দ্বাদশ নির্বাচনে জনসম্পৃক্ততা ও প্রশ্নবিদ্ধ প্রোপাগান্ডা!

20

মিয়া জামশেদ উদ্দীন

‘ভোই কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিন, ভুয়া ভোটারে ধরিয়ে দিন।’ দ্বাদশ নির্বাচন আসন্ন। অনেকটা নাকের ডগায় উপনীত। কিন্তু জনসম্পৃক্ততা ও অংশগ্রহণ প্রশ্নবিদ্ধ; বরাবরই ঘুরেফিরে আসছে যেসব কথা। তবুও শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক, আমজনতা তা চায়। নির্বাচন যে আনন্দঘন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একেবারে গণভবন থেকে শুরু করে অজপাড়ার টি-স্টল পর্যন্ত স্বরগরম। এবং উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রাজধানী মেতে আছে মনোনয়ন আয়োজনে। এবং বিলি-বন্টনে ডামাডোল । সঙ্গে নির্বাচনমুখি নতুন নতুন দল ও তাদের চটকদারী কথাবার্তা; এসব ফুলঝুরি-মার্কা কথার জালে আটকা পড়ে আপামর জনতা! এরপরও জনগণের দৃষ্টি থাকে শিকারি ঈগলের মতো নির্বাচনের দিকে- দল ও প্রার্থীর দোষ-গুণ বা পিছিয়ে পড়া, সবই চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। এ যেন বিজ্ঞজনদের পাঠশালা; অনেকটা হাড়ির খবর পর্যন্ত বাদ যায় না, মুখরোচক কথাও। একদিকে দলের হিসাব-নিকাশ, অন্যদিকে প্রার্থীদের গুণবিচারী। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বা প্রশাসনের ভূমিকাও। তবে যতসব চটুল কথায়ও আকৃষ্ট হয়। যা কি-না হাসির খোরাক হয়; প্রতিপক্ষরা কিন্তু ভীষণ চটে… আবার তৃতীয় পক্ষের কাছে অম্লমধুর-আস্বাদন ! এবার যে কথাটি বেশি বেশি শোনা যাচ্ছে, খোদ প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ যেন নির্বাচিত হয়ে আসতে না পারে এবং দল থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতেও বাধা নেই, অর্থাৎ তিনি অভয় দিচ্ছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে না এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মযজ্ঞের নেতা-কর্মীরাও বহিষ্কার করা হবে না। প্রধানমন্ত্রীর এ সিদ্ধান্ত সর্বজন প্রশংসিত হয়েছে। এটি নির্বাচনে চমকপ্রদ ঘটনা বলা যায়। এবং দৃষ্টান্ত মুলকও বলা যায়। নির্বাচনে ডামাডোলে গাঁ-গ্রামে হামেশা যা বলতে শোনা যায়- ‘ওডা হুনছসনি, অতের গো গুরাইয়া-গুট্টো খারাইয়্যে; হেতে নিজের জান রক্ষা করতে দিন যায়, দশের দেশের কথা কইবো কখন।’
‘চাচা, সত্যকথা কইছেন, নির্বাচন আইলে নতুন নতুন কত পাগল দ্যাখা যায় ; খালি গা গা দাঁড়ায় থাকবে যে; এরা বসন্তের কোকিল। সবকিছু হানির (পানি) মত হাস্তা ভাবে;’ ‘ভাইপুত, হানিতো দুধের চাইতে মাঙ্গা;’ ‘হ্-চাচা, হেচা কথা কইছেন, নিজেরা পা ঘুটাইয়রে চোওথ আসমানে বসে থাকে; যার যে-দিন ভালা যাচ্ছে, আসছে দিন কলিযুগ। এ যুগে কিঅইবো খোদা-ই মালুম।’ ‘ভাইপুত, রাজনীতি তো রাজনীতিবিদদের কাছে নাই, একেবারে নগ্ন হস্তক্ষেপে মেতেছে ভিনদেশীরা, কোনোজনেমেও দেখি নাই এ কান্ড ওরা কি আমাগো কথা শুনবে? দেশের স্বার্থ জ্বলানজলি দেয়া কি উচিত হচ্ছে!’ ‘হ, চাচা এ কথা কইবো কে, আরারে পাগলে কামড়াইছে পানল্লার; নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা করে কেউ।’ ‘ভাইপুত শোন, জনগণ পাগল নয়, আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ফাঁদে পড়বে না।’ ‘চাচা, একটা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে- অন্যের উপর নির্ভর হওয়া; সহজভাবে বলতে হয়, গুণেধরা রাজনীতিতে নীতি ও আদর্শ বড়ই আকাল। বা দেওলিয়াপনা।’ ‘ভাইপুত, এটা আবার কোন রাজনীতি? তাহলে তো দুর্বৃত্তায়ন বলাটাই উত্তম।’
