দ্রব্যমূল্যে জনগণের নাভিশ্বাস সিন্ডিকেট ব্যবসা রুখে দিতে হবে

3

আ ব ম খোরশিদ আলম খান

নিত্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম দিন দিন জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। একেক সময়ে একেকটি ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর ফলে জনগণের নাভিশ্বাস চরমে উঠেছে। সরকার অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে পারছে না। আমরা দেখছি সময়ে সময়ে বাণিজ্যমন্ত্রী, সচিব ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দায়িত্বশীলরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন কীভাবে দ্রব্যমূল্য কমানো যায় তার পন্থা খুঁজতে। আর এই বৈঠকে ব্যবসায়ীদের বেঁধে দেওয়া বাড়তি দামই অনুমোদন দিয়ে বসেন খোদ সরকারি তরফে। এতে ব্যবসায়ীদের অন্যায্য দাবিরই বাস্তবায়ন ঘটছে। ১৬০ টাকা থেকে লাফিয়ে ১৯৮ টাকা সয়াবিন তেলের গলাকাটা দাম নির্ধারিত হয়েছে সরকারের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠকে। গত ৫ মে সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৪০ টাকা বাড়ানো হয়। এক দিনে অত্যাবশ্যকীয় এই পণ্যের দামে এক লাফে বৃদ্ধির রেকর্ড এটি। এমনকি গত ৯ জুন সংসদে বাজেট পেশের দিনে সরকার বোতলজাত সয়াবিনের দাম লিটারে আরও ৭ টাকা বাড়িয়েছে। ফলে এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে হলো এখন ২০৫ টাকা। সয়াবিন তেলের দাম যখন দুইশত টাকা ছাড়িয়ে গেল, দেশজুড়ে যখন হইচই পড়ে গেল, তখন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি (তিনি আবার ব্যবসায়ীও বটে) হাস্যকর উক্তি করে বসলেন। তিনি নাকি ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করে ভুল করেছেন। তাঁর এ মন্তব্যের পর পরই হঠাৎ করে পেঁয়াজের ঝাঁজ বেড়ে যায়। ৩০ টাকার পেঁয়াজ তখন এক লাফে ৪০/৪৫/৫০ টাকা পর্যন্ত দরদাম ওঠে সারা দেশে। বাণিজ্যমন্ত্রীর হম্বিতম্বি বা সরকারের কোনো পদক্ষেপই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থামাতে পারছে না। পত্র পত্রিকায় এসেছে, ১০/১২টি বড় তেল উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তেল নিয়ে তেলেসমাতি কারবারে জড়িত। এদের কারসাজিতে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এখন আবার যোগ হয়েছে পাল্লা দিয়ে চালের দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। ৬ জুন ঢাকার শীর্ষস্থানীয় এক দৈনিকের প্রথম পাতায় প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম ছিল এরকম : ‘ভোজ্যতেলে যারা চালেও তারাÑ অভিযানে বেরিয়ে আসছে বড় শিল্পগ্রæপের নাম। সংকট তৈরি করে তেলের দামও বাড়িয়েছিল তারা’, আরেকটি জাতীয় দৈনিকের লিড হেডিং ‘দ্রব্যমূল্যের ঘা থামছে না। বাজারে সরকারি উদ্যোগের প্রভাব নেই।’ অন্য একটি বড় দৈনিক পত্রিকার হেডিংÑ‘একদিনে চালের দাম কেজিতে বাড়ল ৬ টাকা।’ এই হল দেশের বাজারের পরিস্থিতি। তবে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযানও থেমে নেই। ‘চাপে চাল ব্যবসায়ীরা’ শিরোনামে একটি দৈনিক সাব হেডিং দিয়ে লিখেছে ‘পাওয়া গেল মজুদ করা আরও ৪ হাজার টন ধান-চাল।’