দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারলে এমপি পদ ছেড়ে দেব

12

পূর্বদেশ ডেস্ক

যুক্তরাজ্যে সম্পদ ও ব্যবসা থাকার বিষয়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি যে তথ্য দিয়েছে, সেটি স্বীকার করে নিয়েছেন চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। তবে সেই সম্পদ ও ব্যবসা বাংলাদেশ থেকে পাঠানো টাকায় করা হয়নি দাবি করে বলেছেন, তার বাবা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ৫০ বছর আগে থেকেই বিদেশে ব্যবসা করেন। তিনি সেই ব্যবসার উত্তরাধিকারী। আর যুক্তরাষ্ট্রে পড়ার সময়ও তিনি ব্যবসা করেছেন। যুক্তরাজ্যে তার আয়কর নথিও আছে। খবর বিডিনিউজের।
করোনা ভাইরাস মহামারীর সময় যুক্তরাজ্যে সম্পদ ও ব্যাংক ঋণের সুদহার কমে যাওয়ার পর ঝুঁকি নিয়ে লাভবান হয়েছেন, এমন একটি কথাও বলেছেন এই আওয়ামী লীগ নেতা।
তার এসব তথ্য যাচাইয়ে নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের নিয়ে কমিটি গঠনের চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন, দুর্নীতির প্রমাণ পেলে সংসদ সদস্য পদ ছেড়ে দেবেন।
বিদেশে সম্পদ ও ব্যবসা থাকার বিষয়টি সামনে আসার দুই মাসেরও বেশি সময় পর গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে আসেন সাইফুজ্জামান, যিনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা আসন থেকে টানা তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জিতে সংসদ সদস্য হয়েছেন।
সাবেক ভূমিমন্ত্রী বলেন, আমার ব্যবসায়িক ক্যারিয়ার ৩০ বছরের উপরে, প্রায় ৩৫ বছর হবে। আর আমার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ১১-১২ বছর। আমার বাবার বিদেশের ব্যবসা ৫০ বছরের উপরে। সুতরাং, আমার বাবা আমাকে এভাবে ট্রেইনড করে দিয়ে গেছেন যে, দেশেও ব্যবসা করতে হবে, বিদেশেও ব্যবসা করতে হবে। শুধু লন্ডন-আমেরিকা নয়, যে দেশে সুযোগ আসে, সেই দেশে আমরা বিজনেস করি। এখানে লুকোচুরি করার কিছু নেই।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের শেষের নির্বাচনে সাইফুজ্জামানের আসনটি ছিল চট্টগ্রাম-১২। ওই বছর সেখানে জেতেন সাইফুজ্জামানের বাবা। ২০১২ সালের নভেম্বরের শুরুতে তিনি মারা গেলে উপনির্বাচনে নৌকা নিয়ে জয় পান সাইফুজ্জামান। পরের নির্বাচনে আসন পুনর্বিন্যাসে সেটি হয় চট্টগ্রাম-১৩।
২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনের পর মন্ত্রিসভায় ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর ২০১৯ সালের শুরুতে নতুন সরকারে ভূমি মন্ত্রী হন তিনি।
গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে ২৬ ডিসেম্বর টিআইবি গত ২৬ ডিসেম্বর ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের মন্ত্রিসভার অন্তত একজন সদস্যের নিজ নামে বিদেশে একাধিক কোম্পানি থাকার প্রমাণ রয়েছে, যার প্রতিফলন হলফনামায় নেই। মন্ত্রী ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন ছয়টি কোম্পানি এখনও বিদেশে সক্রিয়ভাবে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনা করছেন। যে সকল কোম্পানির মোট সম্পদ মূল্য প্রায় ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকা।
