দৃষ্টিহীনদের ‘দৃষ্টি’ সামাদ স্যার

66

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। পুরো নগরী আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। তবে মুরাদপুরের একটি আবাসিক হোস্টেলে আনন্দের মাত্রা ছিল অন্যরকম। ভালো ফলাফলের সবটুকুন আনন্দ নিয়ে মেতেছেন তারা আট জন। সবাই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার আনন্দটুকু ভাগ করে নিতে এসেছেন সামাদ স্যারের সাথে। শিক্ষার্থীরা অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে সামাদ স্যারের অবদান তুলে ধরেছেন একবাক্যে, ‘সামাদ স্যার না থাকলে আমরা কেউ এতটুকু আসতে পারতাম না’।
চোখের আলোতে তাদের কখনও এই পৃথিবী দেখা হয়নি। তবে মনের চোখে অনুভব করে চলেছেন এই জগত। তারা কেউ কখনও ভাবেননি এতটুকু পথ পাড়ি দিতে পারবেন, তবে তারা পেরেছেন। তাদের এই পারার পেছনে নিরলসভাবে ভালোবেসে কাজ করে যাচ্ছেন সামাদ স্যার। তিনি নগরীর মুরাদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে সরকারি দৃষ্টি ও বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
গতকালের ফলাফলে জিপিএ ৫ পেয়েছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. শাকিল খান। তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে পরীক্ষা দিয়েছেন। তবে তিনি প্রচুর পড়াশোনা করেও এসএসসিতে জিপিএ পেয়েছিলেন ৪ দশমিক ৪৪। তাতে মন খারাপ হয়েছিল তার। অনেকটা হতাশ হয়ে পড়াশোনা কমিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু একদিন সামাদ স্যারে ডেকে বলেছিলেন, দেখো শাকিল, জীবনে সবাই সাধারণ হতে পারে, কিন্তু অসাধারণ সহজে কেউ হতে পারে না। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে নিরলস পরিশ্রম করে যাও, একদিন ঠিকই তুমি অসাধারণ হয়ে উঠবে। সবাই এসএসসিতে যা ফলাফল করে, এইচএসসিতে তার চেয়ে আরও কম জিপিএ পায়। এটা সাধারণ ঘটনা। তুমি এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে দেখিয়ে দাও তুমি যোগ্য ছিলে। সেইদিন থেকেই আমি অনেক পড়াশোনা শুরু করি এবং আল্লাহ আমাকে সফলতা দিয়েছেন। তবে সামাদ স্যার না হলে এতটুকু কখনও আসা হত না, হয়ত সবার মত পরিবারের বোঝা হয়ে থাকতাম। তাই আল্লাহর কাছে দোয়া করি, প্রতিটি ঘরে যেন একজন করে সামাদ স্যার থাকেন। নিজের সফলতার পেছনের কারিগরের কথা এভাবেই বলছিলেন শাকিল।
শুধু শাকিল নয়, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ফারজানা ইয়াসমিন জানতেনও না অন্ধরা পড়াশোনা করতে পারে। একদিন স্যারের একটি ‘কার্ড’ পেয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। সেই ইয়াসমিন ফারজানা গতকাল ৩ দশমিক ৭৫ জিপিএ পেয়ে এইচএসসি পাস করেছেন। বড় হয়ে আইনজীবী হতে চান ইয়াছমিন। বাকিদের মধ্যে ইয়াসমিন আক্তার ২ দশমিক ৫৮, তানবীর চৌধুরী ৩ দশমিক ৩৩, সুরত আলম ৩ দশমিক ৮৩, হিমেল কান্তি দে ৪ দশমিক ০৮, ফারজানা ইয়াসমিন ৩ দশমিক ৭৫ ও আরফাতুল ইসলাম ৩ দশমিক ৬৭ জিপিএ অর্জন করেন। তবে সামাদ স্যার না হলে স্বপ্নগুলো কখনও ছোঁয়া হত না। এমনই অনুভূতি সবার।
কথা হয় সামাদ স্যারের সাথে। তাঁর পুরো নাম আবদুস সামাদ। বাড়ি খুলনায়। ১৯৭৭ সাল থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে আসছেন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পাঠ্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব বই লিখেছেন এই শিক্ষক। এছাড়াও কোরআন ও গীতাও ব্রেইলে লিখেছেন তিনি। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে তাঁর কাজ করার আগ্রহ কিভাবে জন্মালো ? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি পূর্বদেশকে বলেছেন, আমি যখন খুলনা বিএল কলেজে পড়তাম তখন ক্লাস শেষে দেখতাম সবাই চলে যেত। কিন্তু দুইজন সহপাঠী বসে থাকত। একদিন কৌতুহল থেকে জানতে চেয়েছিলাম, তারা কেন বসে থাকে ? উত্তরে তারা জানিয়েছিল, তারা দুজনই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাই একা যেতে পারে না। কারো সহযোগিতা ছাড়া তারা ক্লাস থেকে বের হতে পারে না এবং তাদের কলেজে তেমন কেউ সহযোগিতা করে না। সেদিনই আমি জানতে পারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা পড়াশোনা করতে পারে। তখন থেকেই তাদের সহযোগিতা করতে গিয়ে কেমন জানি অনুভূতি কাজ করত। তারপর ব্রেইল শিক্ষা পদ্ধতির উপর অস্ট্রেলিয়া থেকে কোর্স করি। সেই থেকে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে চলছে আমার জীবন। আমরা কোনো টাকার মোহ নেই। এসব আমাকে টানে না। তাদের প্রতিটি আনন্দ আমাকে চরম আনন্দ দেয়। এদের ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনা করতে পারি না। উল্লেখ্য, তিনি ১৯৮৯ সাল থেকে চট্টগ্রামের মুরাদপুরে বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন ।