কখনো সয়াবিন তেল, কখনো পেঁয়াজ, কখনো চাল-ডাল বা চিনির দর জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেলেও সরকার অসহায়ত্বের মতো শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছেন। আর মাঝে মধ্যে ব্যবসায়ীদের নিয়ে ব্যর্থ হুংকার ছাড়ছেন। লোক দেখানো অভিযানে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। তাহলে আমরা কী ধরে নেব, অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী? আশ্চর্য যে, অসাধু ব্যবসায়ীরা সরকারকে থোড়াই কেয়ার করে। সরকারকে ওরা পাত্তাই দিতে চায় না। তাহলে সরষে কী ভ‚ত! সরকার কেন অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে পারছে না? জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ও বিশেষ ভ্রাম্যমাণ আদালতে অসাধু ব্যবসার চিত্র দিন দিন প্রকট হয়ে ধরা দিচ্ছে। সারা দেশে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে লাখ লাখ লিটার সয়াবিন তেল উদ্ধারের ঘটনা প্রতিদিনই আমরা দেখছি। এমনকি দোকান ও গুদামের সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসছে হাজার হাজার সয়াবিন তেলের বোতল। বছর দু’য়েক আগে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তৃতায় মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, পেঁয়াজের দাম যদি এতই বৃদ্ধি হয় তাহলে রান্নায় পেঁয়াজ খাওয়াই ছেড়ে দিন। বিশেষ পণ করুন এক মাস ধরে পেঁয়াজ খাবেন না। তাহলে পেঁয়াজ বেপারিদের উচিৎ শিক্ষাই হবে। এখন দেখছি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কথাই সঠিক ও বাস্তব। তেল পেঁয়াজের দাম বাড়লে আমরা এক কেজির স্থলে পাল্লা দিয়ে দশ কেজি কিনছি। ফলে মূল্যবৃদ্ধিতে আমরা ভোক্তা সাধারণও কম দায়ী নই।
আমরা খুব ব্যথিত ও আশ্চর্যান্বিত হই যখন দেখি ধর্মীয় লেবেল সেঁটে অর্থাৎ ‘খাজা স্টোর’ ও ‘বিসমিল্লাহ স্টোর’ নাম দিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবসার ফাঁদ পেতে বসেছে। দোকানে ইসলামি সাইনবোর্ডের আড়ালে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অনৈতিক রমরমা ব্যবসা যুগ যুগ ধরে চলে এলেও এর প্রতিকার মেলে না। ধর্ম যেন একশ্রেণির ব্যবসায়ীর কাছে বিশেষ স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার। দোকানের ইসলামি নামের আড়ালে ওরা ভোক্তাদের পকেট কাটায় ব্যস্ত। এখনই এদের রাশ টেনে ধরতে হবে। আল্লাহর দান স্টোর, বিসমিল্লাহ স্টোর, খাজা স্টোর নাম দিয়ে যারা ব্যবসার আড়ালে প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছে তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু জরিমানা করলে হবে না, ধর্মীয় নামের সাইনবোর্ডগুলো অপসারণে এদের বাধ্য করতে হবে। ধর্মের এ অবমাননা এখনই রুখতে হবে।
আরেকটি বিষয় দেখা যায়, বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য ও নিত্যপণ্যের প্যাকেটে অস্বাভাবিক দাম রাখা হয়। চাল, দুধ, চা পাতা, আটা, ময়দা ও বি¯ু‹টসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যে মাত্রাতিরিক্ত দাম রাখায় প্রতিনিয়ত ঠকছেন ভোক্তা সাধারণ। এর সুযোগ নেয় খুচরা বিক্রেতারা। এদের অনেকেই পণ্যের গায়ের দামের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয় না। যেমন কোনো পণ্যের আসল দাম হচ্ছে দুই শত টাকা। কিন্তু প্যাকেটে বা মোড়কে দাম লেখা হয় দুইশত চল্লিশ বা পঞ্চাশ টাকা। বাড়তি দামে এই পণ্য কেনা মানে নিশ্চিতভাবে প্রতারিত হওয়া। তবুও কিছুই করার থাকে না ভোক্তা সাধারণের। আমার তিন বছর বয়সী একটি শিশু কন্যা আছে। জন্মের