তিমিরাচ্ছন্ন

8

‘সেই কখন ভোর হয়েছে, এখনো ওঠার সময় হয়নি তোর? আটটা তো সেই কখন বেজে গেছে।’ মায়ের এমন চিৎকারে ঘুম ভাঙে তিমিরাক্ষীর। কিন্তু বিছানা তাকে ছাড়তেই চায় না। ঘুম তার খুব পছন্দের। রাতে দেরিতে ঘুমোতে যাওয়া, সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা -এ যেন তার এক নেশা। কিন্তু পারল আর কই। উঠেই যেতে হল। আটটা বাজেনি এখনো। মা প্রতিদিনই এমন করে। মায়ের ঘড়ি যেন এক ঘণ্টা আগেই চলে। বিছানা ছেড়ে প্রতিদিনের মতো ফ্রেশ হয়ে ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পরলো টিউশনিতে। সকালের খাওয়া কখনোই হয় না তার। টিউশনিতে যা দেয় তা খেয়েই শেষ। আজ কেন যেন টিউশনে কিছুই খেতে দিলো না।
তাদের নতুন বাসার কাজ চলছে জোরেশোরে, হয়তো তাতেই তারা ব্যস্ত। কিন্তু তিমিরাক্ষীর পেটে তো ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।
বাসা থেকে টিউশন বেশি দূরে নয়। টিউশন শেষ করে তিমিরাক্ষী বাসায় ফিরছে। দূর থেকে দেখলো অনিল বাবু আসছেন। অনিল বাবু তিমিরাক্ষীর বাবা। শুধু বাবা নন, তিমিরাক্ষীর পৃথিবী উনি। দূর থেকে দেখেই তিমিরাক্ষী ভাবছে, আজও বাবা তাকে দেখে বলবেন, ‘পড়ানো হলো তোর? বাসায় ফিরে যা, গরম গরম সমুচা নিয়ে আসছি।’ প্রায় সময় রাস্তায় দেখা হলে এ কথাই বলেন বাবা। কিন্তু অবাক ব্যাপার, আজ অনিল বাবু মেয়ের দিকে না তাকিয়েই পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। তিমিরাক্ষী চেয়ে থাকল বাবার দিকে অবাক দৃষ্টিতে। কিছুই বুঝতে পারলো না সে। বাবার চোখে চোখ পড়তেই তিমিরাক্ষীর বুকের মাঝে হঠাৎ ধাক্কা খেলো। যা দেখল তা কি সত্যি? সত্যিই তো, বাবার চোখ ফুলে আছে। বোঝাই যাচ্ছে বাবা সারারাত না ঘুমিয়ে চোখের পানি ফেলে কাটিয়েছেন। তিমিরাক্ষী তাকাতেই অনিল বাবু চোখ নামিয়ে মাথা নিচু করে, মুখে হাসি ছাড়াই মেয়েকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন। একবার পিছন ফিরেও তাকালেন না, যেন তিমিরাক্ষী তার অপরিচিত একজন। তিমিরাক্ষী অবাক হয়ে বাবার দিকে চেয়ে রইল। পরক্ষণেই সে ভাবল, ঠিকই তো। দেখবেন ই বা কি করে। বারবার তিমিরাক্ষীর দেওয়া কষ্ট বাবার মনকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে। কিন্তু তিমিরাক্ষীর তো কিছুই করার নেই। সেওতো নিরুপায়। তিমিরাক্ষী অনিল বাবুর বড় আদরের মেয়ে। দু’মেয়ের ছোট এই সংসারে তিমিরাক্ষী বড়। তাকে নিয়ে কতইনা স্বপ্ন দেখেন অনিল বাবু। নিজের সুখের কথা তো তার মনেই নেই। তিনি শুধু তার মেয়েদের স্বপ্ন সত্যি করতেই ব্যস্ত। রাতের অন্ধকারে শ্যাম বর্ণের ফুটফুটে জন্ম নেওয়া মেয়েটি যেন তার সুখের অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাই মেয়ের নাম রাখেন তিমিরাক্ষী। সবসময় বলতেন তিমিরাক্ষী আমার অন্ধকার ঘরের বাতি। কিন্তু আজ তার এই আদরের মেয়ে যেন তার কাছে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার এই মেয়েই সবার সামনে প্রতিনিয়ত তাকে হাসির খোরাক বানাচ্ছে।
