ডেঙ্গুতে শহরের চেয়ে বেশি আক্রান্ত গ্রামে

15

এম এ হোসাইন

আগে পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার জন্ম হতো। চরিত্র পাল্টেছে এডিস মশার। এখন অপরিষ্কার এবং নোংরা পানিতেও এডিস মশার জন্ম হতে পারে। শুধু চরিত্রই পাল্টায়নি, এডিস এখন বিস্তারও হচ্ছে ভয়াবহভাবে। আগে এডিসের থাবা শহরে বেশি থাকলেও এখন থাবা বাড়িয়েছে গ্রামেও। চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৬ জন ডেঙ্গুরোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। যার মধ্যে ১ হাজার ৮৫০ জন বা প্রায় ৩১ শতাংশ বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। আবার শুধুমাত্র সীতাকুন্ড উপজেলাতেই জেলার প্রায় ৪০ শতাংশ বা ৭৩২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আর মোট মৃত্যুর ১৭ শতাংশ হয়েছে সীতাকুন্ডে।
ডেঙ্গুরোগীর প্রতিদিনের হাসপাতালের ভর্তির তথ্য সংগ্রহ করেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন অফিস। হাসপাতাল থেকে পাঠানো রোগীর তথ্যকে মহানগর ও উপজেলা ভিত্তিক আকারে সাজায় প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিদিনের ডেঙ্গুরোগীর ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করে সিভিল সার্জন কার্যালয়।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ পর্যন্ত (শনিবার) মহানগরের ৪ হাজার ১৫৬ জন এবং জেলার ১৫টি উপজেলার মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৮৫০ জন রোগী। উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী রয়েছে সীতাকুন্ডে। জেলার প্রায় ৪০ শতাংশ রোগী এ উপজেলার। তাছাড়া আরো চারটি উপজেলাতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। এরমধ্যে পটিয়াতে ১৪৯ জন বা ৮ শতাংশ, বাঁশখালীতে ১৩২ জন বা ৭ শতাংশ, হাটহাজারীতে ১২৭ জন বা প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, মিরসরাইতে ১২৪ জন বা ৬ দশমিক ৭ শতাংশ রোগী রয়েছে। তাছাড়াও সাতকানিয়াতে ৯১ জন, লোহাগাড়ায় ৫৯ জন, আনোয়ারায় ৭৯ জন, চন্দনাইশে ৩৫ জন, বোয়ালখালীতে ৪৪ জন, ফটিকছড়িতে ৯৩ জন, রাউজানে ৬৬ জন, রাঙ্গুনিয়াতে ৩৭ জন, সন্দ্বীপে ৪৭ জন এবং কর্ণফুলীতে ৩৫ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. ইলিয়াছ চৌধুরী জানিয়েছেন, এডিস মশার চরিত্র পাল্টেছে, এখন নোংরা পানিতেও ডিম পাড়ে। এই ডিম এক বছর পর্যন্ত পাত্রে লেগে টিকে থাকতে পারে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তখন সে ডিম থেকে লার্ভার জন্ম হয়। গ্রাম বা শহর যেখানেই উপযুক্ত পরিবেশ পাবে সেখানেই এডিস মশার জন্ম হবে। এ জন্য কোনো পাত্রে পানি জমে থাকতে দেয়া যাবে না। সতর্ক থাকতে হবে।
শহরের চেয়ে গ্রামে ডেঙ্গুর আগ্রাসনও বেশি হচ্ছে। চট্টগ্রামে (মহানগর ও উপজেলা মিলে) এ পর্যন্ত মৃত্যু হওয়া ৫৩ জন ডেঙ্গুরোগীর বেশিরভাগ গ্রামের। এর মধ্যে ২০ জন বিভিন্ন উপজেলার, ১১ জন অন্য জেলার এবং বাকি ২২ জন মহানগরের বাসিন্দা। শুধু সীতাকুন্ডের ৯ জন বাসিন্দার মৃত্যু হয়েছে চলতি বছরে। অন্যভাবে বলতে গেলে চলতি বছরে মৃত্যু হওয়া ৫৩ জন ডেঙ্গুরোগীর মধ্যে শহরের বাসিন্দা মাত্র ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ, বিভিন্ন উপজেলার ৩৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং অন্য জেলার ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে সীতাকুন্ড উপজেলার বাসিন্দা। চলতি বছরে মোট মৃত্যুর প্রায় ১৭ শতাংশ এ উপজেলার দখলে রয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ এনতেজার ফেরদাওছ বলেন, গ্রামের কোনো রোগী শহরে আসলেও তার ঠিকানা অনুযায়ী সে উপজেলার রোগী হিসাবে দেখানো হয়। রোগীর ঠিকানা অনুযায়ী প্রতিবেদনে প্রস্তুত করা হয়। কোন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সেটা বিবেচ্য নয়।
