তেল সমাচার !

34

সকিনার বাপ ঈদের তিনদিন পর আসিয়া গলাগলি করিল। সচরাচর ঈদের দিনই সকিনার বাপ, মাস্টার সাহেব মরহুম আকবর মিয়া আমার মকানে হাজির হইতেন। এই মর্তবা আকবর মিয়া নাই। মাস্টার সাহেব আসিয়াছিলেন। মাগার সকিনার বাপ আজকেই আসিলেন। সোফায় তশরিফ লইয়া অভ্যাস মোতাবেক পায়ের ওপর পা তুলিয়া নাচাইতে লাগিলেন। বাজার হইতে ভোজ্য তেল গায়েব হইয়া গিয়াছে। এখন পানি দিয়া রান্না করিবার রেসিপি গুগোলে তালাশ করিতে হইবে। তেল ছাড়া জীবন অচল। ভোজ্য তেল, জ্বালানি তেল, মালিশের তেল, মোদ্দা কথা তেল হীন জিন্দেগি বিলকুল খসখসে। তেলের অতি ব্যবহারে রাজনীতি এখন পিচ্ছিল। পাতিলায় ঢালার তেল নাই, তেল লইয়া গেল গেল অবস্থা। মন্ত্রী মহোদয়ের বয়ানে পাবলিক খোশ হইতে পারিতেছে না। তিনি ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করিয়া ভুল করিয়াছেন বলিয়া স্বীকার করিলেও বিশ্বাসের ওপর তো আর মন্ত্রণালয় চলেনা। মন্ত্রণালয় চলে মেধার ওপর, দুরদর্শিতার ওপর। এখন কী মানুষ তেলের বদলে শুধু বিশ্বাস দিয়াই রান্না-বান্না করিবে ? বাজারের ফর্দে তেল দেখিলে জিছিম ঠাÐা হইয়া যায়। বানরের পিচ্ছিল তৈলাক্ত বাঁশ বাহিয়া উঠিবার অংক কষিতে কতো লিটার তেলের প্রয়োজন তাহা নিকাশ করা কঠিন হইয়া পড়িবে। আপনি তেলের ইস্তেমাল সঠিকভাবে করিতে পারিলে আপনি কামিয়াব। অফিসের বসকে যথা সময়ে যথাস্থানে তেল দিতে সক্ষম হইলে আপনার প্রোমোশন রোখার সাধ্য কাহার ? নেতা কিংবা বড়ভাইদের আচ্ছা করিয়া তেল মর্দন করিলে নির্ঘাত ব্যবসা করিতে পারিবেন। নিদান পক্ষে বিনা টিকিটে রেলে ভ্রমণ করিতে পারিবেন।
মোগল সম্রাট আকবরের সভাসদের মোল্লা নাসির উদ্দিন ওরফে মোল্লা দোপেয়াজা আর বীরবলের গল্প পড়েন নাই এহেন মানুষ কম। একদা বাদশাহ গাজরের হালুয়া খাইয়া বেহদ খোশ হইয়া গাজরের কিঞ্চিৎ প্রশংসা করিলে মোল্লা দোপেয়াজা দশগুন বাড়াইয়া গাজরের তারিফ করিয়া জিল্লে এলাহীকে খুশি করিয়া দিয়াছিলেন। ইহার পরদিন হইতে প্রতিদিন গাজর রান্না করিতে আরম্ভ করিল শাহী বাবুর্চিরা। কোনোদিন গাজরের সবজি, কোনোদিন সালাদ, কোনোদিন হালুয়া। বাদশাহ ত্যাক্ত বিরক্ত হইয়া একদিন কহিলেন-গাজর ছাড়া তোমরা কী আর কিছু চোখে দেখোনা ? ব্যাস জিল্লে এলাহী ইহাতক কহিতেই মোল্লা দোপেয়াজা চোট-পাট আরম্ভ করিয়া দিলেন বাবুর্চিদের উদ্দেশ্যে। এক পর্যায়ে তিনি কহিলেন-গাঁজর কী কোন খাওয়ার জিনিস ? বাদশাহ সহ বাকি সভাসদ তাজ্জব হইয়া তাহার গিরগিটি পনা দেখিয়া হয়রান পেরেশান। বাদশাহ কিয়তক্ষন পর বাদশাহ কহিলেন- মোল্লা তুমি তো