তিমিরাক্ষী সব বোঝে। কিন্ত তার তো হাত পা বাঁধা। সবই তো উপরওয়ালার খেল।
তিমিরাক্ষী বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে পড়ল কলেজের উদ্দেশ্যে। ভুলেই গেল তার ক্ষিদের কথা। বাসায় কাউকে কিছু বলল না। বলার মত মুখও তার নেই। তাই নিশ্চুপ হয়ে বের হওয়াটাই ঠিক ভাবল। রিকশায় চেপে কলেজে যাওয়ার পথে কালকের সব স্মৃতি তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু, কোথাও সে তার কোনো দোষ খুঁজে পেল না। মা যা শিখিয়ে দিয়েছিলেন তা সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। তাহলে আজ হঠাৎ তার এত কষ্ট হচ্ছে কেন? সে বুঝল, কালকের ব্যর্থতা নয়, তার বুক দুকরে দুকরে কাদঁছে সকালে বাবার চোখের না বলা ভাষা। সে যেন বাবার চোখের আড়ালে থাকা কষ্টগুলো নিতে পারছিল না। তাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে। তার নিজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাই হলো তার বাবা। তার সাথে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া কষ্টগুলোর চেয়ে বাবার আজকের দূরত্ব তাকে আরো বেশি দুর্বল করে দিচ্ছে। তবে তিমিরাক্ষী এত তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়ার মেয়ে নয়। নিজেকে সামলাতে জানে সে। আর এসবতো একবার দুবার নয়, বার বার হয়েছে তার সাথে। সে প্রথম প্রথম ভেঙে পড়লেও এখন দিব্যি নিজেকে সামলে নিতে শিখেছে। তবুও বাবার আজকের ব্যবহার তার বুকে পাথরের মতো বিঁধে আছে।
ভাবতে ভাবতে রিক্সা এসে পড়ল কলেজের গেইটের সামনে। এখন বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়ার সময়। হ্যাঁ, এখন তার বুকের ভেতরের কষ্টগুলো তাকে আর ভেঙে পড়তে দিবে না। কারণ এখন তো সব ভুলে যাওয়ার সময়।কলেজ হলো তিমিরাক্ষীর দুঃখের ঘরে সুখের আলোর রংছটা। কলেজে আসলে সে যেন তার সকল দুখের হিসেব-নিকেশ ভুলে যায়। তার সাথে ঘটে যাওয়া দুঃখের মুহূর্তগুলো তার মুখের প্রাণখোলা হাসির মাঝে হারিয়ে যায়। তার হাসিতে যেন পুরো ক্যাম্পাস আনন্দিত। সে ভাবে, কাল যা হয়েছে, সে তো এক দুঃস্বপ্ন। এখন যা ঘটছে, এটাই বাস্তব। ক্যাম্পাসের পেছনের গার্ডেনে বসে আড্ডা মেরে বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো এর চেয়ে সুখ আর কি হতে পারে। চলতে থাকে আড্ডা। আজ তিমিরাক্ষীর ক্লাস করতে ইচ্ছে করছে না। সে আজ আনন্দে আর গল্পে মাতোয়ারা হতে চায়।
