামলা করেন। পুলিশ লাশ উদ্ধারের কয়েকঘন্টার মধ্যেই ওই রাতে হত্যারহস্য উন্মোচন ও আসামিকে গ্রেপ্তারে সক্ষম হয়। পাড়ার মুদি দোকান শ্যামল স্টোরের কর্মচারি লক্ষণ দাশ (৩০) একশ’ টাকা দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে চিপস কিনতে যাওয়া শিশু বর্ষাকে গলির একেএম জামালউদ্দিনের বিল্ডিংয়ের নিচতলায় থাকা গুদামে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ বস্তায় ভরে পাশের বড় নালায় ফেলে দেয়। লাশভর্তি ট্রেডিং কর্পোরেশনের (টিসিবি) সীলযুক্ত বস্তার সূত্র ধরে সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ ব্রিজ গলির মুখে থাকা মুদি দোকান শ্যামল স্টোর থেকে আসামি লক্ষণ দাশকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন ধর্ষণ ও হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়ার পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার ৩৬ দিন আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর বন্দর থানাধীন আবাসিক পোর্ট কলোনির আট নম্বর রোডের একটি পরিত্যক্ত ঘর থেকে সাত বছর বয়সী শিশু সুরমা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের পর থেকেই পুলিশ সন্দেহভাজন এক রিকশাচালকের খোঁজে মাঠে নামে। পুলিশ। বিরিয়ানি খাওয়ানোর প্রলোভনে ফেলে ওই রিকশাচালক শিশু সুরমা আক্তারকে রিকশায় তুলে নিয়ে গেছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। শিশু সুরমা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা রহস্য উদঘাটনে পুলিশ বন্দর থানা, হালিশহর থানা এবং ডবলমুরিং মডেল থানা এলাকায় লাগানো শতাধিক সিসি ক্যামেরায় ধারণকৃত ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করে। ঘটনাস্থলের আশপাশসহ বিভিন্ন এলাকার রিকশা গ্যারেজে গিয়ে অন্তত পাঁচ হাজার রিকশাচালককে জিজ্ঞাসাবাদ করা করে ঘাতককে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার ২৬ দিন পর গত ১৩ অক্টোবর ভোরে ডবলমুরিং থানার বেপারীপাড়া এলাকার একটি রিকশা গ্যারেজের সামনে থেকে বন্দর থানা পুলিশ সুরমা ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত সেই রিকশাচালক ওসমান হারুন মিন্টুকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আসামি ওসমান মিন্টু জানিয়েছেন, বিরিয়ানি খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিকালে হালিশহর কে ব্লকে ‘স্বপ্ন সুপার শপের’ পাশ থেকে প্রতিবেশী শিশু সুরমা আক্তারকে তার রিকশায় উঠায়। বড়পুল এলাকায় নিয়ে একটি দোকান থেকে কিনে বিরিয়ানি খাওয়ায়। এরপর পোর্ট কলোনির আট নম্বর রোডের মাথায় পরিত্যক্ত ঘরে নিয়ে শিশু সুরমা আক্তারকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এসময় শিশু সুরমা যন্ত্রণায় চিৎকার-চেঁচামেচি করলে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ ফেলে রেখে যায়। তিনটি ঘটনাতেই গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান আসামিরা ভিকটিমের প্রতিবেশী ছিলেন।