এতদিন গাজরের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলে, আজকে আচানক গাজরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কেন ? মোল্লা দোপেয়াজা তাৎক্ষণিক কুর্নিশ জানাইয়া কহিল-জাহাঁপনা, আমি তো আপনার চামচা, গাজরের না। এতদিন আপনি গাঁজর পছন্দ করিয়াছেন তাই আমি গাজরের তারিফ করিয়াছি। আজকে আপনি গাঁজর অপছন্দ করিয়াছেন আমার চৌদ্দ গুষ্ঠির হিম্মৎ নাই গাজরের তারিফ করার। ইতিহাসে বীরবল আর মোল্লা দোপেয়াজারা এই ছুরতের তেলবাজি করিয়াই সংসার চালাইত। বর্তমান সমাজেও বীরবল ও মোল্লা দোপেয়াজা বেশুমার। যাক এই তেল ও তেলবাজির কথা আর নাইবা কহিলাম। এখন রান্নার তেলের সংকটের কথা বয়ান করি। বড় বিবি গুলবদন তেলের কথা আমাকে কহিতে ভয় পায়। ভয় পাইবারই কথা। তেলের কথা বাজারের লিস্টে দেখিলে মাথা চক্কর দিয়া চোখ ঝাপসা হইয়া আসে। যেইদিন লিস্টে ভোজ্য তেল থাকিবে সেইদিন গুলবদন কায়দা করিয়া মেহেরজান কে আমার হাতে লিস্টি ধরাইয়া দিতে পাঠাইয়া দিবে।বাজারের ফর্দ হাতে মেহেরজানের হাসি দেখিয়া আমি মুর্চা যাইবার যোগাড়।কারণ মেহেরজানের তৈলাক্ত হাসির আড়ালে লুকাইয়া থাকে খরচের বিশাল ফর্দ্দ। মেহেরজানের তৈলাক্ত হাসি দর্শনে মুখ দিয়া আর কথা সরে না। শৈশবে দাদির বিনা তেলের মুরগি রান্নার গল্পটা শোনাইলে সকলে হো হো করিয়া হাসিয়াছিল স্রেফ। দাদি চশমার ইস্তেমাল করিতেন না। বয়সের কারণে চোখে কম দেখিতেন। নাতিনের শ্বশুর বাড়ির মেহমান আসিলে ঢের সারা রান্নায় দাদিও অংশ নিয়া মুরগি রান্নায় উনুনের পাশে বসিয়া গিয়াছিলেন। রান্না করিতে গিয়া পাশ হইতে তেলের বোতল টা লইয়া চিপি না খুলিয়াই উনুনের ওপর পাতিলার ওপর কিছুক্ষণ ধরিয়া কাঁচা-পাকা মাথার চুলে চিপি সহ বোতলের মুখটা ঘষিয়া রান্নার কাজে মাতিয়া উঠিল। বিনা তেলে দাদির মুরগি রান্না হইয়া গেল।গুলবদন আর মেহেরজান কে কহিয়া থাকি মাঝে মাঝে দাদির মত বিনা চশমায় রান্না করিও তাহাতে অন্তত তেল বাচিয়া যাইবে। মাঝে মাঝে এই ছুরতের ভুল গুলি বিনোদনের সহিত খানিকটা স্বস্তিও দেয়। আমার দুই বিবি বড়ই হুঁশিয়ার, ফওরান বুঝিয়া যায় যে আমি কোন গল্প কখন শোনাই এবং কেন শোনাই। তাই তাহারা হাসিতে হাসিতে কহিয়া থাকে, দাদির জমানা এখন নাই। গুলবদন গুনগুনাইয়া গাহিয়া উঠিল-গুজরাহ হুয়া জামানা আতা নেহি দো-বারা, হাফেজ খোদা তোমারা। মেহেরজান খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। তামাম রমজানে ভাজা- পোড়া ইফতারি খাইতে খাইতে তেলের স্টক শেষ। অনেক দোকানে চড়া মূল্যেও তেলের দেখা পাই না। তেলের