সেই আড্ডায় কখন যে সকাল গড়িয়ে বিকেল তিনটা বেজে গেল তিমিরাক্ষী বুঝতেই পারেনি। এখন তো বাসায় ফেরার পালা। তার আজ মনে হচ্ছে কলেজে যদি আরো কিছুক্ষণ সময় কাটানো যেত কতই না ভালো হতো। তার আজ বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করছিল না কিন্তু ফিরতে তো হবেই। মনকে বোঝালো, সবতো আগের মতই আছে। হয়তো সে বেশি ভাবছে। আজ এই সান্ত¡নায় তার সঙ্গী। ফিরে গেল বাসায়।
বাসায় ফিরে বুঝলো সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। তিমিরাক্ষী বুঝলো, কাল যা হয়েছে সেই ঘটনার বারবার পুনরাবৃত্তি সবাইকে স্বাভাবিক করেছে। আসলেই তো। সবাইতো এ ঘটনার পরিণতি জানতো। বাবা অফিস থেকে ফেরেন নি এখনও। স্নান সেরে খাওয়া-দাওয়া শেষ করল তিমিরাক্ষী। মা কালকের ঘটনার ভুলগুলো ধরিয়ে দিচ্ছেন তিমিরাক্ষীকে। সেও লক্ষী মেয়ের মতো চুপচাপ শুনে যাচ্ছে। সাথে ছোট বোনও তার দেখা ভুলগুলো দিদিকে ধমকের সুরে বোঝাচ্ছে। কিন্তু তারা কেউ তিমিরাক্ষীর ভেতরটা ঢু মেরেও দেখার চেষ্টা করলো না। তারা বুঝলো না তিমিরাক্ষীর বুকটাও তো ছিঁড়ে যাচ্ছে। এই তো কিছুক্ষণ আগেই বাথরুমে সে তার দুঃখের ভার কমানোর চেষ্টায় বালতি বালতি চোখের পানি ফেলে এসেছে। তবুও তাকে শুনতে হবে। এটাই যেন নিয়ম।
বাবা ফিরলেন রাত এগারোটায়। আগের চেয়ে স্বাভাবিক। আস্তে আস্তে সবকিছু আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করল। নদীর স্রোতের মতো চলতে থাকল তিমিরাক্ষীর জীবন।
এক মাস পর..
আবার তিমিরাক্ষীকে সাজানোর ধুমধাম। পাত্রপক্ষ আসছে দেখতে। মা সব সময়ের মতো শিখিয়ে-পড়িয়ে দিচ্ছেন। বেশি হাসবে না, মুখ তুলে চাইবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। তিমিরাক্ষী আয়নার সামনে মূর্তির মত বসে আছে। তার ছোট বোন শাড়ি খুঁজতে ব্যস্ত। কারণ শত চেষ্টা করেও তিমিরাক্ষীর শ্যাম বর্ণটা ঢাকা যাচ্ছে না। তাই ছোট বোন চেষ্টা করেই যাচ্ছে সেই শাড়িটা খুঁজতে যাতে পাত্রপক্ষের কাছে বোনের শ্যামরংটা পছন্দ হয় কিন্তু তিমিরাক্ষী জানে, আজও তার সকল গুণ হেরে যাবে তার শ্যামবর্নের কাছে। সে জানে ঘটনার আবার পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে। হয়তো আবার তার বাবার চোখের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা চোখের জল তার মনকে চূর্ণবিচূর্ণ করবে।
পাত্রপক্ষ এলো। পাত্র বিদেশ থাকে। অঢেল সম্পত্তির মালিক। হাতে গলায় সোনার চেইন জড়ানো। মেয়ের পক্ষ থেকে খাবারের আয়োজনের বন্যা বয়ে গেল যাতে মেয়ের রূপ খাবারের মুগ্ধতায় ঢাকা পড়ে। তিমিরাক্ষী ভেতর থেকে শুনতে পায় কেউ একজন বলছে, ‘মেয়ে কালো সেই কথা তো কেউ আগে বলেনি, বললে তো এত কষ্ট করে মেয়ে দেখতে আসতাম না।’ তিমিরাক্ষী হাসলো। অবশেষে তিমিরাক্ষীকে পাত্রপক্ষের সামনে আনা হলো। এবারও সে বসে আছে অসীম ধৈর্য নিয়ে।
অতঃপর….