ডিমের দাম কেন ১৫০ টাকা? দৈনিক ৫০ লাখ ডিমের চাহিদা থাকলেও পূরণ সম্ভব হচ্ছে না

9

নিজস্ব প্রতিবেদক
নগরীর কাঁচাবাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বেড়ে গেছে সবধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে গত দুইমাস আগে থেকে বেড়েছিল পোল্ট্রি তথা মুরগির খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর দাম। ফলে খামারিরা মুরগি ও ডিম উৎপাদনে দিশেহারা হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে অনেক খামারি ডিম উৎপাদনকারী লেয়ার মুরগি বিক্রি করে দেয়াতে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। ক্ষুদ্র খামারিরা ব্যবসা গুটিয়ে অন্য ব্যবসায় চলে গেছেন।
এদিকে বিশেষ করে মুরগি ও ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো। অন্যদিকে দৈনিক ৫০ লাখ ডিমের চাহিদা থাকলেও তা পূরণ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২ আগস্ট প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল ১৪৫ টাকা, বর্তমান মূল্য ১৮৫ টাকা। অর্থাৎ গত ১৩ দিনে এ মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ৪০ টাকার মতো। একই হারে বেড়েছে সোনালি মুরগির দামও। সেই সঙ্গে ডিমের দামও সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এখন এক ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকা দরে। টিসিবির হিসাবে, গত সপ্তাহেও প্রতিডজন ডিমের দাম ছিল ১২০ টাকা। অর্থাৎ ডজনে এক লাফে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এ হিসাবে প্রতিটি ডিমের দাম পড়েছে সাড়ে ১২ টাকা।
কালামিয়া বাজার এলাকার বাসিন্দা রহিমা আক্তার। তার ৪ সদস্যের পরিবার চলে একজনের উপার্জনে। এককথায় মধ্যবিত্ত। আগে সপ্তাহে অন্তত তিনদিন মুরগি এবং দুই দিন মাছ রান্না হত। এখন পণ্যগুলো কেনা কমিয়ে সবজির দিকে ঝুঁকছেন তিনি। ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রেও লাগাম টানতে হয়েছে তাকে। ফলে আগের মতো ডিম, মাছ, মাংস পাতে ওঠে না এ পরিবারটির।
রহিমা আক্তার পূর্বদেশকে বলেন, আগে সপ্তাহে আমার দেড় ডজন ডিম লাগত। এখন দাম বেড়ে যাওয়াতে দুই হালি কিনি। মুরগি আগে সপ্তাহে দুইবার খেলেও এখন একবার খাচ্ছি। দাম বেড়ে যাওয়াতে কী করব? আয় তো বাড়েনি।
চকবাজারের ডিম বিক্রেতা শরিফুল ইসলাম বলেন, ডিম আনতে আগে যে পরিবহন খরচ লাগতো, এখন তার দেড় থেকে দ্বিগুণ বেশি লাগছে। তাই ডিম-মুরগির দাম আনুপাতিক হারে বেড়েছে। এসবের পেছনে মধ্যসত্ত¡ভোগী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জড়িত। পরিবহন সিন্ডিকেট মালপত্র আনা-নেয়া বাবদ প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া হাঁকছে, যা দেখার কেউ নেই।
তিনি বলেন, আগে যেখানে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকায় এক গাড়ি মুরগি আনা যেত। এখন গাড়ির ভাড়া চায় ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা। এখানে আমাদের কিছু বলার নেই। পণ্য পরিবহনে নির্দিষ্ট ভাড়ার তালিকা না থাকায় প্রশাসনও কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না।
চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও মাসুদ ডেইরি, পোল্ট্রি ও ফিশারিজ লিমিটেডের প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল মান্নান পূর্বদেশকে বলেন, মুরগি ও ডিমের দাম বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। সেগুলো হল- মুরগির খাদ্যের দাম বাড়তি। গত দুই মাস আগে মুরগির খাদ্য প্রতিকেজি ভুট্টা বিক্রি হত ১৮ থেকে ২০ টাকা দরে। বর্তমানে তা হচ্ছে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা দরে। সয়াবিন বিক্রি হত ৩৩ থেকে ৩৮ টাকা দরে তা বর্তমানে ৬০ থেকে ৬২ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। খাদ্যের এমন বাড়তি দামের কারণে মাঝখানে ছোট ছোট কিছু খামারি তাদের ডিম উৎপাদনকারী লেয়ার মুরগি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বিক্রি করে দেয়। এতে ডিম উৎপাদন ব্যাহত হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি বর্তমানে যুক্ত হয়েছে পরিবহন ভাড়া।
সাবেক এ কর্মকর্তা বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ও রিয়াজউদ্দিন বাজারে উত্তরবঙ্গ থেকে দৈনিক ১৫টি ট্রাক ডিম নিয়ে আসে। প্রতি ট্রাকে দুই লাখ করে হলে ৩০ লাখ ডিম চট্টগ্রামে আসছে। পাশাপাশি কক্সবাজার জেলা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে যুক্ত হয় আরও ১০ লাখ ডিম। এছাড়াও প্রতিদিন ভোরে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল থেকে একটি ডিম ভর্তি ট্রেন ১০ লাখ ডিম নিয়ে আসে। আর এসব ডিম সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ, সামরিক, বেসামরিক, সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের চাহিদা পূরণ করে থাকে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামে পুষ্টি চাহিদা পূরণে দৈনিক ৫০ লাখ ডিম দরকার। কিন্তু খামারিরা ডিম উৎপাদনকারী মুরগি বিক্রি ও খামার বন্ধ করে দেয়াতে চাহিদার তুলনায় ডিম উৎপাদন কম। কাজেই বাজারে মুরগি ও ডিমের চাহিদা সহজে পূরণ করা যাচ্ছে না। যেমন- পাহাড়তলী ও রিয়াজউদ্দিন বাজারে আজকে (সোমবার) পাইকারিতে একশ মুরগির ডিম ১ হাজার ২১০ থেকে ১ হাজার ২৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়। যা খুচরা বাজারে যেতে যেতে প্রতিটি ডিম ১২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. দেলোয়ার হোসেন পূর্বদেশকে বলেন, বাজারে ডিমের উৎপাদনের উপর দাম নির্ধারণ হয়ে থাকে। বর্তমানে মুরগির খাদ্যের দাম বেশি হওয়ার প্রভাবটা সরাসরি মুরগি ও ডিমের উপর পড়েছে। খাদ্যের দাম ও পরিবহন খরচটা না কমলে দাম কমবে বলে মনে হয় না। পুষ্টিগুণ ধরে রাখতে দৈনিক ৫০ লাখ যে ডিমের চাহিদা রয়েছে তাও পূরণ সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।