দুদকের জালে চট্টগ্রাম জেল

108

দুনীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালে আটকা পড়ছে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার (জেল)। জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস ৪৪ লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে দুদকের নজরে আসে এ প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম কারা বিভাগের ৩৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সর্বশেষ গতকাল চট্টগ্রামের তৎকালীন ডিআইজি প্রিজন পার্থ গোপাল বণিক ও সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিককে ঢাকায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় পার্থ বণিকের বাসা থেকে ঘুষের ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এনিয়ে চট্টগ্রাম কারাগারে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ কারাগারে প্রতি মাসে অন্তত ৫ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ টাকার ভাগ উচ্চ থেকে নি¤œ সকল পর্যায়ে ভাগ হয় বলে জানা গেছে।
জানা যায়, গত বছরের ২৫ অক্টোবর ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, আড়াই কোটি টাকার ব্যাংক এফডিআর, এক কোটি ৩০ লাখ টাকার বিভিন্ন ব্যাংকের চেক এবং ১২ বোতল ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তার হন চট্টগ্রাম কারাগারের তৎকালীন জেল সুপার সোহেল রানা বিশ্বাস। এ বিষয়ে ভৈরব রেলওয়ে থানায় পুলিশ বাদি হয়ে মাদক ও মানি লন্ডারিং আইনে দুটি মামলা করেন। এরপর থেকেই মানি লন্ডারিং আইনে দায়ের হওয়া ওই মামলার তদন্ত শুরু করেন দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। এছাড়া এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
গ্রেপ্তারের পরপরই পুলিশের কাছে জেলার সোহেল রানা দাবি করেন, উদ্ধার করা টাকার মধ্যে ৫ লাখ টাকা তার এবং বাকি ৩৯ লাখ টাকা কারা বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি পার্থ কুমার বণিক ও চট্টগ্রাম কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিকের।
দুদকের তদন্তকালে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী, শ্যালকের নামে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও যশোরে ২৬টি ব্যাংক একাউন্টে ১৫ কোটি টাকা লেনদেনেরও তথ্য পাওয়া যায়।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটিও চট্টগ্রাম কারাগারের ব্যাপক দুর্নীতির প্রমাণ পায় বলে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন। প্রতিবেদনে তৎকালীন ডিআইজ পার্থ গোপাল বণিক (বর্তমানে সিলেটে) এবং জ্যেষ্ঠ জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিককে (বর্তমানে সিলেটে) অনিয়মের জন্য দায়ী করে। এছাড়া তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের মাধ্যমে অনুসন্ধান করার সুপারিশ করে কমিটি। পরে তাদের বিভিন্ন স্থানে বদলিও করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও সুপারিশ করে এ কমিটি।
সূত্র জানায়, সোহেল রানার ঘটনার পর দুদকের নজর পড়ে চট্টগ্রাম কারাগারের দিকে। দুদক জানতে পারে কারাগারে দুর্নীতিতে শুধু জেলার সোহেল রানাই নন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও জড়িত। দুর্নীতি তদন্তে ঢাকা থেকে উচ্চ পর্যায়ের কমিটিও গঠন করা হয়। দুদকের উচ্চ পর্যায়ের তদন্তে সোহেল রানার কর্মকাÐে যাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দুদক এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য পেয়েছে তাদেরই জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নেয় দুদক। এর মধ্যে গত ২২ জুলাই থেকে তিন দিন ধরে সেই সময়ে চট্টগ্রামে কর্মরত ৩৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদও করেন উচ্চ পর্যায়ের এ কমিটি।
কমিশনের পরিচালক মানসুর ইউসুফের নেতৃত্বে একটি টিম তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সোহেল রানার ঘটনার পর তাদের বিভিন্ন কারাগারে বদলি করা হয়।
যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন, কারাগারের সাবেক ডেপুটি জেলার হুমায়ন কবির হাওলাদার (বর্তমানে পঞ্চগড়), মো. ফখর উদ্দিন (বর্তমানে মাগুরা), মনজুরুল ইসলাম (বর্তমানে নড়াইল), মো. আতিকুর রহমান (বর্তমানে দিনাজপুর), মু. মুনীর হোসাইন (বর্তমানে ঝালকাঠি), আব্দুস সেলিম, হিসাব রক্ষক এমদাদুল ইসলাম (বর্তমানে বান্দরবান), সার্জেন্ট ইন্সপেক্টর আনজু মিয়া (বর্তমানে পটুয়াখালী), প্রধান কারারক্ষি মো. মোসলেম উদ্দিন (বর্তমানে পঞ্চগড়), আব্দুল করিম (বর্তমানে ভোলা), বেলাল হোসেন (বর্তমানে বান্দরবান), সহকারী প্রধান কারারক্ষি লোকমান হাকিম (বর্তমানে খুলনা বিভাগের সদর দপ্তরে)।
এছাড়া বর্তমানে সিলেট বিভাগীয় দপ্তরে থাকা কারারক্ষী কাউছার আলম, আরিফ হোসেন, আনোয়ার হোসেন, শহীদুল মাওলা, শরীফুল ইসলাম, ময়মনসিংহ বিভাগীয় দপ্তরের অংচিং হলা মার্মা, শাহাদাত হোসেন, আব্দুল হামিদ, রুহুল আমিন, রংপুর বিভাগীয় দপ্তরের ইকবাল হোসেন, শামীম শাহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে থাকা এসএম মোভন, অলি উল্লাহ, মো. মাজহানুল হক খন্দকার, আবুল খায়ের (বর্তমানে নোয়াখালী), মহসিন তফাদার (বর্তমানে ফেনী) ত্রিভূষণ দেওয়ান (বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া), স্বপন মিয়া (বর্তমানে নোয়াখালী), মিতু চাকমা (বর্তমানে বান্দরবান), জুয়েল মিয়া (বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া), শাকিল হোসেন (বর্তমানে চাঁদপুর), বিল্লাল হোসেন (বর্তমানে বান্দরবান), শিবারণ চাকমা (বর্তমানে কুমিল্লা) ও ওসমান গণি (বর্তমানে নোয়াখালী)।
দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২ এর উপ-পরিচালক মাহবুব আলম জানান, সোহেল রানার সময় কর্মরত থাকা অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। উচ্চ পর্যায়ের টিম তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।
এদিকে চট্টগ্রামের ডিআইজি প্রিজন (বর্তমানে সিলেটে) পার্থ গোপাল বণিকের বাসা থেকে ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল রবিবার বিকেলে ধানমÐির ভুতের গলিতে পার্থ গোপাল বণিকের নিজ ফ্ল্যাট থেকে টাকাগুলো উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে আটক করা হয়েছে বলে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।
দুদক সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের তৎকালীন ও বর্তমানে সিলেটের ডিআইজি প্রিজনস পার্থ গোপাল বণিক ও জ্যেষ্ঠ জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিককে (তৎকালীন চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন) গতকাল রবিবার সকাল দশটা থেকে দুদক কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাদের দুদকের কার্যালয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সিলেটে দায়িত্ব পালনের আগে চট্টগ্রাম কারাগারে দায়িত্ব পালন করেন পার্থ গোপাল বণিক। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তাদের নিয়ে অভিযানে যায় দুদকের পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফের নেতৃত্বে একটি দল। দুদকের দলটি ভুতেরগলি এলাকায় পার্থ গোপাল বণিকের বাসায় বিকেলে অভিযান চালায়। ওই বাসা থেকে ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। দুদক কর্মকর্তাদের ধারণা, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা এই অর্থ বাসায় রেখেছিলেন ডিআইজি প্রিজনস পার্থ গোপাল বণিক।
অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া দুদক পরিচালক মুহাম্মদ ইউছুফ সাংবাদিকদের বলেছেন, তার ঘোষিত আয়কর ফাইলে এসব টাকার ঘোষণা নেই। আমাদের মনে হয়েছে এসব টাকা অবৈধ আয় থেকে অর্জিত।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে দুর্নীতি অনিয়ম ওপেন সিক্রেট। ওই সময় ডিআইজি প্রিজন পার্থ গোপাল বণিক, সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক ও সোহেল রাণা বিশ্বাসের তত্ত¡াবধানে দুর্নীতি চলছিল। সোহেল রানা ছিলেন তাদের ক্যাশিয়ার। তার কাছে জমা টাকা দিন ও মাস শেষে ভাগ হত। মাসে অন্তত ৫ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন হত বলে অভিযোগ রয়েছে। এখনো তা অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, কারাগারের দুর্নীতি এখনো কমেনি, আগের মতই রয়ে গেছে। প্রতি জন বন্দির স্পেশাল দেখা করতে ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা নেয়া হয়। সাধারণভাবে দেখা করতে নেয়া হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। এছাড়া নি¤œমানের খাদ্য সরবরাহ করেও হাতিয়ে নেয়া হয় লাখ লাখ টাকা। কারাভ্যন্তরে অবাধে চলে মাদক ব্যবসা। ঢুকে যাচ্ছে ইয়াবা। ইয়াবা বিক্রির টাকার ভাগ পায় সকল পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে ইয়াবাসহ কারারক্ষীসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া সুস্থ বন্দিকে টাকার বিনিময়ে মেডিকেলে ভর্তি করা হলেও প্রকৃত অসুস্থরা সিট পান না বলেও অভিযোগ রয়েছে।