তিনি বলেন, সীতাকুন্ডে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। মূলত শহরের কাছের উপজেলা। তাছাড়া বিভিন্ন কারখানা গড়ে উঠেছে উপজেলাটিতে। জাহাজ কাটাসহ বিভিন্ন কারখানায় প্রচুর শ্রমিক কাজ করেন। জেলেদের বড় অংশের বসবাস রয়েছে। পানি ধরে রেখেই তারা ব্যবহার করেন। পাত্রে পানি দীর্ঘদিন রাখার কারণে সেখানে এডিস মশার বিস্তার হতে পারে।
গত চার বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুর বিস্তার ছিল নভেম্বরে। জুলাই মাস থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকে এবং নভেম্বর মাসে সর্বোচ্চ ডেঙ্গুর আক্রমণ হয়। তবে চলতি বছরে মে মাস থেকে ডেঙ্গুর বিস্তার শুরু হয়। তারপর থেকে কয়েকগুণ হারে বেড়েছে ডেঙ্গুর আক্রমণ। মে মাসে মাত্র ৫৩ জন ডেঙ্গু রোগী ছিল, জুনে ২৮৩, জুলাইতে ২ হাজার ৩১১ জন, আগস্টে ৩ হাজার ১১ জন এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম দুইদিনে ২১৯ জন ডেঙ্গুরোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছরের এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গতবছর (২০২২ সালে) এ সংখ্যা ৫ হাজার ৪৪৫ জন, ২০২১ সালে ছিল ২৭১ এবং ২০২০ সালে ছিল মাত্র ১৭ জন।
অন্যদিকে গত চার বছরের মধ্যে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ মৃত্যু এবছর। ২০২০ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ছিল না। যদিও করোনা মহামারি শুরু হওয়ার কারণে গত তিনবছরে ডেঙ্গুকে নিয়ে সেভাবে আলোচনাও ছিল না। ২০২১ সারে ডেঙ্গুতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে মৃত্যু হয় ৪১ জনে। চলতি বছরে প্রথম ৮ মাসে মৃত্যু হয়েছে ৫৩ জনের।
গতকাল শনিবার জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিবেদনে নতুন করে আরো ১৪৫ জন ডেঙ্গুরোগীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছে। এরমধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৯ জন, বিআইটিআইডি হাসপাতালে ৪৯ জন, জেনারেল হাসপাতালে ৭ জন, সমন্বিত সামরিক হাসপাতালে ২ জন, বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে ১ জন, উপজেলা হাসপাতালে ১০ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৫৭ জন নতুন করে ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হয়েছে।
গতকাল বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মোট ৩২৭ জন ডেঙ্গুরোগী। এরমধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১৭ জন, বিআইটিআইডি হাসপাতালে ৩৮ জন, জেনারেল হাসপাতালে ২৮ জন, সমন্বিত সামরিক হাসপাতালে ১৮ জন, বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে ১৬ জন, উপজেলা হাসপাতালে ১৫ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৯৫ জন। চলতি বছরে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৬ জন। এরমধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৩ হাজার ৫১৮ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ২ হাজার ৪৮৮ জন ভর্তি হন। এর মধ্যে ৫ হাজার ৬৭৯ জন ইতিমধ্যে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন। মোট মৃত্যু হয়েছে ৫৩ জনের।