ঢাকার ‘অকার্যকর’ ওষুধে মশা মারতে চায় চসিক

48

ওয়াসিম আহমেদ

মশক নিধনে কোটি টাকার ওষুধ ছিটাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। কিন্তু মশার অসহনীয় কামড় ও রোগব্যাধি থামছে না। এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারস্থ হন মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। এরই প্রেক্ষিতে নগরীর ৫৭টি স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে মশার ওপর পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ চালায় চবির একটি গবেষক দল। প্রতিবেদনে চসিকের লার্ভিসাইড হিসেবে ব্যবহৃত ক্লোরপাইরিফস এম ফস ২০ ইসি এবং লিকুইড এডাল্টিসাইড হিসেবে ল্যামডা-সাইহ্যালোথ্রিন-ডেল্টামেথ্রিন কীটনাশককে ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করা হয়।
একইসাথে কীটনাশক ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করে জৈবিক উপায়ে মশক নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দেয় গবেষক দল। কিন্তু সিটি করপোরেশন গবেষক দলের পরামর্শ না মেনে নতুন ওষুধ কেনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। মশক নিধনে মেয়রের গঠিত কমিটি ঢাকায় ব্যবহৃত এডাল্টিসাইড হিসেবে ম্যালাথিয়ন ৫% ও লার্ভাসাইড হিসেবে টেমিফস ৫০% ইসি কীটনাশক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ ঢাকায় এসব কীটনাশক ব্যবহারে মশক নিধন পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। ঢাকার মেয়রও বিভিন্ন সময় ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া ব্যবহৃত ওষুধের পরিবর্তন করে চতুর্থ প্রজন্মের ওষুধ ব্যবহারের চিন্তা করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এমনটা জানা গেছে।
গত মাসের মাঝামাঝিতে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত ছিলেন দৈনিক আজকের পত্রিকার নিজস্ব প্রতিবেদক তাসনীম হাসান। তিনি ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের মিরপুরের বাসিন্দা। তাসনীম হাসান পূর্বদেশকে জানান, ঢাকায় মশার কামড় এড়িয়ে চলা দায়। অফিস, চলার পথ থেকে বাসা সব জায়গায় মশার উপদ্রব অসহনীয়। সিটি করপোরেশন থেকে মশার ওষুধ ছিটায় কিন্তু তাতে তেমন কার্যকারিতা দেখছি না। আমরা বাসায় দুইজন থাকি। আমি সুস্থ হয়েছি। এরমধ্যে আমার সাথে থাকা অপরজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে। তার অবস্থা আশাঙ্কাজনক। শুধু আমরা দুইজন নই, এখানে (ঢাকায়) করোনা থেকে একটু স্বস্তি ফিরলেও ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কে আছে মানুষ। ঢাকা সিটি করপোরেশনের ব্যবহৃত ওষুধ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ব্যবহারের সিদ্ধান্তের কথা জানালে তাসনীম হাসান জানান, কাগজে-কলমে কার্যকারিতা যাচাই হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে মশার কামড় ও অসুখ থেকে মানুষ বাঁচতে পারছে না। তাহলে তো সেই কাগজে কার্যকারিতার কোনো দাম নেই। বিষয়টিকে হালকাভাবে না নিয়ে গবেষণালব্ধ জ্ঞান দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহŸান জানান তিনি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) মো. সেলিম রাজা পূর্বদেশকে বলেন, আমরা ওষুধ কেনার সময় পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে কিনি। এখন যে ওষুধটা ব্যবহার হচ্ছে ল্যাবে তার কার্যকারিতা রয়েছে, তা ইতোমধ্যে প্রমাণিত। তবে ব্যবহৃত ওষুধের কার্যকারিতা অনেকগুলো বিষয়ের উপর নির্ভর করে। সঠিকভাবে ফর্মুলেশন করা, প্রয়োগবিধি মেনে চলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ল্যাব ও মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতায় ভিন্নতা পরিলক্ষিত হওয়ায় আমরা পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হচ্ছি। এ নিয়ে ইতোমধ্যে গবেষণা চলছে। চতুর্থ প্রজন্মের উন্নত ওষুধ আনার পরিকল্পনা করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন।
