তারাবীহ: মাহে রমযানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মহান উপহার

14

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আযহারী

তারাবী’র নামায রমযানুল মুবারকের অন্যতম উপহার এবং বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মহান প্রতীক। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও তাঁর হাবীব বাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকট রয়েছে এ তারাবীর বিশেষ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং মুসলিমদের হৃদয়ে রয়েছে এর অনেক গুরুত্ব ও মহত্ত¡। আর রোযার সাথে তারাবির নামাযের সম্পর্কও সুগভীর ও সুনিবিড়। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য রোযা ফরয করেছেন, আর আমি তোমাদের জন্য তারাবি’র নামাযকে সুন্নাত করেছি; যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমাদানে দিনে রোযা পালন করবে ও রাতে তারাবী’র নামায আদায় করবে, সে গুনাহ থেকে এরূপ পবিত্র হবে যাবে, যেরূপ নবজাতক শিশু মাতৃগর্ভ থেকে নিষ্পাপ অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়।’ (নাসায়ী-২২১০)।
প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমযানের রাতে ইবাদত করবে তথা তারাবী’র নামায আদায় করবে; তার অতীতের গোনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হবে। (বুখারী- ৩৭)
রমযান মাসে এশার নামাযের পর এবং বিতরের আগে যে নামায পড়া হয় তা হল তারাবীর নামায। এই নামায নারী পুরুষ সকলের জন্য সুন্নত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত তারাবীর নামায আদায় করেছেন এবং অন্যদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর ইনতিকালের পর সাহাবায়ে কেরাম এবং সম্মানিত তাবেয়ীগণও গুরুত্বের সাথে তারাবীর নামায আদায় করেছেন।
নামকরণ : আরবী ভাষাবিদ ইবনে মানযূর বলেন, ‘তারাবীহ’ শব্দটি ‘তারবীহা’ এর বহুবচন। ‘তারবীহা’ এর অর্থ একবার ইসতারাহা (আরাম) নেওয়া। রমযানের রাতের সুন্নত নামাযকে তারাবীহ এর নামায এজন্য বলা হয় যে, মুসল্লীরা প্রত্যেক চার রাকাত পর পর রাহাত বা বিশ্রাম গ্রহণ করে থাকেন। কারণ, তারাবীর নামায অনেক রাকাতবিশিষ্ট দীর্ঘ নামায। তাই মুসল্লীগণ প্রত্যেক চার রাকাত পর পর ‘তারবীহ’ তথা আরাম ও বিশ্রাম গ্রহণ করেন।
তারাবীহ নামাযের ইতিহাস : রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যই তারাবীহ’র নামায প্রবর্তিত হয়। হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রমযানের এক রাতে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে গিয়ে নামাযে দাঁড়িয়েছেন। কিছু সংখ্যক সাহাবী তাঁর পিছনে ইক্তিদা করলেন। দ্বিতীয় রাতেও তিনি নামায পড়েছেন। এ রাতে প্রচুর মুসল্লী হয়। এরপর তৃতীয় বা চতুর্থ রাতে সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে জড়ো হয়েছেন; কিন্তু ঐ রাতে তিনি হুজরা মুবারক থেকে বের হননি। সকাল হলে তিনি সাহাবাদের লক্ষ করে বললেন, তোমরা যে এসেছো তা আমি দেখেছি। তবে, আমি তোমাদের কাছে আসিনি এ আশঙ্কায় যে, এই নামায তোমাদের উপর ফরয করে দেওয়া হবে এ ভয়ে। (মুসলিম- ৭৬১) সাহাবায়ে কেরামকে এ অবস্থায় রেখেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইনতিকাল করেন। (বুখারী- ২০১২)
হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শাসনামলে : আবদুর রহমান ইবনে আবদ আলক্বারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রমযানের এক রাতে আমি হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সাথে বের হলাম। দেখি, লোকজন বিক্ষিপ্তভাবে একাকী ও ছোট ছোট জামাত করে নামায পড়ছে। হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন, আমার মনে হয় সবাইকে যদি এক ইমামের পিছনে জমা করিয়ে দিই তাহলে ভালো হবে। এরপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাইকে হযরত ওবাই ইবনু কা‘ব রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পিছনে দাঁড় করিয়ে দেন। আরেক রাতে তাঁর সাথে আবার বের হয়ে দেখলাম, লোকজন হযরত ওবাই ইবনু কা‘ব রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর পিছনে জামাতের সাথে নামায পড়ছেন। ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তখন বললেন, এটা উত্তম বিদআত। সাহাবায়ে কেরাম রাতের প্রথমাংশে (তারাবীর) নামায পড়তেন। হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন, এই নামায থেকে ঐ নামায উত্তম, যার সময় তারা ঘুমিয়ে থাকে। অর্থাৎ শেষ রাতের নামায। (বুখারী-২০১০)
তারাবীর নামাযের রাকাতের সংখ্যা : রাসূল রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন, তবে তাবেয়ী এবং মুজতাহিদ ইমামগণের আমল দ্বারা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, তারাবীর নামায বিশ রাকাত। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান মাসে বিশ রাকাত তারাবীহ এবং তিন রাকাত বিতির পড়তেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা- ৭৬৯২)
হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শাসনামলেও ছিল ২০ রাকাত। হযরত ইয়াহইয়া বিন সাঈদ থেকে বর্ণিত। নিশ্চয় ওমর ইবনু খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এক ব্যক্তিকে জামাতসহকারে বিশ রাকাত তারাবীহ পড়ার হুকুম দিলেন। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা-৫/২২৩) হযরত সায়েব বিন ইয়াজিদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেনঃ আমরা হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবীহ ও বিতির পড়তাম। (সুনানে বায়হাকী-৮৩৩)
ইবনু তাইমিয়া বলেনঃ হযরত উবাই বিন কাব রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তারাবীহ মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের মাঝে পড়াতেন। কোন একজনও এ ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করেননি। (মাজমুআ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া-৩৩/১১২)
এভাবে হযরত ওসমান, হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমার শাসনামলে এবং জমহুর সাহাবাগণ আমলেও ২০ রাকাত তারাবীহ আদায় করা হতো। ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি হযরত ইবরাহীম থেকে বর্ণনা করেন যে, নিশ্চয় লোকেরা [সাহাবী ও তাবেয়ীগণ] রমযান মাসে পাঁচ তারবীহার সাথে বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করতেন। {কিতাবুল আসার লিআবী ইউসুফ}
মসজিদে নববীতে এবং বাইতুল্লাহ শরীফেও বিশ রাকাত তারাবীহ পড়া হতো : মক্কা মুকাররমায় হযরত আতা বিন আবী রাবাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি [মৃত্যু ১১৪ হিজরী] বলেনঃ আমি লোকদেরকে [সাহাবা ও তাবেয়ীগণকে] বিতির নামাযসহ ২৩ রাকাত পড়তে দেখেছি। {মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা-২/৩৯৩}
কুফা ও বসরায়ও বিশ রাকাত তারাবীহর নামায পড়া হয়: কুফায় হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বিশ রাকাত তারাবীহ এবং তিন রাকাত বিতির পড়াতেন। {মুখতাসার কিয়ামুল লাইল-১৫৭}
হযরত ইউনুস রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি আবুল আশআস [মৃত্যু ৮৩ হিজরী] এর ফেতনার পূর্বে জামে মসজিদ বসরাতে দেখেছি যে, হযরত আব্দুর রহমান বিন আবী বাকরা [ওফাত- ৯১হিজরী] হযরত সাঈদ বিন আবীল হাসান [ওফাত-১০০হিজরী] এবং হযরত ইমরানুল আব্দী লোকদের পাঁচ তারবীহা [বিশ রাকাত] তারাবীহ পড়াতেন। {কিয়ামূল লাইল-১৫৮} মোটকথা, পুরো খাইরুল কুরুনের মাঝে বিশ রাকাত তারাবীহকে অস্বিকারকারী একজনও ছিল না। কোন ইসলামী রাজত্বে এটাকে অস্বীকার করা হয়নি। সর্ব প্রথম এটাকে অস্বীকার করেছে আহলে হাদীস নামক লা-মাযহাবীরা।
