ঢাক-ঢোল পিটিয়ে চালু করা ওয়াটার বাস সার্ভিস বন্ধ

46

মনিরুল ইসলাম মুন্না

বিমানযাত্রীদের যানজট হয়রানি থেকে পরিত্রাণ দিতে নদীপথে চালু করা হয়েছিল ওয়াটার বাস সার্ভিস। নগরীর অভয়মিত্র ঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত নদীরুটে এটি কিছুদিন চলেছেও। কিন্তু এখন আর চলে না। সড়কপথে শাহ আমানত সেতু থেকে বিমানবন্দর পৌঁছাতে দুই ঘণ্টা লেগে যায়। আর এ সার্ভিসের মাধ্যমে কম সময়ে পৌঁছে দিতে ২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর কর্ণফুলী নদীপথে চালু হয়েছিল ওয়াটার বাস সার্ভিস। অত্যন্ত জমকালো আয়োজনে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে উদ্বোধন করেছিল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এসএস ট্রেডিং। আর পর্যবেক্ষণে ছিল চট্টগ্রাম ড্রাইডক।
কিন্তু ২০২০ সালের মার্চ মাসে করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়ায় দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা আসায় বন্ধ হয়ে যায় ওয়াটার বাস সার্ভিসও। পরবর্তীতে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি ফের চালু হয় এ সার্ভিস। তবে বর্তমানে যাত্রী সংকটের কারণে এ সার্ভিস বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সাথে টার্মিনাল জেটিকে করা হয়েছে দর্শনীয় স্থান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাত্রী সংখ্যা বাড়লে শীঘ্রই পুনরায় চালু করা হবে এ সার্ভিস। যাত্রীদের অভিযোগ, ওয়াটার বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নির্ধারণ করার কারণে যাত্রীরা যাতায়াত করে না। ভাড়ার পরিমাণ কমিয়ে সহনীয় মাত্রায় আনা হলে যাত্রীর পরিমাণ আরও বাড়বে।
গত বৃহস্পতিবার নগরীর অভয়মিত্র ঘাট ওয়াটার বাস টার্মিনালে গেলে ওয়াটার বাস সার্ভিস বন্ধের বিষয়টি জানা যায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সদরঘাট অভয়মিত্র ঘাটের জেটিতে বিআইডবিøউটিসি’র একটি ওয়াটার বাস নোঙর করছে। তবে নতুন চালু হওয়া ভিআইপি ওয়াটার বাস সার্ভিসের দেখা মেলেনি। জেটির মূল ফটক দিয়ে ঢুকতে গেলে বাঁধা প্রদান করেন এক দারোয়ান। ওখানে কাগজ দিয়ে টাঙিয়ে দেয়া হয়েছে ‘দর্শনার্থী প্রবেশমূল্য ১০ টাকা’। অর্থাৎ জেটিতে কেউ বসে কর্ণফুলী নদী উপভোগ করতে চাইলে ১০ টাকা প্রদান করতে হবে। এর মধ্যে অনেকে বন্ধু-বান্ধব সাথে নিয়ে জেটির উপরে বসে নদী উপভোগ করছেন।
দর্শনার্থী মো. ইমন বলেন, দশ টাকা দিয়ে টিকেট নিয়ে এখানে প্রবেশ করেছি। আর এখানে বসার সু-ব্যবস্থা করে দিয়েছে তারা। এছাড়া পরিবেশটাও খুব ভাল লাগছে। তবে আমি এসেছি তিন ঘণ্টা হবে, এর মধ্যে কোন ওয়াটার বাস চলাচল করতে দেখিনি।
বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর কথা হয় ওয়াটার বাস সার্ভিসের টার্মিনাল ইনচার্জ আবু বক্কর সিদ্দিকীর সাথে। তিনি পূর্বদেশকে বলেন, যাত্রী না থাকাতে ওয়াটার বাস সার্ভিস চলাচল করে না। তবে শীঘ্রই আবার চালু করা হবে। দর্শনার্থীদের বসার জন্য আমরা ১০ টাকা করে টিকেট নিচ্ছি। এটা অফিসিয়াল সিদ্ধান্ত।
জানা গেছে, গত ২০১৯ সালে বিমানবন্দরমুখী সড়কে যানজট কমাতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষই এই যাত্রী পরিবহন সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এ সার্ভিস চালু করে কোন লাভ হয়নি।
যাত্রীদের মতে, ভাড়ার পরিমাণ অতিরিক্ত হওয়ায় ওয়াটার বাসে করে কেউ পরিবহন করতে চান না। যদি ভাড়ার পরিমাণ কমানো যেত, তবে যাত্রীরাও স্বাচ্ছন্দ্যে যেতে পারতেন।
বিমানবন্দরগামী যাত্রী মো. আবুল কাশেম জানান, ওয়াটার বাসে জনপ্রতি ৩০০ টাকা দিয়ে যাবে কে? দুই-চারজন একসাথে হলে আমরা একটি রিজার্ভ গাড়ি নিয়ে চলে যেতে পারি। এছাড়াও বর্তমানে বায়েজিদ লিংক রোড দিয়ে আউটার রিং রোড হয়ে সহজে বিমানবন্দর যাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আলীউর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, গ্রাম থেকে আসা বিমানযাত্রীদের একেকজনের সঙ্গে ৪-৫ জন করে আত্মীয়স্বজন বিমানবন্দরে যান। গ্রাম থেকে গাড়ি ভাড়া করে সদরঘাট এসে আবার মাথাপিছু ৪০০ টাকা করে দিয়ে আরও ৪-৫ হাজার টাকা খরচ করে কেউ ওয়াটার বাস ব্যবহার করবে না। একেবারে নিয়মিত যারা ঢাকা-চট্টগ্রামে আসা-যাওয়া করেন, চট্টগ্রাম শহরের বাসিন্দা কিংবা ঢাকা থেকে কাজের সূত্রে আসা লোকজন ছাড়া কারও এই ওয়াটার বাস ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখছি না। সর্বস্তরের যাত্রীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করতে না পারলে ওয়াটার বাস টিকবে না। ঢাকার বুড়িগঙ্গায়ও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে চালু করা হয়েছিল, কিন্তু বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ গুলশান থেকে রামপুরা পর্যন্ত একটা সার্ভিস আছে, ভাড়া মাত্র ১৫ টাকা। সেটা চালু আছে এবং খুব জনপ্রিয়।
এ বিষয়ে ওয়াটার বাস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এসএস ট্রেডিংয়ের এডমিন মো. মিজানুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, আমরা আমাদের ওয়াটার বাস সার্ভিস বন্ধ করিনি। এমনকি বন্ধ করার চিন্তাও নেই। কিন্তু এক-দুইজন যাত্রী নিয়ে তো আর যাত্রা করা সম্ভব নয়। তাই আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে। যাত্রী সংখ্যা বাড়লে ফের চালু করা হবে।