দেশ প্রেম ও প্রকৃতি লায়ন

1053

মানুষ ও প্রকৃতি পরস্পরের পরিপূরক। প্রকৃতি ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচে না; তেমনি মানুষ ছাড়াও প্রকৃতির মূল্য নেই। প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে নিজেকেই ভালোবাসা। এই যে পাহাড়, বন, শস্যখেত, নদী ও সমুদ্র নিয়ত মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। আমরা যখন সমুদ্রে যাই প্রকৃতিকে পাই, আমরা যখন পাহাড়ে যাই প্রকৃতিকে পাই। এই যে পাহাড়ের অবিরাম ঝরনা ধারা, এই যে সমুদ্রের অশান্ত তরঙ্গমালা মানব মনে অনির্বচনীয় অনুভূতি এনে দেয়, এই যে বনের সবুজ বৃক্ষরাজি, পাখপাখালি কী অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। কেননা মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। আর এ পৃথিবী মানুষের জন্য সৃষ্টি। যেখানে তিনি তার সবচেয়ে প্রিয় মানব জাতি সৃষ্টি করে পাঠিয়েছেন। আর প্রকৃতিও মহান সৃষ্টিকর্তার অপরূপ সৃষ্টি লীলা ও দান। যার মধ্য দিয়ে সৃষ্টি জগতের সমস্ত রহস্যের আদি ইতিহাস উন্মোচিত হয়। তাই তো স্রষ্টার সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয়। তবে যে ভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন প্রকৃতি ও মানুষকে আলাদা করে দেখার অবকাশ নেই। উভয়কে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। তা না হলে ভারসাম্যতা নষ্ট হয়ে যায়। অতীতে দেখা গেছে, যখনই প্রকৃতি হুমকির সম্মুখীন হয়েছে তখনই সে তার আপন নিয়মে ধ্বংসলীলাতে মেতে উঠেছে। যুদ্ধ, প্লেগ, কালাজ্বর, গুটিবসন্ত মহামারি আকারে ধারণা করছে। শত শত মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব মহামারি। সার্স, এইডস এর মতো রোগ দিয়ে মানুষকে জীবন বিধান মেনে চলার জন্য সতর্ক থাকার আভাস দিয়েছে প্রকৃতি। এ নিয়ম আর শিক্ষা মানুষ অতীতেও দেখেছে। বর্তমানে প্রকৃতির এই বৈরী আচরণে অদৃশ্য এক ক্ষুদ্র ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব ও মানবজাতি। আর এই ভাইরাসটির উৎপত্তি বিশ্বের এক জায়গায় হলেও তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, মানুষ অতীত ভুলে যায়। আর প্রকৃতি থেকে শিক্ষা নেয় না বলে দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় নিতে চায়। যার ফলে মানুষ দাঁড়ায় প্রকৃতির কাঠগড়ায় কালে কালে। পৃথিবীতে এর আগে গুটিবসন্ত, কলেরা, প্লেগ, ফ্লু যখন মহামারি আকারে এসেছিল তখন এর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ভয়াবহ কম থাকলেও বিভিন্ন প্রান্তের সাথে চলাচল সহজ না হওয়ায় এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েনি। বিশ্বায়ন আমাদের জীবনযাত্রাকে যান্ত্রিকভাবে সহজতর করে তুললেও একই সঙ্গে আমাদের ভাবতে শেখাল, খুব তুচ্ছ কারণেও ঘটে যেতে পারে এর সমাপ্তি, শেষ হয়ে যেতে পারে সবকিছু। অন্যায় অবিচার অহমিকা মানুষকে বিনাশ করে দেয় এ অবধারিত সত্য। ন্যায় আর সৎভাবে জীবনযাপন করলে পৃথিবীতে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটবে না। শ্রেণি বৈষম্যতার লড়াইয়ে প্রকৃতিতে হানা দিবে না সারা দুনিয়া। অন্যদিক মানুষ গৃহবন্দী বলে প্রাকৃতিক পরিবেশ তার প্রাণচঞ্চলতা ফিরে পেয়ে প্রমাণ করছে অস্বাভাবিকতাতে পৃথিবী ও মানুষ টিকে থাকবে না। ভারসাম্যহীন হলে প্রকৃতি তার আপন হাতে সব ঠিক করে নেয়। মানুষ ও প্রকৃতির নৈকট্যই পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। মানুষ যখনই প্রকৃতিকে আপন করে নেয়, তখনই সে হয়ে ওঠে প্রকৃতির মানুষ, ভূমি ও বৃক্ষের অত্যন্ত কাছের মানুষ। আর মানুষ যখনই প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যায়, সে নিজের ধ্বংস ডেকে আনে, সেই সঙ্গে পৃথিবীরও। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি তথা সারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সর্বাবস্থায়, সার্বক্ষণিকভাবে স্থিতিশীলতা, ইতিবাচক, অনুকূল অবস্থা ও পরিবেশ বজায় থাকা। যা উভয়েরই সহজাত প্রবৃৃত্তি। প্রকৃতি নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে লালন করে। আর মানুষেরও উচিত সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রকৃতির সর্বান্তক স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখা। আর এ জন্য উভয়তেই সময়োপযোগী সঠিক, নির্ভুল, নির্মল, যথোপযুক্ত সমন্বয়ের প্রয়োজন অত্যাবশ্যক। যার ব্যত্যয় ঘটলেই ঘটনা দুর্ঘটনায় অশান্তি নেমে আসে মানুষ ও প্রকৃতিতে। যা সামাল দেওয়ার আর কোনো সুযোগই অবশিষ্ট থাকে না। এ জন্য জীবন ও প্রকৃতিতে ভারসাম্য ও সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই। আর তাই সাগর, পাহাড়, পর্বত, বন, পশু, পাখি, হোক মানুষ, হোক রাষ্ট্র পরস্পরের প্রতি ক্ষমতা ও পেশিশক্তির অপব্যবহার পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। যেমন দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, হত্যাযজ্ঞ, স্বাধীন ও সার্বভৌম দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর ক্ষমতাশীল রাষ্ট্রের আগ্রাসন, জবরদখল, লুণ্ঠন ইত্যাদি। এ অপসংস্কৃতি সাময়িক তৃপ্তি এনে দিলেও কোনো এক সময় প্রকৃতির খড়গে এর প্রতিশোধ বা ধ্বংস অনিবার্য হয়ে যায়। অন্যদিকে জল, স্থল, জঙ্গলের স্বাভাবিক অগ্রযাত্রায় গতিরোধ, প্রতিরোধে প্রকৃতির ভারসাম্য বিনষ্ট হলে প্রকৃতি থেকে অমঙ্গলের সুনামী সবকিছু লন্ডভন্ড করে দেয়। এ অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি থেকে বাঁচার একমাত্র মহৌষধ হলো মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা, উভয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন, পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও আন্তরিকতার রসায়ন। বর্তমান সময়ে অপরিকল্পিত দ্রুত নগরায়ন হচ্ছে, আবাসিক প্রকল্পগুলো দখল করে নিচ্ছে শহরের চারপাশ, বিশ্বে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ এতটাই বেড়ে গেছে যে, বর্তমানে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, যার কারণে আঘাত হানছে ভূমিকম্প, জলোচ্ছ¡াস, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রকৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব আমাদের ওপরই ন্যস্ত। কিন্তু স্ব-উদ্যোগে কম সংখ্যক মানুষই এগিয়ে আসছে প্রকৃতি সংরক্ষণে। সুস্থ প্রকৃতিই ভালোবাসায় পূর্ণতা দিতে পারে। তাই প্রকৃতিকেই আখ্যায়িত করা যায় ভালোবাসার মূলমন্ত্র হিসেবে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই আমরা অবিবেচকের মতো জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে চলেছি। ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসও বৃদ্ধি পেয়েছে। একবার ভেবে দেখুন আপনজনের হাত ধরে কোনো বহতা নদীর ক‚লে কিংবা কোনো নিরিবিলি ছায়া সুনিবিড় উদ্যানে গিয়ে বসলে নদী ও উদ্যানের পরিবেশ যদি ভালো না থাকে তাহলে ভালোবাসাও ভালো লাগবে না। চারপাশে পাখি যদি মিষ্টি মধুর সুরেলা ছন্দে গান না গায় তাহলে মন প্রফুল্ল হয় না। গাছে গাছে যদি ফুল না ফুটে, সৌরভ না ছড়ায় তাহলে ভালোবাসাও পূর্ণতা পায় না। ফাগুনের বাতাস যদি না বয়ে যায়, তাহলে মনে আসে না যৌবনের বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ¡াস। অন্যায় অনিয়ম করে প্রকৃতিকে জয় করার মনোভাব নিয়ে অমানবিকতা প্রকাশ করছে মানুষ ও অন্য জীবদের প্রতি। মানব সমাজ আর প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যতাকে অনুধাবন করতে না পারলে পৃথিবী টিকে