বাস্তবে রাজনীতিতে যা ঘটছে- অসংখ্য প্যাড সর্বস্ব দলের ছড়াছড়ি। কর্মী বিহীন জনপ্রিয়তা সর্বোচ্চ শিখরে, বা জনবান্ধব দল বলে হাঁকডাক! দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপি ভাঙনের মুখে পড়েছে! দলটি ভেঙে ভেঙে একাধিক দল, উপ-দল সৃষ্টি হয়েছে। দলের নাম তৃণমূল। ভারতেও এমন একটি দলের অস্তিত্ব রয়েছে। অবশ্য পশ্চিম বঙ্গে দীর্ঘ বছর ক্ষমতায় তৃণমূল কংগ্রেস। দলটির নেতা মমতা বন্দোপাধ্যায়। তিনি শক্তভাবে হাল ধরেছেন। ন্যাশনাল পর্যায়ে ইন্দিরাগান্ধির কংগ্রেস। নাজমূল হুদার তৃণমূল বিএনপি। তিনি এটির প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে হাল ধরেছেন এড. শেখ তৈয়বুর রহমান …। তবে দলটিতে অসংখ্য নতুন নতুন মুখ দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনে তাঁরা এককভাবে তিনশ’ আসনে প্রার্থী দেয়ার প্রস্তুতিও চ‚ড়ান্ত করেছে বলে দাবী করেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি জোটগতভাবেও ভেঙেছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহিম বীর বিক্রম-এর কিংস পার্টি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সঙ্গে ভিপি নূরও গা বেঁধেছে। যুক্ত ফ্রন্ট গঠন করেছে জাতীয় পার্টির ‘কাঁঠাল’ প্রতীকের ওই দল ও মুসলিম লীগ নিয়ে। ভিপি নূর আর কতদিন বা একা-একা মাঠে দৌড়াবেন। নিজের নিবন্ধিত দলও নেই; নির্বাচনে অংশ নিতে বা টিকেট নিশ্চিত না হলে নিজের অস্তিত্বও থাকবে না। সময় থাকতে কুলে ভিড়া উচিত। হয়তো তা বুঝেছেন তিনি। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী’র (বীর উত্তম) কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও ‘গামছা’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে। এদলে শিল্পী নকুল কুমার বিশ্বাস যোগ দিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে। তিনি নানাভাবে গানে গানে প্রার্থীতার জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন। সুপ্রিম পার্টিও নির্বাচন মাঠে। দলটির প্রধান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ হলেন নজিবুর বশর মাইজভান্ডারীর চাচাতো ভাইপুত।
নজিবুল বশর ভান্ডারীর তরীকত ফেডারেশন সহ ধর্মীয় সিলসিলা-পীরজাদাদের একাধিক দল রয়েছে নির্বাচন মাঠে। হেফাজত ইসলামও দৌড়ে রয়েছে নির্বাচনে। রাস্তায় হৈচৈ-চিৎকারকারীদের একজন জোনায়েদ সাকি ও তাঁর দল গণতন্ত্র মঞ্চ; তিনি রয়ে গেলেন মনে হয়! অবশ্য অপেক্ষায় আছি শেষ দেখার ওই বাম ঘরনার নেতার কর্মকান্ড। বাম দলের মধ্যে জাসদ ইনু’র হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির রাসেদ খান মেনন তো ক্ষমতাশীনদের মধ্যে বিদ্যমান। জাতিয় পার্টির (জেপি) আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও নির্বাচন মাঠে। সরকারের পক্ষে রয়েছেন কমরেড দীলিপ বড়ুয়া ও তাঁর সাম্যবাদী দল। বি. চৌধুরীর বিকল্প ধারা দৌঁড়ঝাপে কাছাকাছি রয়েছে। বাকী রয়েছে ড. কামাল হোসেন-এর গণফোরাম। অবশ্য তিনি কয়েক মাস আগে রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছেন। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ- খালেকুজ্জামান, বাসদ- মবিনুল হায়দার চৌধুরী (প্রয়াত), মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য ও আসম আব্দুর রবের জাসদ সহ বেশ কিছু দল নির্বাচনে অংশ নেয়ার কোন আলামতই দেখছি না। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বেশ কিছু নেতা-কর্মী জেলে আছে। নির্বাচনের আগেই ছাড়া পাওয়া উচিত। বিশেষ করে আমার উপজেলায় বিরোধী দলের এক কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা জেলে। বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আসলাম চৌধুরী এফসিএ। বেচারা রাজনীতি করতে এসে ফেঁসে গেলেন। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদস্য মেহেন্দি সাফারির পাতানো জালে আটকা পড়েন। মুসলিম এ ডান নেতা নীতিগতভাবে অপর চরম কট্টর ডানপন্থি ইহুদী সংগঠনের পক্ষপাত দোষে দুষ্ট ।
যাই হোক, সহসাই ওনার মুক্তি কামনা করি। সঙ্গে চট্টগ্রামের অপর একনেতা, আমির খসরু মাহমুদ, মির্জা ফখরুল ইসলামসহ সকল বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের। নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে আরো যেসব প্রদক্ষেপ নেয়া উচিত । মনোনয়ন পত্র সংগ্রহ ও জমা দেয়ার সময়সীমা বাড়ানো উচিত বলে মনে করি। অন্তত আরো ১ সপ্তাহ পেছানো প্রয়োজন রয়েছে। আরো যারা এখনো নির্বাচনের বাহিরে রয়েছেন, তাদের মত ও সিদ্ধান্ত পাল্টানোর সুযোগ দিতে হবে; নয়তো সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রশ্নোবান ও আপত্তি থাকতে পারে; সুযোগ ও অধিকার থেকে কোনভাবেই বঞ্চিত করা সঠিক হবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আরে শিথিল হওয়া উচিত। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিধি-শর্ত কঠিন হওয়ায় অনেকের আগ্রহ বাড়লেও শেষতক পেছনে সরে গেছে। এমন সব শর্তের কারণে নির্বাচনের আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি নিতে ফুসরত পাচ্ছে না। এক শতাংশ সমর্থন দেখাতে, ভোটারের আইডি, নাম্বার, স্বাক্ষর ও ছবি- এভাবে ৫-৭ হাজার ভোটারের এসব নমুনা স্বাক্ষর নেয়া চারটি খানি কথা নয়; তার সাথে ভোটার তালিকার সিডি ফি- ১০ হাজার টাকা, মনোনয়ন পত্র জমা দেয়াকালে ফি- ২০ হাজার টাকা।
নির্বাচনকে জনমুখী করতে এসব কঠিন শর্ত শিথিল করা উচিত। অতঃপর নির্বাচন এলে মজার মজার কথা শোনা যায়। আড়ালে আবডালে চুপেচুপে এসব কথা-অকথা আওড়াতে থাকে। এটিও প্রতিপক্ষের কাছে ফ্যাক্টর মনে হয়; বলতে শোনা যায়, ‘ঐ দেখছ, ওরা একাট্টা হয়ে জোট বেঁধেছে।’ সঙ্গে আরো যেসব কথা কর্ণগোচর হয়- প্রার্থীর বর্ণ, গোত্র-জাতপাত, আচার-কৃষ্টি, শিক্ষা-দিক্ষা, স¤প্রদায়, হাঁটা-চলা, অভ্যাস এবং প্রার্থীর বিয়েশাদি, সন্তান-সন্তানাদি এবং আত্মীয় -স্বজনদের আচরণবিধিও বাদ পড়ে না। সবচাইতে বেশী জোরালো বা তিব্রতর হয়, গোত্র ও স¤প্রদায়বিষয়াদি। অনেকটা পাগলা ঘোড়ার মতো ধাবমান। এসবের ঊর্ধ্বে একশতাংশ ভোটারও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অনেকটা তাদের সংখ্যালঘু বলা যায়। ভোটারদের তোড়ে উড়ে যায় সজ্জন ব্যক্তিবর্গ, অনেকটা বানডাকা প্রবল স্রোতে। সর্বশেষ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চমক দেখার অপেক্ষায়। ত্যাগী নেতার পাশাপাশি দানবীর শিল্পপতিরাও পিছে নেই। নিরেট সত্য হলো, এবার নির্বাচনে ভোটারদের ইচ্ছের প্রতিফলন হবে। তবে প্রার্থীর সংখ্যা যত বাড়বে, ভোটারদের অংশ গ্রহণ বাড়বে। সব উদ্যোগের পেছনে নির্বাচন কমিশনারের স্বচ্ছতা থাকতে হবে।
লেখক : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, কবি ও কলামিস্ট