জিপিএ ৫ পেল
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী
শাকিল
নিজস্ব প্রতিবেদক
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. শাকিল খান। সবধরনের সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছেন এইচএসসিতে। তার এই অসাধারণ ফলাফলে খুশি পরিবারের সবাই। ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমকে একীভূত করা গেলে সবধরনের সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন তিনি। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং এটাই তার স্বপ্ন বলে জানান। প্রতিবন্ধীরা কখনও বোঝা নয়, যদি তাদের সহযোগিতার সাথে সুযোগ দেওয়া হয়। সবাইকে এমন বার্তা দিতে চান শাকিল।
শাকিলের বাড়ি সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নে। বাবা আয়ুব খান ব্যবসা করেন। আর মা ফারজানা বেগম গৃহিনী। এসএসসিতে তিনি অর্জন করেছিলেন জিপিএ ৪ দশমিক ৪৪। এর আগে জেএসসিতে জিপিএ ৪ এবং পিএসসিতে জিপিএ ৩ দশমিক ৫ পেয়েছিলেন এই মেধাবী।
সময়টা গতকাল দুুপরের পর। ততক্ষণে ফলাফল জেনে গেছেন সবাই। ফলাফলের খবর আর শুভেচ্ছা বিনিময়ের হিঁড়িক শহরজুড়ে।
ওইসময় নগরীর মুরাদপুর বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের আবাসিক হোস্টেলে জড়ো হয়েছেন শাকিলেরা। সবাই সবার সাথে আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছিলেন। ওই সময় নিজের এমন ফলাফলের অনুভূতি জানাতে গিয়ে শাকিল বলেন, আমি এসএসসিতে অনেক পড়েছি, তবে জিপিএ ৫ পাইনি। তাই মন খারাপ ছিল। কিন্তু আমাদের সামাদ স্যারের সহযোগিতায় আবারও ‘হার্ডওয়ার্ক’ করা শুরু করি।
তিনি আরও জানান, আমি ছোটকাল থেকে অন্ধ ছিলাম না। ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত ঝাপসা দেখতাম। তারপর কোরআনে হাফেজে ভর্তি হই। সেখানে ১৫ পারা পর্যন্ত শেষ করি। সেসময় পুরোপুরি অন্ধ হয়ে পড়ি। তখন আম্মু আমাদের নিয়ে শহরে আসেন। মুরাদপুরের এই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। তারপর জেএসসি ও এসএসসি পাস করি রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। এরপর চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হই। আল্লাহ রহমতে জিপিএ ৫ অর্জন করি। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিব। ওখানে পড়াই আমার স্বপ্ন।
তার এমন ফলাফলে আনন্দে আত্মহারা মা ফারজানা বেগম। সংগ্রামগুলো সার্থক হওয়ার পথে। আমার কেমন লাগছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। ছেলের এমন ফলাফলে অনুভূতি জানতে চাইলে এমনটাই ব্যক্ত করেন ফারজানা বেগম। তিনি আরও বলেন, আমি ছেলে-মেয়েদের মানুষ করতে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসি। আমার প্রতিদিনের সংগ্রাম আজ সার্থক হওয়ার পথে। তার বাবার নিরলস পরিশ্রম ফসল আজ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, সন্তান প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মালে কখনও হীনমন্যতার চোখে দেখতে নেই। তাদের পাশে থেকে প্রতিদিন সাহস জোগাতে হবে। তারা চাইলে অসাধারণ কিছু করতে পারে। তারা কখনও বোঝা হবে না যদি বাবা-মা সচেতন হন।
চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়েছেন মাত্র ৫ জন। সেই পাঁচজনের একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শাকিল খান। তার এমন ফলাফলে আনন্দিত ওই কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবুল হাসান। তিনি জানান, এই ছেলে পুরস্কার পাওয়ার মত কাজ করেছে। তার কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে আমি নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করছি। তাকে নিজ থেকে পুরস্কৃত করবো।