দেড় বছরে ‘সংশোধনাগারে’ ৩২৩ শিশু-কিশোর

4

তুষার দেব

শিশু-কিশোরদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ছড়াতে থাকা গ্যাং কালচার-এর প্রবণতা রুখতে তাদের সংশোধনাগারে পাঠানোর ঘটনা বেড়েছে। গত দেড় বছরে নগরীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অপরাধ ও অভিযোগে শিশু আইনে তিনশ’ ২৯টি মামলা হয়েছে সিএমপির ১৬ থানায়। এর মধ্যে আসামি করা হয়েছে চারশ’ চার জনকে। আসামিদের প্রত্যেকেই গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে আদালতের প্রক্রিয়া শেষে ওই শিশু-কিশোরদের মধ্যে তিনশ’ ২৩ জনকে সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, নগরীতে এর আগে এত কিশোর অপরাধী কিংবা অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনার নজির নেই। পুলিশের এমন তৎপরতায় হালে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ছড়াতে থাকা গ্যাং কালচারে একপ্রকার লাগাম টানা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে অভিভাবক মহল ও মানবাধিকার কর্মীরা অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশু-কিশোরদের সংশোধনাগারে পাঠানোর পুলিশি প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখছেন। পাশাপাশি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামে একটি আধুনিক কিশোর-কিশোরী সংশোধনাগার তৈরি করার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
মানবাধিকার সংগঠক এডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান পূর্বদেশকে বলেন, শিশু আইনে অভিযুক্ত কারও বিচারের ক্ষেত্রে যেসব বিধিবিধান রয়েছে, সেগুলো কার্যকরভাবে অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করা জরুরি। তবে আমাদের এখানে বড় সঙ্কট হচ্ছে শিশু-কিশোরদের জন্য নির্ধারিত কোনও সংশোধনাগার না থাকা। এখন পর্যন্ত আইনের আওতায় শিশু-কিশোরদের সংশোধনের জন্য গাজীপুরের সংশোধনাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে বাস্তবে সেখানে সংশোধনের চেয়ে শিশু-কিশোররা উল্টো আরও বেশি অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। তাই চট্টগ্রামে একটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্বলিত কিশোর-কিশোরী সংশোধনাগার তৈরি করা অতি জরুরি।
নগর পুলিশের তথ্যমতে, ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাসে শিশু আইনে মামলা হয়েছে ৫৬টি। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৭৮ জনকে। এ মধ্যে বিচারাধীন রয়েছে ২৫টি মামলা। গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে ৬১ জনকে। এরপর ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম কোয়ার্টারে শিশু আইনে মামলার সংখ্যা ছিল ৩৫টি। আসামি ৪৭ জন। আর বিচারাধীন মামলা রয়েছে চারটি। শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয় ১৬ জনকে। দ্বিতীয় কোয়ার্টারে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মামলা হয় ৪৫টি। আসামির সংখ্যা ৬৭ জন। বিচারাধীন মামলা রয়েছে আটটি এবং সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে ৫৫ জনকে। তৃতীয় কোয়ার্টার অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দায়ের হওয়া ৬০টি মামলায় আসামির সংখ্যা ৭১ জন। এর মধ্যে বিচারাধীন মামলা ১৫টি। আর শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে ৫১ জনকে। একই বছরের শেষ কোয়ার্টারে ৬৩টি মামলায় আসামির ছিল ৯৪ জন। এর মধ্যে বিচারাধীন মামলা ২৭টি এবং শিশু-কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয় ৮৮ জনকে। চলতি ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রথম কোয়ার্টারে শিশু আইনে নগরীর ১৬ থানায় মামলা হয় ৩৯টি। আসামি করা হয় ৬৫ জনকে। বিচারাধীন মামলা ১৯টি এবং সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে ৩৫ জনকে। দ্বিতীয় কোয়ার্টারে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মামলা হয়েছে ৩১টি। আসামির সংখ্যা ৫৩ জন। বিচারাধীন মামলা চারটি এবং শিশু-কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে ১৭ শিশু-কিশোরকে। সবমিলিয়ে কিশোর অপরাধের ঘটনায় এখনও বিচারাধীন রয়েছে একশ’ চারটি মামলা। এসব মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে মারামারি, চুরি-ছিনতাই, মাদক সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া, কয়েকটি হত্যা মামলাও রয়েছে। অভিযুক্তদের বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় আদালত এসব কিশোরদের শিশু অপরাধ আইনের আওতায় শিশু-কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
পুলিশের এই তৎপরতার কারণে নগরীতে শিশু-কিশোরদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতার লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (জনসংযোগ) শাহাদাৎ হুসেন রাসেল। তিনি বলেন, নগরীতে অন্য যে কোনও সময়ের চেয়ে কিশোর গ্যাং কালচার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বিগত ২১ মাসে তিনশ’ ২৯টি মামলা এবং চারশ’ জনকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি পরিসংখ্যানগত বিবেচনায় সফলতা দাবি করলেও আমরা এটাকে নিয়ন্ত্রণে রেখে ধীরে ধীরে নির্মূল করতে চাই। শিশু-কিশোরদের গ্রেপ্তার করেই প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না। কারণ, গ্রেপ্তার হয়ে অপরাধীদের সঙ্গে মিশে ওদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তার চেয়ে বিপথগামী শিশু-কিশোরদের সংশোধনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে পরিবারের লোকজন। সন্তানদের সাথে অভিভাবকদের আরও বেশি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। এক্ষেত্রে পারিবারিক অনুশাসন ও কাউন্সিলিং অনেক বেশি কাজে আসতে পারে।