ছয় মাস পর থেকে তাকে বেবি ডায়াপার পরানো হয়। এর দামের ক্ষেত্রেও আমি বেশ অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করি। আমি যে ওষুধের দোকান থেকে কন্যার জন্য ডায়াপার ক্রয় করি, তাতে গায়ের দাম থেকে অনেক কম দাম রাখা হয়। অথচ পাশের দোকানে ৬০/৭০ টাকা এমনকি ১০০/১৫০টাকা পর্যন্ত দাম বেশি রাখা হয়। একটি ডায়াপারের প্রকৃত বিক্রয় মূল্য যদি হয় ৫০০/৬০০ টাকা, তাতে মুদ্রিত দাম লেখা থাকে ৬০০/৭০০/৮০০ টাকা। দামের কী বিস্তর ফারাক দেখুন! পণ্যের মোড়কে বা গায়ে বেশি দাম রাখা মানে বেশি মুনাফার সুযোগ করে দেওয়া। খুচরা ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে নিত্য ঠকানো হচ্ছে সাধারণ মানুষদের। পণ্যের গায়ে অস্বাভাবিক মূল্য দেখিয়ে সর্বসাধারণকে নিত্য ঠকানোর এই প্রবণতা খুই দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক। অথচ সাধারণ মানুষ যাতে সঠিক উপযুক্ত মূল্যে পণ্য কিনতে পারে এ ব্যবস্থাই নিতে হবে সরকারকে। পণ্যের একতরফা দাম নির্ধারণে প্রচলিত পদ্ধতি তথা ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া স্বেচ্ছাচারিতা ও দস্যুবৃত্তি থামাতে হবে এখনই। জনগণের জন্য পণ্যের সহনীয় উচিত মূল্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকেই। এখনই সরকার যেন অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরেন, এটাই আজ জোরালো দাবি দেশবাসীর ও ভোক্তা সাধারণের। সরকারকে ব্যবসার নামে অসাধু সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। কার্যকর আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। প্লিজ, ব্যবসার আড়ালে দস্যুবৃত্তি এখনই থামান।

লেখক : সাংবাদিক দ্রব্যমূল্যে জনগণের নাভিশ্বাস
সিন্ডিকেট ব্যবসা রুখে দিতে হবে

আ ব ম খোরশিদ আলম খান

নিত্যপণ্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম দিন দিন জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। একেক সময়ে একেকটি ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর ফলে জনগণের নাভিশ্বাস চরমে উঠেছে। সরকার অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে পারছে না। আমরা দেখছি সময়ে সময়ে বাণিজ্যমন্ত্রী, সচিব ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দায়িত্বশীলরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন কীভাবে দ্রব্যমূল্য কমানো যায় তার পন্থা খুঁজতে। আর এই বৈঠকে ব্যবসায়ীদের বেঁধে দেওয়া বাড়তি দামই অনুমোদন দিয়ে বসেন খোদ সরকারি তরফে। এতে ব্যবসায়ীদের অন্যায্য দাবিরই বাস্তবায়ন ঘটছে। ১৬০ টাকা থেকে লাফিয়ে ১৯৮ টাকা সয়াবিন তেলের গলাকাটা দাম নির্ধারিত হয়েছে সরকারের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠকে। গত ৫ মে সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৪০ টাকা বাড়ানো হয়। এক দিনে অত্যাবশ্যকীয় এই পণ্যের দামে এক লাফে বৃদ্ধির রেকর্ড এটি। এমনকি গত ৯ জুন সংসদে বাজেট পেশের দিনে সরকার বোতলজাত সয়াবিনের দাম লিটারে আরও ৭ টাকা বাড়িয়েছে। ফলে এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে হলো এখন ২০৫ টাকা। সয়াবিন তেলের দাম যখন দুইশত টাকা ছাড়িয়ে গেল, দেশজুড়ে যখন হইচই পড়ে গেল, তখন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি (তিনি আবার ব্যবসায়ীও বটে) হাস্যকর উক্তি করে