চার মাযহাবের ইমামগণের বক্তব্য : শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেসে দেহলবী বলেনঃ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত চার মাযহাবে সীমাবদ্ধ। এ চার ইমামের মাঝে প্রথম ইমাম হলেন ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি [মৃত্যু ১৫০ হিজরী] তিনিও বিশ রাকাত তারাবীহ’র পক্ষে। [ফাতাওয়া কাযীখান-১/১১২}
ইমাম মালিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বক্তব্যও বিশ রাকাতের পক্ষে। (হেদায়াতুল মুজতাহিদ-১/১৬৭)
ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিও বিশ রাকাতের প্রবক্তা। {আলমুগনী-২/১৬৭}
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহির সর্বাধিক প্রাধান্যপ্রাপ্ত বক্তব্যও বিশ রাকাতের পক্ষে। [আলমুগনী-২/১৬৭}
সাহাবাগণের নিরবচ্ছিন্ন আমল ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত তারাবীহ ২০ রাকাত : তারাবীহ নামায বিশ রাকাত সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকেই সারা পৃথিবীতে চালু হয়েছে। যা আজো সারা পৃথিবীতে আমল হয়ে আসছে। কতিপয় নব্য ফিতনাকারী ছাড়া মসজিদে নববী এবং বাইতুল্লাহসহ সারা পৃথিবীতে ২০ রাকাত তারাবীহ’র উপর সকল মুসলমান আমল করে আসছেন।
ইবনু কুদামা হাম্বলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি [মৃত্যু ৫৯৫ হিজরী] আলমুগনী গ্রন্থের ২য় খন্ডের ১৬৭ নং পৃষ্ঠায়, আল্লামা কাসতাল্লানী শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি [মৃত্যু ৯২৩ হিজরী] ‘ইরশাদুস সারী’ এর ৩য় খন্ডের ৫১৫ নং পৃষ্ঠায় বিশ রাকাতের উপর সাহাবাগণের ইজমার কথা উল্লেখ করেছেন।
মোল্লা আলী কারী হানাফী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি [মৃত্যু ১০১৪হিজরী] ‘শরহুন নিকায়া’ এর ২য় খন্ডের ২৪১ পৃষ্ঠায় এবং আল্লামা সাইয়্যেদ মুরতাদ্বা জুবাইদী [মৃত্যু-১২০৫ হিজরী] ‘ইতহাফুল সাদাতিন মুত্তাকীন’ কিতাবের ৩য় খন্ডের ৭০০ নং পৃষ্ঠায় সাহাবাগণের এ ইজমাকে নকল করেছেন।
আট রাকাত তারবীহ’র দাবীদারদের দলিল ও তার খÐন : আট রাকাত তারাবীর পক্ষে দলিল হিসাবে যে হাদিস শরীফটি তারা পেশ করে থাকে তা হল, হযরত আবু সালমা বিন আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত তিনি হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার কাছে জানতে চান নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামায কেমন হত রামাযান মাসে? তিনি বললেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাযানে ও রামাযান মাসের বাইরে ১১ রাকাতের চেয়ে বেশী নামায পড়তেন না। তিনি প্রথমে ৪ রাকাত পড়তেন। তুমি এর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জানতে চেও না। তারপর পড়তেন ৪ রাকাত। তুমি এর সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা বিষয়ে জানতে চেও না। তারপর পড়তেন ৩ রাকাত। হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তখন আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি বিতর পড়ার পূর্বে শুয়ে যান? তিনি বললেন, হে আয়েশা! নিশ্চয় আমার দু’চোখ ঘুমায় আমার কলব ঘুমায়না। (সহীহ বুখারী-১/১৫৪)
জবাব : এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হল নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক সালামে ৪+৪ রাকাত করে মোট ০৮ রাকাত তারাবীহ, আর শেষে এক সালামে ৩ রাকাত বিতর পড়েছেন। অথচ কথিত আহলে হাদিসদের আমল এর বিপরীত। তারা তারাবী দুই দুই রাকাত করে পড়েন। আর বিতর এক রাকাত পড়েন অথবা তিন রাকাত দুই সালামে পড়েন। তাই এ হাদীস শরীফটি তাদের পক্ষের দলীল হিসেবে কখনও গ্রহণযোগ্য হবে না।
মূলত এই হাদিসটি তাহাজ্জুদ নামাযের সাথে সংশ্লিষ্ট। এতে তারাবীহের কথা বর্ণিত নয়। হাদিসটিতে মূলত তাহাজ্জুদের বর্ণনা এসেছে একথার দলিল হলো বর্ণিত হাদিসে (নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাযান ও রামাযান ছাড়া অন্য সময়ও ১১ রাকাত থেকে বেশী নামায পড়তেন না।) এটাই বুঝাচ্ছে যে, প্রশ্নটি করা হয়েছিল রামাযান ছাড়া অন্য সময়ে যে নামায নবীজী পড়তেন তা রামযানে বাড়িয়ে দিতেন কিনা? এই প্রশ্নটি এজন্য করা হয়েছে যেহেতু বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাযানে আগের তুলনায় অনেক বেশী নামায পড়তেন ও ইবাদত করতেন, তাই এই প্রশ্নটি করাটা ছিল স্বাভাবিক। আর রামযান ছাড়া কি তারাবীহ আছে? যে রামাযানের আগেই তারাবীহ আর বিতর মিলিয়ে ১৩ রাকাত নবীজী পড়তেন? নাকি ওটা তাহাজ্জুদ? তাহাজ্জুদ হওয়াটাই কি সঙ্গত নয়? সুতরাং এটাই স্পষ্ট বুঝা যায় তারাবীহ নয়; প্রশ্ন করা হয়েছে তাহাজ্জুদ নিয়ে যে, নবীজী তাহাজ্জুদের নামায রামাযান ছাড়া যে ক’রাকাত পড়তেন তা থেকে রামাযানে বাড়িয়ে পড়তেন কিনা? এর জবাবে হযরত আয়েশা বললেন-১৩ রাকাত থেকে বাড়াতেননা তাহাজ্জুদ নামায।
মুহাদ্দিসীনে কিরাম এই হাদিসকে তারাবীহ এর অধ্যায়ে উল্লেখ করেননি। বরং তাহাজ্জুদ অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন। ইমাম তিরমিযী বলেন, হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু, আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও অন্যান্য সাহাবী থেকে যা বর্ণিত হয়েছে এর উপরই অধিকাংশ আহলে ইলমের আমল। অর্থাৎ তারাবীর নামায বিশ রাকাত। হযরত সুফিয়ান ছাওরী, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক ও ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুমুল্লাহুর মাযহাবও এ অনুযায়ীই। ইমাম শাফেয়ী বলেছেন, মক্কাবাসীদের দেখেছি, তাঁরা বিশ রাকাত তারাবী পড়েন। (তিরমিযী ২/৩২৭)
ইবনে রুশদ বলেন, ইমাম মালেক রাহমতুল্লাহি আলাইহির এক বর্ণনা অনুযায়ী; ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম বিতর ব্যতীত বিশ রাকাত তারাবীর পক্ষের মতটিকে গ্রহণ করেছেন। -(বিদাইয়াতুল মুজতাহিদ ২/২৬২)
ইবনে তাইমিয়া বলেন, উবাই ইবনে কা‘ব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সাহাবীদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবী পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন-বিষয়টি সুপ্রমাণিত। তাই অনেক আলেমের মতে এটাই সুন্নাহ। কেননা, ওবাই ইবনে কা‘ব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু মুহাজির ও আনসার সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে বিশ রাকাত পড়েছেন। তখন এর উপর কেউ কোনো আপত্তি করেননি। -(মাজমূউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া ২৩/১১২-১২৩)
মুসলিম উম্মাহর ইমামগণের এসব উদ্ধৃতি নিশ্চিত প্রমাণ করে যে, মুসলমানদের মাঝে বর্তমানে যে বিশ রাকাত তারাবী প্রতিষ্ঠিত; এটাই হক। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। বিশ রাকাতই সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত। চার মাযহাবের ইমামগণের এর উপরই ইজমা, যারা হলেন সর্বযুগে হেদায়েতের আলোকবর্তিকা এবং ইলম ও জ্ঞানের মিনার।

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, খতীব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