তাহাজ্জুদ নামাজ : সর্বোত্তম নফল ইবাদত, দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়

9

এস এম ফখরুল ইসলাম নোমানী

যাবতীয় প্রশংসা কেবলই আল্লাহ তাআলার যিনি সমগ্র জগতের মালিক ও রব। আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর,যিনি সমস্ত নবীগণের সরদার ও সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। আরও নাযিল হোক তার পরিবার-পরিজন ও সমগ্র সাথী-সঙ্গীদের ওপর ।
রাতের শেষাংশ অত্যন্ত বরকতময়। রাতের নামাজ বা তাহাজ্জুদের নামাজ আল্লাহর একটি প্রিয় ইবাদত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের গুণাবলি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তারা রবের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত ও দাঁড়িয়ে রাত্রি যাপন করে। (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৬৪) নফল নামাজের মধ্যে তাহাজ্জুদ সবচেয়ে মর্যাদাবান নামাজ। হাদিসে এসেছে, এই সময় আল্লাহ তাআলা জমিনের আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের তাঁর কাছে চাইতে বলেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, আমাদের রব প্রত্যেক রাতে যখন রাতের এক-তৃতীয়াংশ বাকি থাকে, পৃথিবীর আকাশে নেমে আসেন। আল্লাহ বলেন,কে আমাকে ডাকবে ? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আমার কাছে চাইবে ? আমি তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু দেব। কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে ? আমি তাকে ক্ষমা করব। (বুখারি, হাদিস : ৭৪৯৪)
রহমতের মাস রমাদান আর তাহাজ্জুদের সময় হলো রহমতের সময়। বছরের বিশেষ রাতগুলো ছাড়াও প্রতি রাতে তাহাজ্জুদের সময়ে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার নিকটতম প্রথম আসমানে এসে বান্দাদের ফরিয়াদ শোনেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলেন : এবং রাতের কিছু অংশ তাহাজ্জুদ কায়েম করবে, ইহা তোমার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে (মাকামে মাহমুদে)। (সুরা-১৭ বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯)। হে বস্ত্রাবৃত ! রাত্রিতে দায়মান হোন কিছু অংশ বাদ দিয়ে ; অর্ধরাত অথবা তদপেক্ষা কিছু কম অথবা তদপেক্ষা বেশি এবং কোরআন আবৃত্তি করুন সুবিন্যস্তভাবে ও স্পষ্টভাবে। আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি গুরুত্বপূর্ণ বাণী। নিশ্চয় ইবাদতের জন্য রাতে ওঠা প্রবৃত্তি দলনে সহায়ক এবং স্পষ্ট উচ্চারণের অনুকূল। নিশ্চয় দিবাভাগে রয়েছে আপনার দীর্ঘ কর্মব্যস্ততা। আপনি আপনার পালনকর্তার নাম স্মরণ করুন এবং একাগ্রচিত্তে তাতে মগ্ন হোন। (সুরা-৭৩, মুয্যাম্মিল, আয়াত : ১-৮)। হে চাদরাবৃত ! উঠুন, সতর্ক করুন, আপন পালনকর্তার মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন এবং অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন। অধিক প্রতিদানের আশায় অন্যকে কিছু দেবেন না এবং আপনার পালনকর্তার উদ্দেশে সবর করুন। (সুরা-৭৪ মুদ্দাচ্ছির, আয়াত : ১-৭)।
তাহাজ্জুদ নবীজি (সা.) সব সময় পড়তেন। তাই এটি সুন্নত, অতিরিক্ত হিসেবে নফল ; নবীজি (সা.)—এর জন্য এটি অতিরিক্ত দায়িত্ব ছিল। পাঁচ ওয়াক্ত নির্ধারিত নফলের মধ্যে তাহাজ্জুদ সর্বোৎকৃষ্ট আমল। হজরত আলী (রা.) বলেছেন : ওয়া মান তলাআল উলা ছাহারাল লায়ালি, অর্থাৎ,যাঁরাই ইবাদতে আধ্যাত্মিক জগতে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ঊর্ধ্বারোহণ করেছেন ; তাঁরাই রাত জেগে তাহাজ্জুদ পড়েছেন। (দিওয়ানে আলী, নাহজুল বালাগা )। তাই তাহাজ্জুদ হলো মোক্ষ লাভের মোক্ষম মাধ্যম। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেন : ফরজ নামাজগুলোর পর উত্তম নামাজ হলো রাতের তাহাজ্জুদ। (মুসলিম, আলফিয়্যাহ, পৃষ্ঠা : ৯৭, হাদিস : ৪০৫)।