বর্জ্য স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি ও ৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোবারক আলী পূর্বদেশকে বলেন, মেয়র মহোদয় মশক নিধনে একটি কমিটি করে দিয়েছেন। তাতে আমিও আছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া প্রতিবেদন ও ওষুধের কার্যকারিতা এবং বাজার দর যাচাই করে একটি প্রতিবেদন দিয়েছি। সেখানে খরচ ও কার্যকারিতার হিসেবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ব্যবহৃত ওষুধই এগিয়ে রয়েছে। সে হিসেবে আমরা এক হাজার লিটার এনে পরীক্ষামূলক ব্যবহার করছি। তিনটি জায়গায় প্রয়োগ চলছে। প্রাথমিকভাবে সেখানে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। আরও পর্যবেক্ষণ করে বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে ওষুধ কেনা হবে।
তিনি আরও দাবি করেন, আইইডিসিআরের ( রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রক ও গবেষণা ইনস্টিটিউট) পরীক্ষায় চসিকের আগের ব্যবহৃত মশক নিধনের ওষুধগুলো কার্যকর নয়। কোনো একসময় পরীক্ষা করা হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে।
কিন্তু পরিচ্ছন্ন বিভাগ সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে আগে লার্ভিসাইড হিসেবে ক্লোরপাইরিফস এম ফস ২০ ইসি ব্যবহৃত হতো। সর্বশেষ ২০২০ সালের ১০ জুন আইইডিসিআর শতভাগ কার্যকর বলে সনদ প্রদান করে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল ওষুধটি পর্যাপ্ত পরিমাণ পানির সাথে ব্যবহার করে ৫০টি মশার ওপর প্রয়োগ করলে ২ ঘণ্টা পর ১৬ ভাগ মশা মারা যায়। সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে ১০ গুণ বেশি ব্যবহার করলে ৮৪ ভাগ মারা যায়। এক্ষেত্রে ২ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণ নয় বলে জানিয়েছেন কাউন্সিলর মোবারক আলী। তিনি জানান, চবির গবেষণায় ২ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণ দেওয়া হলেও ২৪ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়নি। তাছাড়া যে ওষুধটি প্রয়োগের সাথে সাথে মশা মারা যায় সেটি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। ওষুধ গ্রহণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মারা গেলে সেটি উত্তম বলে বিবেচনা করা হয়। গবেষণাটি ব্যবহৃত ওষুধকে অকার্যকর বলার জন্য পর্যাপ্ত না মন্তব্য করলেও সেটিকে মানদন্ড ধরে ঢাকার ওষুধ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয় সিটি করপোরেশন।
ঢাকায় চতুর্থ প্রজন্মের ওষুধ ব্যবহার নিয়ে মোবারক আলী বলেন, ঢাকায় মশক নিধনে যে পরিমাণ টাকা খরচ করা হয় তা চসিকের তুলনায় অনেক বেশি। জনবল, গবেষণার জন্য পতঙ্গবিদ, আলাদা ইউনিট সব মিলিয়ে ঢাকা অনেক এগিয়ে। তারা বছরে ১৫ থেকে ১৬ কোটি টাকা খরচ করে। বিপরীতে চসিক এক কোটি টাকা খরচ করে। তাই এতটা ব্যয়বহুল চতুর্থ প্রজন্মের ওষুধ কেনার সামর্থ্য আদৌ চসিকের আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি মোবারক আলী।
চসিকের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকায় ব্যবহৃত ওষুধ আমরা ব্যবহার করছি। প্রাথমিকভাবে এক হাজার লিটার ওষুধ থেকে ২শ লিটার ব্যবহার করা হয়েছে। আগের ব্যবহৃত ওষুধ থেকে খুব বেশি পার্থক্য মনে হয়নি। বৃষ্টি হচ্ছে তাই ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে। পুরো এক হাজার লিটার ব্যবহারের পর একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গবেষক দলের সদস্য সচিব চবির উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক পূর্বদেশকে জানান, সিটি করপোরেশন আমাদের যেসব নমুনা দিয়েছে তার উপর পরীক্ষা নিরিক্ষা চালিয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছি। এতে সিটি করপোরেশন বাকি সিদ্ধান্ত নিবে। দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমরা জৈবিক উপায়ে মশা নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছি। তারমধ্যে মাছ চাষ, কিলিং মশা উৎপাদনসহ নালা-নর্দমা সঠিকভাবে পরিষ্কার রেখে পানি প্রবাহ সচল রাখার নির্দেশনা ছিল। ওষুধের ক্ষেত্রে আমরা একটি হারবাল ওষুধের পরামর্শ দিয়েছিলাম। সেক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন কোনোটাই না মেনে ঢাকায় ব্যবহৃত ওষুধ কিনছে সেটা দুঃখজনক। এতে যদি সিটি করপোরেশন কার্যকারিতা খুঁজে পায় তাহলে চট্টগ্রামবাসীর জন্য ভালো হবে।