থাকবে না এটাই সত্য। বর্তমানে বিশ্বাস, অবিশ্বাস, নাস্তিক, আস্তিক সবাই এখন এক কাতারে সামিল হয়েছে। বাঁচার জন্য মানুষের প্রতিটি কাজের মধ্যে চেইন থাকা জরুরি। আজ করোনা ভাইরাস সে চেইন ভেঙে দিচ্ছে সামাজিক দূরত্ব স্থাপনের মধ্য দিয়ে। কারণ করোনা ভাইরাসকে প্রতিরোধ করতে হলে মানুষকে মানুষ থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ এ ভাইরাসের বাহক মানুষ। আর এ ভাইরাসের চেইন ভাঙতে হলে সামাজিকভাবে পারস্পরিক যোগাযোগ বন্ধ করতে হচ্ছে মানুষকেই। সমাজে থেকেও সমাজ বিচ্ছিন্ন মানুষ এখন। একজনের মৃত্যু অন্যজনের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে পিতার লাশের পাশে থাকে না সন্তান। এর চেয়ে মানসিক শাস্তি আর কি হতে পারে মানুষের জন্য। আবার হাজার কোটি টাকা দিয়েও চিকিৎসা করার সামর্থ্য থাকলে তা আজ অর্থহীন। তাহলে অসততা, দুর্নীতি করে বিত্তের পাহাড় গড়ে প্রভাবশালী হয়েও বিত্তবান মানুষটিও এখন সমাজে একঘরে হয়ে যায়, যদি করোনা ভাইরাস শরীরে বাসা বাঁধে। তাই এ মুহূর্তে আত্মিক ভাবে নিজের অন্যায়, ভুলের জন্য পরিতাপ করা উচিত প্রত্যেক মানুষকে। বিচ্ছিন্ন হয়েও মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে মানুষকে। একা বেঁচে থাকার কোন অর্থ হয় না। ভালো থাকতে হলে সমাজকে ভালো রাখতে হবে সকলে মিলে। বিশ্বের বেশিরভাগ জনগোষ্ঠীর অনৈতিক ও প্রকৃতি ধ্বংসকারী কর্মকান্ডের ফলে জীবনযাত্রার তথাকথিত মানের উন্নয়ন ঘটলেও, বেঁচে থাকার জন্য, টিকে থাকার জন্য যে জীবন দক্ষতা দরকার তা দ্রুত হারিয়ে গেছে। তাই ফসল ফলানো বা কৃষি এখন সবচাইতে অবহেলিত, অথচ খাদ্য ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকার কোন সম্ভাবনা নেই। অন্ন, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা এই মৌলিক বিষয়গুলো সমগ্র বিশ্ব এতটাই পুঁজির দাপটে বাণিজ্যিকীকরণ করে তুলেছে যে এই অতি প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে মানুষকে অমানবিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হতে বাধ্য হতে হচ্ছে। আমরা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছি ক্রমশ তা সত্যি। কিন্তু পরিবেশকে ধ্বংস করে আমরা অপরিকল্পিত এই উন্নয়ন সাধিত করছি। বর্তমানে বাংলাদেশের পরিবেশ ধ্বংস এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে সেখান থেকে ফিরে আসার সুযোগ ক্ষীণতর। যে নৈতিকতার মানদন্ড আমরা সভ্যতার ক্রমবিকাশে দাঁড় করিয়েছি তা আসলে কতটুকু সঠিক তা ভাববার সময় এসেছে। উন্নত দেশগুলোর ভোগবাদীতার অনুকরণে আমরা আরও নিকৃষ্টতর অনুসরণ নীতি গ্রহণ করেছি। আর বর্তমান সময়ে আমরা যদি প্রকৃতিকে ধ্বংস করি তা হলে আমাদেরও ধ্বংস অনিবার্য। কেননা প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে আজ অবধি কেউ রেহাই পায়নি। শান্তি, সুন্দর ও প্রেমময় বিশ্ব গড়ে তুলতে আসুন আমরা মানুষ ও প্রকৃতিকে ভালোবাসি। প্রাণান্ত ভালোবাসি বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের মালিক মহিয়াম, গরীয়ান সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিমান বিশ্ব অধিপতিকে। তাঁর সৃজিত সৌন্দর্যমন্ডিত সৃজনশীল সৃষ্টির সুপরিকল্পিত সুশৃঙ্খল পরিবেশ আমাদের সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও সৃজনশীল হতে অনুপ্রাণিত করে। প্রকৃতির এই ধৈর্যশীলতা, মহানুভবতা, উদারতা, আমাদের বিবেক, আমাদের আমিত্ববোধ, আমাদের ইন্দ্রিয়প্রবণতাকে স্বচ্ছ, সংযত করার একটি বিস্মকর পাইপলাইন। তাই মানুষকে প্রকৃতিপ্রেমী হতে হবে। প্রকৃতিকে ধ্বংসলীলার দিকে ধাবিত করলেই নেমে আসবে অশনি সংকেত এবং প্রকৃতিপ্রেমী হলেই প্রেমময় নির্ঝঞ্ঝাট আগামীর বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও মরমী গবেষক