সন্ধান পাওয়া গেল পত্রিকার পাতায়। তেলের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে দোকানের সুড়ঙ্গে, দোকানির ঘরে,গুদামে। সংবাদে প্রকাশ এই পর্যন্ত ১৮ হাজার ৩৭৮ লিটার অবৈধ সয়াবিন তেল জব্দ করিয়াছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ টিম। হয়তো এই লেখা প্রকাশ হইতে হইতে আরও কয়েক হাজার লিটার এর সন্ধান পাওয়া যাইবে। পত্রিকায় এই সংবাদ পড়িয়া শোলে ফ্লিমের গাব্বার সিং এর সেই মশহুর ডায়ালগ টা মনে পড়িয়া গেল- আব তেরা কিয়া হোগারে কালিয়া ? কালিয়ার কিছু হইবে কিনা জানি না। হয়তো জরিমানা হইবে, ছাড়িয়া দিবে। কারণ এই ছুরতের কালিয়াদের রক্ষা করিতে এই মুল্লুকে গাব্বার সিং এর অভাব নাই। ব্যর্থতার দায় কাঁধে লইয়া পদত্যাগ করিবার ইতিহাস এই মুল্লুকে নাই। সকলের মানসিকতা যেন সেই হিন্দি ছবির সংলাপটার মতো-আপনা কাম বনতা, ভাড়মে যায় জনতা’ (নিজের স্বার্থ উদ্ধার হোক,জনগণ গোল্লায় যাক)। আচানক সকিনার বাপের ট্যাং নাচানি থামিয়া গেল। চক্ষু খুলিয়া আমার তরফ তাকাইলেন, মুচকি হাসি দিয়া কহিলেন, ভাড়াটিয়া আর পড়শিদের জ্বালায় অতিষ্ঠ। যখন তখন ডোর বেল বাজাইয়া এক কাপ, আধা কাপ তেলের জন্য দরোজায় খাড়াইয়া থাকে। তাহাদের কী করিয়া বোঝায় যে আমিও তেল কিনিয়া খাই, আমার কোন তেলের খনি নাই। তেলের জন্য আসিও না। তাহা হইলে আমার বউ আমাকে আস্ত রাখিবেনা। চাইলে জান লইয়া চলিয়া যাও মাগার তেল ধার চাহিয়া আমার সংসারে অশান্তির আগুন জ্বালাইও না। মাগার কহিতে পারিনা। স্রেফ তেলতেলে কথা কহিয়া বিদায় করিয়া দিবার কোশিশ করিয়া থাকি। জনৈক মার্কিন সিনেটর কহিয়াছিলেন, তেল হইল তলোয়ারের চাইতেও শক্তিশালী।
সমাজের কোথায় তৈলবাজ নাই ? রাজনীতি, শিক্ষা, সাহিত্য কোথায় নাই বলুন। মানুষ আপন চরকায় তেল দিতে গিয়া হিতাহিত জ্ঞান হারাইয়া অযোগ্যদের তৈলাক্ত করিতেছে এইদিকে বাজারে তৈল সংকট হইলেও সংশ্লিষ্ট মহল নাকে তেল দিয়া নাক ডাকিতেছে। বাণিজ্য মন্ত্রীর মূল্যবান কথা গুলিও পাবলিকের কানে বিরক্তিকর প্যানপ্যানানি শোনাইতেছে। ভোজ্য তেলের সহিত পাল্লা দিয়া বাকি পণ্য গুলিও দুর্মূল্যের ভিড়ে উত্তাপ ছড়াইতেছে।এই আলামত বিলকুল ভালো টেকিতেছেনা। সামগ্রিক পরিস্থিতি ‘ডাল মে কুচ কালা’ লাগিতেছে। সকিনার বাপ কহিলেন, যাহারা এই তেল লইয়া তেলেসমাতি করিতেছে তাহাদেরকে দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি প্রদান করিলে তাহারা কিছুটা হইলেও হেদায়েত হইবার কোশিশ করিবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট