তাইওয়ান ঘিরে যুদ্ধপরিস্থিতি

9

পূর্বদেশ ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরের একদিন পরেই ক্ষিপ্ত চীন দ্বীপটির উপক‚ল-জুড়ে নজিরবিহীন সামরিক মহড়া শুরু করেছে। তাতে রকেট এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রসহ তাজা গোলাবারুদ ব্যবহার করা হচ্ছে। তাইওয়ানের পাশ ঘেঁষে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে চীনের সামরিক বাহিনী। তাইওয়ানের আশপাশে মহড়া দিচ্ছে চীনা যুদ্ধজাহাজ। বেইজিংয়ের দাবিকৃত স্বশাসিত এই দ্বীপটির আকাশ প্রতিরক্ষাসীমা দিয়ে উড়ে গেছে একাধিক চীনা যুদ্ধবিমান।
এই মহড়া যে কোনও সময় সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি প্রবল বলে সতর্ক করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। চীন এমনকী পেলোসির সফরের বিরুদ্ধে তাদের এই প্রতিবাদী মহড়া থেকে পুরোদস্তুর সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাইলেও পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠার ঘোর ঝুঁকি আছে- বলছেন তারা।
তাইওয়ান বলছে, চীন তাদেরকে ভূমি, সমুদ্র ও আকাশপথে অবরুদ্ধ করে ফেলতে চাইছে। যদি চীন তাইওয়ানের দাবি করা ১২ নর্টিক্যাল মাইল এলাকায় যুদ্ধজাহাজ কিংবা যুদ্ধবিমান পাঠায় তাহলে তা তাইওয়ানের মধ্যে ঢুকে আগ্রাসন চালানোর সামিল হবে। তখন তাইওয়ান হয়ত নিজের সীমানা রক্ষার্থে চীনের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস রোনাল্ড রিগ্যান এবং চারটি যুদ্ধজাহাজ ফিলিপিন্স সাগরে মঙ্গলবার থেকেই সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। ১৯৯৬ সালের সংকটের সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ক্যারিয়ার ব্যাটেল গ্রæপকে তাইওয়ানের কাছাকাছি মোতায়েন করেছিলেন। আর স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের উপরে যে কোনও আঘাতের জবাব দিতে প্রস্তুত।
স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) চীন তাইওয়ানের দক্ষিণ, পূর্ব এবং উত্তর উপকূলীয় জলসীমার কাছে মোট ১১টি দংফেং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানান। খবর রয়টার্স, বিবিসি।
তাইওয়ান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, গতকাল বিকেলে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পশ্চিম তাইওয়ানের আশপাশের জলসীমায় একাধিক দংফেং সিরিজের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর জবাবে তাইওয়ান তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে রেখেছে। তাইপে বলছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় মাধ্যমে যেসব ফুটেজ প্রচার করা হচ্ছে তাতে মহড়ায় যুদ্ধবিমান, রণতরী এবং ভূমি থেকে নিক্ষেপ করা হয় এরকম সমরাস্ত্র ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে।
তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তাদের এতো কাছে সমুদ্রে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে চীন ‘উত্তর কোরিয়াকে অনুকরণ’ করছে।
এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, চীনের এই মহড়া তাইওয়ানের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে এবং এই দ্বীপের ‘স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে’ রক্ষায় এগিয়ে আসার জন্য তারা অন্যান্য দেশগুলোর প্রতি আহবান জানিয়েছে।
স্বশাসিত এই দ্বীপটিকে ঘিরে চীন ওই অঞ্চলে এর আগে কখনো এতোবড় সামরিক মহড়া চালায় নি।
তাইওয়ানের সবচেয়ে কাছে সমুদ্রের যে এলাকায় রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছে তা এই দ্বীপটি থেকে মাত্র ১২ মাইল দূরে।
তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনের এই সামরিক মহড়ার তীব্র নিন্দা করে বলেছে, এটি ‘অযৌক্তিক তৎপরতা এবং এর ফলে আঞ্চলিক শান্তি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
তাইওয়ানের অভিযোগ, এই সামরিক মহড়ার মাধ্যমে চীন দ্বীপটিকে অবরোধ করে ফেলার চেষ্টা করছে। এর ফলে কোনো জাহাজ ও বিমান তাইওয়ানে ঢুকতে এবং বের হতে পারছে না।
তাইওয়ান প্রণালীর এমন সব জায়গায় চীনা এই মহড়া চলছে যা বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রপথ যেখানে দিয়ে প্রতিদিন বহু জাহাজ চলাচল করে।
ব্লুমবার্গের এক পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, সারা বিশ্বে কন্টেইনারবাহী যতো জাহাজ চলাচল করে তার প্রায় অর্ধেক এবং বড় বড় জাহাজগুলোর ৮৮ শতাংশই তাইওয়ান প্রণালী দিয়ে যাওয়া-আসা করে।
তাইওয়ান বলছে এই অবরোধ তাদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তাইওয়ানকে শক্তি-প্রয়োগের মাধ্যমে চীনের মূল ভূখন্ডে ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের অনুশীলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মূল ভূখন্ড থেকে ১০০ মাইল দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটিকে চীন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটি প্রদেশ হিসাবে দেখে। বেইজিং চায় দ্বীপটি আবার চীনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাক।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিক ন্যান্সি পেলোসির তাইওয়ান সফরকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বেইজিং এই সফরকে দেখে ‘এক চীন নীতির’ ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে এবং সেকারণে তারা সফরের আগে থেকে মিসেস পেলোসির তাইওয়ানে যাওয়ার ব্যাপারে তীব্র আপত্তির পাশাপাশি কড়া হুমকিও দিয়েছিল।
সফরের পরদিন গতকাল বৃহস্পতিবার চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে বিবৃতিতে প্রকাশ করেছে তাতে তাদের ক্ষোভ অত্যন্ত স্পষ্ট।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই তাইওয়ানে মিসেস পেলোসির সফরকে ‘বাতিকগ্রস্ত, কান্ডজ্ঞানহীন এবং অযৌক্তিক’ বলে উল্লেখ করেছে।
তিনি বলেন, সঙ্কট এড়ানোর জন্য সম্ভাব্য যা কিছু পরিহার করা যায় চীন সেটা করেছে, কিন্তু যা তাদের মূল স্বার্থকে আঘাত করে সেটা হতে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত তাইওয়ান তাদের মাতৃভূমির কাছেই ফিরে আসবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন তাইওয়ানের তীরবর্তী এলাকায় এই মহড়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ২০৪৯ সালের মধ্যে দ্বীপটিকে নিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে চীন প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করতেও প্রস্তুত।
তিনি বলেন, চীন তাইওয়ান দখল করতে চায় না। সেরকম কিছু হলে প্রচুর রক্ত ও সম্পদের ক্ষয় হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু তারা দেখিয়ে দিতে চাইছে যে তাইওয়ান শান্তিপূর্ণভাবে ফিরে না গেলে তারা শক্তি প্রয়োগ করতেও প্রস্তুত আছে।