তাহাজ্জুদের সময় হলো মধ্যরাতের পর বা রাতের দুই-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হওয়ার পর থেকে তথা রাত দুইটার পর থেকে ফজরের ওয়াক্ত আরম্ভ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত। সাহ্রির সময় শেষ হলে তথা ফজরের ওয়াক্ত শুরু হলে তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত শেষ হয়। রাসুল (সা.)-এর জমানায় তাহাজ্জুদের জন্য আলাদা আজান দেওয়া হতো। এখনো মক্কা শরিফ ও মদিনা শরিফে এই নিয়ম প্রচলিত আছে। তাহাজ্জুদ একাকী পড়াই উত্তম ; জামাতে পড়া অনেক মুজতাহিদ ফকিহ মকরুহ বলেছেন। তাই অন্য সব সুন্নত ও নফলের মতো তাহাজ্জুদ নামাজের কিরাআতও সিররি ; অর্থাৎ,তাহাজ্জুদে সুরা কিরাত নিম্ন স্বরে পড়তে হয় এবং এর জন্য ইকামাতেরও প্রয়োজন হয় না।
তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত সব নফল ইবাদত অপেক্ষা অধিক এবং এটি আল্লাহর কাছে অতি প্রিয়। যারা তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন এবং অপরকে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেন, তারা আল্লাহর অপার রহমতের মধ্যে বিচরণ করেন ।
তাহাজ্জুদ অন্ধকারে পড়তে হয় বা তাহাজ্জুদ পড়লে জিন আসে অথবা তাহাজ্জুদ শুরু করলে নিয়মিত আদায় করতে হয়—এসব ভুল ধারণা। তবে কারও ঘুমের ব্যাঘাত যেন না হয় এবং প্রচার মানসিকতা যেন না থাকে ; এ বিষয়ে যতœশীল ও সতর্ক থাকতে হবে। তাহাজ্জুদ নিয়মিত আদায় করতে পারলে তা অতি উত্তম। নফল ইবাদত বিশেষ উদ্দেশ্য বা প্রয়োজন ছাড়া গোপনে করাই বাঞ্ছনীয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেন : আল্লাহ তাআলা সেই স্বামীর প্রতি রহম করেছেন, যে নিজে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে এবং তার স্ত্রীকে জাগায়। যদি সে উঠতে অস্বীকার করে, তবে তার মুখমÐলে পানি ছিটা দেয়। আল্লাহ তাআলা সেই স্ত্রীর প্রতি রহম করেছেন, যে নিজে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে এবং তার স্বামীকে জাগায়। যদি সে উঠতে অস্বীকার করে,তবে তার মুখমন্ডলে পানি ছিটা দেয়। (আবু দাউদ ও নাসায়ী, আলফিয়্যাহ,পৃষ্ঠা : ৯৭,হাদিস : ৪০৭)।
তাহাজ্জুদ নামাজের কিরাআত হলো সবচেয়ে দীর্ঘ। এই নামাজে যত ইচ্ছা তত দীর্ঘ কিরাআত পাঠ করা যায়। এতে রাকাত দীর্ঘ করার জন্য এবং তিলাওয়াতের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য একই রাকাতে বিভিন্ন সুরা ও বিভিন্ন আয়াত পড়া যায় এবং একই রাকাতে একই সুরা বারবার অনেকবার পড়া যায়। নফল নামাজে কিরাআতে তিলাওয়াতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি নয়। নফল নামাজে রুকু, সিজদাসহ প্রতিটি রুকন বা পর্ব দীর্ঘায়িত করা সুন্নত ও মোস্তাহাব। এ জন্য রুকু ও সিজদায় তাসবিহ অনেক অনেকবার পড়া যায় এবং অন্যান্য পর্বে বেশি পরিমাণে বিভিন্ন দোয়া মাসুরা (যা কোরআন ও হাদিসে আছে) পাঠ করা যায়।
তাহাজ্জুদ নামাজ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পর শ্রেষ্ঠ নামাজ। মহানবী (সা.) বলেছেন, রমজানের পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের (তাহাজ্জুদের) নামাজ। (মুসলিম, হাদিস নং : ১১৬৩)
রমজান মাসে ফরজ রোজা পালনের জন্য সাহ্রি খাওয়ার সুন্নত আদায়ের জন্য উঠতে হয় এবং সাহ্রির সময়ই হলো তাহাজ্জুদের সময়। সুতরাং রমজানে তাহাজ্জুদ আদায় করা খুবই সহজ। তাহাজ্জুদ ২ রাকাত করে ৮ রাকাত, ১২ রাকাত বা আরও কম বা বেশিও পড়া যায়। রমজানের নফলের সওয়াব ফরজের সমান, ফরজের সওয়াব ৭০ গুণ। তাই রমজানে তাহাজ্জুদের সহজ ও সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
তাহাজ্জুদের আগে-পরে কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করা উপকারী আমল। এ সময় সুরা মুয্যাম্মিল,সুরা মুদ্দাচ্ছির, সুরা মুলক, সুরা ওয়াকিআহ, সুরা দুখান, সুরা আর রহমান, সুরা ইয়াসিন, সুরা হাশর ও সুরা কাহাফ এবং অন্যান্য সুরা তিলাওয়াত করা বরকতময় ও ফলপ্রসূ। এটি দোয়া কবুলের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় ও সর্বোৎকৃষ্ট আমল। রমাদানে তাহাজ্জুদ আদায় করা সহজতর। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে যথাযথভাবে রাতের শেষ প্রহরে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : হেড অব ফাইন্যান্স এন্ড একাউন্টস
এপিক হেলথ কেয়ার লিমিটেড