ঢাকায় পালিয়ে আবাসন ব্যবসায়ী বনে যান হায়দার

30

তুষার দেব

নগরীর লাভলেইনের আবেদীন কলোনিতে ‘সিফাত-ই-হায়দার মঞ্জিল’ নামে রয়েছে নিজস্ব বহুতল বাড়ি। মরহুম হায়দার আলী জিওয়ানীর ছেলে হোসাইন হায়দার আলী পরিবার নিয়ে সেখানেই বসবাস করতেন। লাভলেইন থেকে বেরিয়ে জুবিলি রোডেই ছিল তার সিরামিকের দোকান। বাড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত এই নির্মাণ সামগ্রী আমদানি করতেন বিভিন্ন দেশ থেকে। সিরামিকের ব্যবসার প্রয়োজনেই যমুনা ও ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিগত ২০১২ সালে হঠাৎ করেই ব্যবসা গুটিয়ে পরিবারসহ চট্টগ্রাম থেকে লাপাত্তা হয়ে যান হায়দার।
পুলিশ ও জুবিলি রোডের নির্মাণসামগ্রী ব্যবসায়ীদের অনেকে বলছেন, মূলত ব্যাংক থেকে নেয়া শত কোটি ঋণের টাকা ফেরত না দিতেই পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমান এক দশকেরও বেশি সময় ধরে জুবিলি ট্রেডার্স নামের দোকানটিতে সিরামিকের ব্যবসা করে আসা হোসাইন হায়দার আলী। বহুল আলোচিত ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের পর থেকেই ধীরে ধীরে চট্টগ্রামে সিরামিকের কারবার গুটিয়ে আনতে শুরু করেন তিনি। যোগাযোগ শুরু করেন রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকার জোয়ার সাহারা এলাকায়। ব্যাংকের ঋণের টাকায় সেখানে গড়ে তোলেন আলিশান বহুতল বাড়ি। বসুন্ধরা আবাসিকের নিকটবর্তী জোয়ার সাহারা এলাকাটিও অনেকটা অভিজাত হিসেবেই পরিচিত। অনেকটা আড়ালে-আবডালে জোয়ার সাহারায় বাড়ি করার পর চট্টগ্রাম থেকে স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে সোজা চলে যান সেখানে। ওই এলাকায় তখন আবাসন ব্যবসার রমরমা অবস্থা। চট্টগ্রামের সিরামিকের কারবার ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে প্লট আর ফ্ল্যাটের ব্যবসায় বিনিয়োগ করে রাতারাতি আবাসন ব্যবসায়ী বনে যান হায়দার। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঋণের কিস্তি না পেয়ে খবর নিতে গিয়ে তার পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া সম্পর্কে অবগত হয়। গত দশ বছরে আদালতে তার বিরুদ্ধে ব্যাংকের এক ডজনেরও বেশি মামলা দায়ের ও সেগুলোর মধ্যে অন্তত পাঁচটির বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে তার উপস্থিতি ছাড়াই। বিচারাধীন অন্য মামলাগুলোতেও তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এসবের কোনও খোঁজ-খবর নেয়ারও প্রয়োজনবোধ করেন নি হায়দার। ঢাকায় আয়েশি জীবনযাপন করছিলেন পরিবার নিয়ে।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেজামউদ্দিন জানান, ভাটারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা পেরিয়ে জোয়ার সাহারা আবাসিক এলাকায় বহুতল ভবন রয়েছে মেসার্স জুবিলি ট্রেডার্সের মালিক হোসাইন হায়দার আলীর। রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাটও। সেখানে তিনি প্রপার্টিজ খাতের ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের পরিচিতি তৈরি করেন। ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার পর তা পরিশোধ না করেই ২০১২ সালে আত্মগোপন করেন তিনি। আদালতের সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মূলে কোতোয়ালি থানা পুলিশ গত ১৭ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তারের পর বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন।
পুলিশ ও ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, হোসাইন হায়দার আলী যমুনা ও ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আত্মগোপনে চলে যান। ঋণ পরিশোধ না করায় আদালতে বিভিন্ন ব্যাংকের পক্ষ থেকে আদালতে এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে এক ডজনেরও বেশি মামলা করা হয়। দশটি মামলার বিচার শেষে বিভিন্ন মামলায় তাকে কারাদন্ডের পাশাপাশি শত কোটি টাকা অর্থদন্ড প্রদান করেন আদালত। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেন আদালত। আসামির বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোতোয়ালি থানা এলাকায় হওয়ায় পরোয়ানাগুলো থানায় আসে। কিন্তু তার বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে তিনি পরিবারসহ দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামে না থাকার বিষয়টি অবগত হওয়ার পর হায়দার ও তার পরিবারের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়। এক পর্যায়ে ঢাকার ভাটারা থানা এলাকায় তার অবস্থান নিশ্চিত হয় পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর হোসাইন হায়দার আলী পুলিশকে জানান, ঋণের টাকা আত্মসাতের পর তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়ে দীর্ঘ দশ বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন। সাজা এড়াতে বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপন করেছিলেন তিনি। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে নেয়া ঋণের টাকা দিয়ে ঢাকায় একটি অভিজাত বাড়ি নির্মাণ করেন। ওই বাড়িতেই পরিবারসহ বসবাস করতেন হোসাইন হায়দার।