থামছেনা নৌপথে মৃত্যুর মিছিল দুর্ঘটনারোধে কঠোর হতে হবে কর্তৃপক্ষকে

7

নদী পথে দুর্ঘটনার খবর নতুন নয়। বছরে প্রায় চার থেকে পাঁচটি দুর্ঘটনা ঘটছে নদী পথে। এসব দুর্ঘটনায় শতশত মানুষ মৃত্যুবরণ করছে, কিন্তু দুর্ঘটনারোধে নানা পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও দৃশ্যত কোন উদ্যোগ লক্ষ করা যায় না। গত কয়েকদিন আগে করতোয়া নদীতে বয়াবহ নৌ-দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ৭০টি তরতাজা প্রাণ পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনায় নৌ-পথের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। আগের ধারাবাহিকতায় নৌ কর্তৃপক্ষ দায়সারা বক্তব্য দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে, বাস্তবে নৌরুটে আদৌ নিরাপদ ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করা যাবে কিনা-তা নিয়ে স্পষ্ট কোন কিছু কর্তৃপক্ষ বলেনি। উল্লেখ্য যে, করতোয়ার ভযাবহ নৌ-দুর্ঘটনায় নিহতদেও মধ্য থেকে এ পর্যন্ত ৬৮টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ৬৮ লাশের মধ্যে নারী ৩০, পুরুষ ১৭ ও শিশু ২১ জন। খুবই বেদনাদায়ক। গতকাল ৬ দিনেও উদ্ধার অভিযানের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় প্রশাসনের দেয়া তথ্যমতে, এখনো চারজন নিখোঁজ রয়েছেন। প্রতিনিয়ত নৌকাডুবিতে এভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটছে। নদীতে ঝুঁকি নিয়ে নৌকা-ট্রলার চলাচল করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও উদাসীন। উল্লেখ্য যে, নৌ-দুর্ঘটনার শিকার প্রায় সকলই হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলে জানা যায়। করতোয়ার বোদার ঘাট নামে খ্যাত এ এলাকা হিন্দু সম্প্রদায়ের তির্থ এলাকা। প্রতি বছরই দুর্গাপূজা ঘিরে এই ঘাটে বিপুল জনসমাগম হয়। দুর্গাপূজা ঘিরে এই ঘাট দিয়ে হিন্দু স¤প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষের নদী পারাপার হয়, যা কর্তৃপক্ষের আজানা নয়। এরপরও যাত্রী পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল, যা তারা করেনি। কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার এড়াতে পারে না। গত রবিবার দুপুরে বোদা উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের আউলিয়া ঘাটে হিন্দু ধর্মাবলম্বী পুণ্যার্থীদের বহনকারী নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। মহালয়া উপলক্ষে আউলিয়া ঘাট থেকে নৌকায় করতোয়া পাড়ি দিয়ে পূর্বপাড়ের বড়শশী ইউনিয়নে ঐতিহাসিক বদেশ্বরী মন্দিরে যাচ্ছিলেন তারা। কিন্তু ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ওঠায় মাঝ নদীতে নৌকাটি ডুবে যায়। লাশের মিছিল আর অসহায় স্বজনের কান্নায় নৌপথে বাতাস ভারি হয়ে ওঠার দৃশ্য এ দেশ বারবার দেখে আসছে। গত সাত দশকে দেশে ২ হাজার ১২২টি নৌদুর্ঘটনায় সরকারি হিসেবে ৬ হাজার যাত্রী নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় ২০ হাজার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৪১টি। সুষ্ঠু তদন্তে পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দীপঙ্কর রায়কে আহŸায়ক করে বোদার ঘটনায় পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জানি না এ কমিটির সুপারিশগুলো আলোর মুখ দেখবে কি না? অতীতের ঘটনাগুলো হতাশা ছাড়া কিছু নেই। গোটা দুনিয়ায় সবচেয়ে নিরাপদ হলো নৌপথ। কিন্তু নদীমাতৃক এই দেশে নৌপথকে গত ৫১ বছরেও নিরাপদ করা গেল না। সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘ নদীপথ সচল করার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে গত ১৪ বছর ধরে। ইতোমধ্যে কিছু নৌপথ যান চলাচলে সচলও হয়েছে। কিন্তু নজরদারি নেই এ পথে; তা আবারো স্পষ্ট হলো গত রবিবারের নৌদুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। এমনকি নৌদুর্ঘটনা রোধে সামান্যতম নিয়ম-কানুন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না! আমরা মনে করি, নৌনিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, বিআইডব্লিউটিএর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। সরকারকে নৌদুর্ঘটনাগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নৌ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়কে পুনর্বাসন কাজে এগিয়ে আসতে হবে। নৌচলাচলের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ নৌরুটগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন এবং এর তীরবর্তী লোকালয়গুলোয় উদ্ধার কর্মীদের টাস্কফোর্স গঠন করে এদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অগডুত মানুষের নিরাপদ যাতায়াত ও সুষ্ঠু ব্যবসা-বাডুজ্য অব্যাহত রাখতে নৌপথের দিকে নজর দিতে হবে জরুরিভিত্তিতে।
এ ছাড়া আমরা মনে করি, প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করার পাশাপাশি দোষী ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমে আসবে। পাশাপাশি লঞ্চ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের কঠোর শাস্তির বিধান করা জরুরি। সেইসঙ্গে সঠিক নকশা, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা এবং চালকের দক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই দুর্ঘটনার সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে। এর অন্যথা হলে কিংবা দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে নৌপথে শৃঙ্খলা আনা যাবে না।