বসলেন। তিনি নাকি ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করে ভুল করেছেন। তাঁর এ মন্তব্যের পর পরই হঠাৎ করে পেঁয়াজের ঝাঁজ বেড়ে যায়। ৩০ টাকার পেঁয়াজ তখন এক লাফে ৪০/৪৫/৫০ টাকা পর্যন্ত দরদাম ওঠে সারা দেশে। বাণিজ্যমন্ত্রীর হম্বিতম্বি বা সরকারের কোনো পদক্ষেপই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থামাতে পারছে না। পত্র পত্রিকায় এসেছে, ১০/১২টি বড় তেল উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তেল নিয়ে তেলেসমাতি কারবারে জড়িত। এদের কারসাজিতে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এখন আবার যোগ হয়েছে পাল্লা দিয়ে চালের দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। ৬ জুন ঢাকার শীর্ষস্থানীয় এক দৈনিকের প্রথম পাতায় প্রকাশিত নিউজের শিরোনাম ছিল এরকম : ‘ভোজ্যতেলে যারা চালেও তারাÑ অভিযানে বেরিয়ে আসছে বড় শিল্পগ্রæপের নাম। সংকট তৈরি করে তেলের দামও বাড়িয়েছিল তারা’, আরেকটি জাতীয় দৈনিকের লিড হেডিং ‘দ্রব্যমূল্যের ঘা থামছে না। বাজারে সরকারি উদ্যোগের প্রভাব নেই।’ অন্য একটি বড় দৈনিক পত্রিকার হেডিংÑ‘একদিনে চালের দাম কেজিতে বাড়ল ৬ টাকা।’ এই হল দেশের বাজারের পরিস্থিতি। তবে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযানও থেমে নেই। ‘চাপে চাল ব্যবসায়ীরা’ শিরোনামে একটি দৈনিক সাব হেডিং দিয়ে লিখেছে ‘পাওয়া গেল মজুদ করা আরও ৪ হাজার টন ধান-চাল।’কখনো সয়াবিন তেল, কখনো পেঁয়াজ, কখনো চাল-ডাল বা চিনির দর জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেলেও সরকার অসহায়ত্বের মতো শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছেন। আর মাঝে মধ্যে ব্যবসায়ীদের নিয়ে ব্যর্থ হুংকার ছাড়ছেন। লোক দেখানো অভিযানে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। তাহলে আমরা কী ধরে নেব, অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী? আশ্চর্য যে, অসাধু ব্যবসায়ীরা সরকারকে থোড়াই কেয়ার করে। সরকারকে ওরা পাত্তাই দিতে চায় না। তাহলে সরষে কী ভ‚ত! সরকার কেন অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে পারছে না? জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ও বিশেষ ভ্রাম্যমাণ আদালতে অসাধু ব্যবসার চিত্র দিন দিন প্রকট হয়ে ধরা দিচ্ছে। সারা দেশে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে লাখ লাখ লিটার সয়াবিন তেল উদ্ধারের ঘটনা প্রতিদিনই আমরা দেখছি। এমনকি দোকান ও গুদামের সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসছে হাজার হাজার সয়াবিন তেলের বোতল। বছর দু’য়েক আগে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন বক্তৃতায় মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, পেঁয়াজের দাম যদি এতই বৃদ্ধি হয় তাহলে রান্নায় পেঁয়াজ খাওয়াই ছেড়ে দিন। বিশেষ পণ করুন এক মাস ধরে পেঁয়াজ খাবেন না। তাহলে পেঁয়াজ বেপারিদের উচিৎ শিক্ষাই হবে। এখন দেখছি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কথাই সঠিক ও বাস্তব। তেল পেঁয়াজের দাম বাড়লে আমরা এক কেজির স্থলে পাল্লা দিয়ে দশ কেজি কিনছি। ফলে মূল্যবৃদ্ধিতে আমরা ভোক্তা সাধারণও কম দায়ী নই।
