দুর্গম পাহাড়ে বাড়িছাড়া কিছু তরুণ জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে

25

নিজস্ব প্রতিবেদক ও বান্দরবান প্রতিনিধি

পার্বত্য জেলা বান্দরবান ও রাঙামাটির সীমান্তবর্তী বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় অভিযান চালিয়ে নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সাতজন এবং পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের তিনজনসহ মোট দশজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। জঙ্গি সংগঠনের সাথে পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের কানেকশন এবং সশস্ত্র প্রশিক্ষণের তথ্য পাওয়ার পর গত কয়েকদিন ধরে র‌্যাব সংশ্লিষ্ট এলাকায় অভিযান পরিচালনা করছে। দুর্গম পাহাড়ে পরিচালিত অভিযানে বেশ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানানোর একদিন পর গতকাল শুক্রবার দুপুরে বান্দরবান জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানানো হয়।
র‌্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, দুর্গম পাহাড়ে বাড়িছাড়া কিছু তরুণ জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এদের সংখ্যা অর্ধশতাধিক হতে পারে। তাদের ধরতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সর্বাত্মক অভিযান চলছে। এর মধ্যে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা হলেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দ মারুফ আহমেদ মানিক, ছাতক উপজেলার রুফু মিয়া, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার ইমরান হোসেন শাওন, ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কাউসার শিশির, সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার জাহাঙ্গীর আহম্মেদ জনু, গোলাপগঞ্জ উপজেলার আবু বক্কর সিদ্দিক বাপ্পি, বরিশালের ইব্রাহিম আলী, বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার জৌথান বম, স্টিফেন বম ও মাল সম বম। এ সময় তাদের কাছ থেকে বেশকিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দ করা হয়। জব্দকৃত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে নয়টি এসবিবিএল বন্দুক, এসবিবিএল বন্দুকের ৫০ রাউন্ড গুলি, কার্তুজ কেইস ৬২টি, বোমা ছয়টি, দেশে তৈরি পিস্তল একটি, লিফলেট, জিহাদি বই, পোশাক ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সম্প্রতি নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র শীর্ষ নেতাদের ধরতে পাহাড়ে অভিযান শুরু হয়। জঙ্গিবাদে জড়িয়ে নতুন করে কথিত হিজরতের নামে ঘরছাড়া তরুণরা জামাতুল আনসারের হয়ে পাহাড়ি এলাকার আস্তানায় আশ্রয় নেয়। এসব আস্তানায় হিজরত করা তরুণদের ভারি অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় হিজরতের নামে বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হওয়া বিভিন্ন জেলার ৫০ তরুণের তালিকা প্রকাশ করে র‌্যাব। তাদের মধ্যে ৩৮ জনের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা প্রকাশ করা হয়। ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তঘেঁষা দুর্গম পাহাড়ে বাড়িছাড়া কিছু তরুণ জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। আর নতুন এ জঙ্গি সংগঠনকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ (কেএনএফ) নামে একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী। গোয়েন্দা সূত্র ও গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য সামনে আসে।
র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে টানা অভিযান চালিয়ে বান্দরবান ও রাঙামাটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’র সাতজন এবং পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের তিনজনসহ মোট দশজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে পার্বত্য অঞ্চলে অর্ধশতাধিক জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বলে তথ্য রয়েছে। শীর্ষ জঙ্গি আনিসুর রহমান ওরফে মাহমুদের নেতৃত্বে ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’ নামের নতুন উগ্রবাদী সংগঠনটি পরিচালিত হচ্ছে। এই সংগঠনে ছয় জন শূরা সদস্য রয়েছেন। যারা দাওয়াতি, সামরিক, অর্থ, মিডিয়া ও উপদেষ্টার দায়িত্বে পালন করছেন। শূরা সদস্য আবদুল্লাহ মাইমুন দাওয়াতি শাখার প্রধান, মাসকুর রহমান সামরিক শাখার প্রধান, মারুফ আহমেদ সামরিক শাখার দ্বিতীয় ব্যক্তি, মোশারফ হোসেন অর্থ ও গণমাধ্যম শাখার প্রধান, শামীম মাহফুজ প্রধান উপদেষ্টা ও প্রশিক্ষণের সার্বিক তত্ত¡াবধায়ক এবং ভোলার শায়েখ আলেম বিভাগের প্রধান হিসেবে সংগঠনে দায়িত্ব পালন করছে। তারা অস্ত্র চালনাসহ সশস্ত্র সংগ্রামের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গোপনে পরিচালনার জন্য বান্দরবান ও রাঙামাটির দুর্গম এলাকাকে বেছে নিয়েছে। এজন্য তারা স্থানীয় একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সহায়তা গ্রহণ করে। পার্বত্য অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ওই সংগঠন থেকে তারা তাদের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি অর্থের বিনিময়ে সংগ্রহ করে। সংগঠনের নেতৃস্থানীয়রা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের সদস্যদের সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে। গ্রেপ্তারকৃত পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের তিন সদস্য প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তারা কেএনএফের সামরিক শাখা কেএনএ’র সদস্য।
উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরুতে র‌্যাব সম্প্রতি হঠাৎ করে ‘স্বেচ্ছায় নিখোঁজ’ হওয়া কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর উগ্রবাদী ভাবধারায় বিশ্বাসী নতুন জঙ্গি সংগঠনের সন্ধান পায়। যার নাম জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া। যার বাংলা অর্থ, পূর্বাঞ্চলীয় হিন্দের জামাতুল আনসার। র‌্যাবের দাবি, নতুন করে দলভুক্ত করা সদস্যদের মোটিভেশন (উদ্বুদ্ধকরণ) ও প্রশিক্ষণসহ সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত হরকাতুল জিহাদ (হুজি) জেএমবি, নব্য জেএমবি, হিজবুত তাহরীরসহ অন্যান্য জঙ্গি সংগঠন থেকে আসা নেতৃস্থানীয়রা। নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন থেকে কয়েকজন সদস্যকে একত্রিত করে বিগত ২০১৭ সালে নতুন এই জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর গত ১০ অক্টোবর ‘জঙ্গিবাদে’ জড়িয়ে দুই বছরে বাড়ি ছাড়া ৫৫ তরুণের মধ্যে ৩৮ জনের একটি তালিকাও প্রকাশ করে র‌্যাব জানায়, দুই বছর থেকে দেড় মাসের মধ্যে এই তরুণরা নিরুদ্দেশ হয়। পার্বত্য জেলার দুর্গম পাহাড়ে তাদের জঙ্গিবাদের প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির দুর্গম অঞ্চলে র‌্যাব অভিযান শুরু করে।