সরকার জানতে চাইলে তার নাম এবং এ বিষয়ক সব তথ্য ও তথ্যসূত্র দেওয়া হবে বলে জানালেও পরে ইফতেখারুজ্জামান বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে সেই ‘মন্ত্রীর’ নাম জানান। তিনি হলেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী।
তবে এসব ব্যবসার কোনো কিছুই আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া নেতার হলফনামায় উল্লেখ করেননি। নির্বাচনের আগে গণমাধ্যমের কাছে এ নিয়ে তিনি কথাও বলেননি। তবে আনোয়ারায় এক নির্বাচনি জনসভায় বলেছিলেন, আমি এক টাকাও দুর্নীতি করেছি, কেউ বলতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেব। এমপি, মন্ত্রী হলেও আমি ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান।
বিএনপির বর্জনের এই নির্বাচনে সাইফুজ্জামান বড় জয় পেয়েছেন। তবে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান হয়নি তার।
আনোয়ারা ও কর্ণফুলী আসনের সংসদ সদস্য বলেন, যেহেতু আমার বাবা ইংল্যান্ডের সঙ্গে ট্রেডিং ব্যবসা শুরু করেন ১৯৬৭ এ। ওই সূত্র থেকে আমাদের শুরু। ছোট বেলা থেকেই আমাদের লন্ডন-আমেরিকায় বাড়ি-ঘর, ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল। ওই সূত্র থেকে আমাদের কাজ।
অনেকে বলছে, আমি মন্ত্রী থাকার সময় আমার ব্যবসা সম্প্রসারণ হয়েছে। হ্যাঁ আমি এটা স্বীকার করছি। কেন আমি করেছি? কারণ, করোনার সময় বিশ্ব যখন লক ডাউন হয়ে গেল, তখন আমি দেখেছি, আমার জন্য সুযোগ এসেছে। ধাপ ধাপ করে রিয়েল এস্টেটের দাম পড়ে গেছে। ব্যাংক ঋণের সুদ কমে গেছে। আমি রিস্ক নিয়ে সেই সুযোগ নিয়েছি এবং ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছি।
সাইফুজ্জামানের বাবা আখতারুজ্জামান বাবু ছিলেন চট্টগ্রামের একজন নেতৃস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা। তিনি আরামিট গ্রæপ ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এর সভাপতি এবং চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় যে সম্পদের হিসাব দেওয়া হয়েছে, তাতে বিদেশে ব্যবসার তথ্য কেন নেই, তারও জবাব দিয়েছেন সাইফুজ্জামান। তিনি বলেন, ওই হলফনামায় কোথাও উল্লেখ নেই বিদেশের সম্পত্তি উল্লেখ করার জন্য। আমি মনে করেছি, যেহেতু এটি হলফনামার কলামে নেই, আমি শুধু শুধু বাড়তি কথা কেন বলতে যাব? সে কারণে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য ছাড়াই আমি এটা করেছি। এখানে আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই।
বিদেশে সম্পদ ও ব্যবসা থাকার বিষয়ে আলোচনা তৈরি হলেও এতদিন কেন কোনো জবাব দেননি, সেই বিষয়টিও ব্যাখ্যা করেছেন সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ।
তিনি বলেন, গত কিছুদিন ধরে আমাকে নিয়ে বেশ কিছু নিউজ হয়েছে দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে। অনেকের প্রশ্ন যখন এই নিউজগুলো এলো, তখন আমি কেন নিরব ছিলাম? আসলে আমি তখন দেশের বাইরে ছিলাম।
মন্ত্রী হিসেবে কোনো দুর্নীতি করেননি দাবি করে সাইফুজ্জামান জাবেদ বলেছেন, কেউ এটি প্রমাণ করতে পারলে তিনি সংসদ সদস্য পদ ছেড়ে দেবেন।
তিনি বলেন, আমি দলকেও বিব্রত করতে চাই না, সরকারকেও বিব্রত করতে চাই না। আমি খুশি হব, আমি মন্ত্রী থাকার সময় কোনো দুর্নীতি করেছি কি না এই বিষয়ে যদি একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি করা হয়।