আমরা খুব ব্যথিত ও আশ্চর্যান্বিত হই যখন দেখি ধর্মীয় লেবেল সেঁটে অর্থাৎ ‘খাজা স্টোর’ ও ‘বিসমিল্লাহ স্টোর’ নাম দিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবসার ফাঁদ পেতে বসেছে। দোকানে ইসলামি সাইনবোর্ডের আড়ালে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর অনৈতিক রমরমা ব্যবসা যুগ যুগ ধরে চলে এলেও এর প্রতিকার মেলে না। ধর্ম যেন একশ্রেণির ব্যবসায়ীর কাছে বিশেষ স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার। দোকানের ইসলামি নামের আড়ালে ওরা ভোক্তাদের পকেট কাটায় ব্যস্ত। এখনই এদের রাশ টেনে ধরতে হবে। আল্লাহর দান স্টোর, বিসমিল্লাহ স্টোর, খাজা স্টোর নাম দিয়ে যারা ব্যবসার আড়ালে প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেছে তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু জরিমানা করলে হবে না, ধর্মীয় নামের সাইনবোর্ডগুলো অপসারণে এদের বাধ্য করতে হবে। ধর্মের এ অবমাননা এখনই রুখতে হবে।
আরেকটি বিষয় দেখা যায়, বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য ও নিত্যপণ্যের প্যাকেটে অস্বাভাবিক দাম রাখা হয়। চাল, দুধ, চা পাতা, আটা, ময়দা ও বি¯ু‹টসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যে মাত্রাতিরিক্ত দাম রাখায় প্রতিনিয়ত ঠকছেন ভোক্তা সাধারণ। এর সুযোগ নেয় খুচরা বিক্রেতারা। এদের অনেকেই পণ্যের গায়ের দামের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয় না। যেমন কোনো পণ্যের আসল দাম হচ্ছে দুই শত টাকা। কিন্তু প্যাকেটে বা মোড়কে দাম লেখা হয় দুইশত চল্লিশ বা পঞ্চাশ টাকা। বাড়তি দামে এই পণ্য কেনা মানে নিশ্চিতভাবে প্রতারিত হওয়া। তবুও কিছুই করার থাকে না ভোক্তা সাধারণের। আমার তিন বছর বয়সী একটি শিশু কন্যা আছে। জন্মের ছয় মাস পর থেকে তাকে বেবি ডায়াপার পরানো হয়। এর দামের ক্ষেত্রেও আমি বেশ অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করি। আমি যে ওষুধের দোকান থেকে কন্যার জন্য ডায়াপার ক্রয় করি, তাতে গায়ের দাম থেকে অনেক কম দাম রাখা হয়। অথচ পাশের দোকানে ৬০/৭০ টাকা এমনকি ১০০/১৫০টাকা পর্যন্ত দাম বেশি রাখা হয়। একটি ডায়াপারের প্রকৃত বিক্রয় মূল্য যদি হয় ৫০০/৬০০ টাকা, তাতে মুদ্রিত দাম লেখা থাকে ৬০০/৭০০/৮০০ টাকা। দামের কী বিস্তর ফারাক দেখুন! পণ্যের মোড়কে বা গায়ে বেশি দাম রাখা মানে বেশি মুনাফার সুযোগ করে দেওয়া। খুচরা ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে নিত্য ঠকানো হচ্ছে সাধারণ মানুষদের। পণ্যের গায়ে অস্বাভাবিক মূল্য দেখিয়ে সর্বসাধারণকে নিত্য ঠকানোর এই প্রবণতা খুই দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক। অথচ সাধারণ মানুষ যাতে সঠিক উপযুক্ত মূল্যে পণ্য কিনতে পারে এ ব্যবস্থাই নিতে হবে সরকারকে। পণ্যের একতরফা দাম নির্ধারণে প্রচলিত পদ্ধতি তথা ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া স্বেচ্ছাচারিতা ও দস্যুবৃত্তি থামাতে হবে এখনই। জনগণের জন্য পণ্যের সহনীয় উচিত মূল্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকেই। এখনই সরকার যেন অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরেন, এটাই আজ জোরালো দাবি দেশবাসীর ও ভোক্তা সাধারণের। সরকারকে ব্যবসার নামে অসাধু সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। কার্যকর আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। প্লিজ, ব্যবসার আড়ালে দস্যুবৃত্তি এখনই থামান।

লেখক : সাংবাদিক