ডিজাইন পরিবর্তনের কারণে পিলারে ফাটল

27

এম এ হোসাইন

একের পর এক বিপদ যেন লেগেই আছে বহদ্দারহাট (এমএ মান্নান) ফ্লাইওভারে। গার্ডার ধসের মতো বড় বিপদের পর এবার নতুন করে ফ্লাইওভারের র‌্যাম্পের পিলারে দেখা দিয়েছে ফাটল। নির্মাণের মাত্র চার বছরের মধ্যে এমন ফাটল দেখে বিস্মিত সবাই। মূল ডিজাইনের ব্যত্যয় ঘটায় এমন ফাটল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের কালুরঘাটমুখি একটি লুপ (ফ্লাইওভারের সাথে অন্য সড়কের সংযোগকারী) নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে একটি একমুখি র‌্যাম্পের (গাড়ি ওঠানামার রাস্তা) প্রস্তাব করা হয়। ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় লুপ ও র‌্যাম্প কোনোটি নির্মাণ করা হয়নি। ২০১৭ সালে এসে র‌্যাম্প নির্মাণ করা হয়। র‌্যাম্পটি শুরুতে ফ্লাইওভারের একপাশের গাড়ি চলাচলের সুযোগ থাকলেও পরবর্তীতে ডিভাইডার তুলে দুই পাশে যাতায়াতের সুবিধা দেয়া হয়। মূল ফ্লাইওভারের সাথে যুক্ত করা র‌্যাম্পের পিলারে এখন ফাটল দেখা দিয়েছে। আপাতত ফাটল সমস্যা সমাধানযোগ্য হলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য ফ্লাইওভারের মূল ডিজাইনে ফিরে যাওয়ার বিকল্প নেই বলে জানান সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।
চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর ড. মাহমুদ ওমর ইমাম বলেন, ফাটল কেন সেটা সঠিকভাবে বলতে পারবো না। তবে যতটুকু জেনেছি ফ্লাইওভারের ডিজাইনে পরিবর্তন করা হয়েছিল। এই রকম র‌্যাম্প ডিজাইনে ছিল না। মূল ডিজাইন মেনে এটা করা হয়নি। এখানে ডানমুখি আরেকটি লুপের প্রস্তাব করা হয়েছিল। এখন শুধুমাত্র একটি র‌্যাম্প ধরে যদি উভয়মুখি যানবাহন চলাচল করে তাহলে লোড ট্রান্সফারের (ওজন স্থানান্তর) কারণেও ফাটল হয়ে থাকতে পারে। প্রচুর লোডের কারণে এমনটা হতে পারে।
আপাতত সমাধান কি হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি জেনেছি এটি ক্যান্টিলিভার ডিজাইনে করা। সমাধান হচ্ছে মূল ডিজাইনে ফিরিয়ে যেতে হবে। উভয়মুখি যানবাহন চলাচল বন্ধ করে একমুখি চলাচল করতে হবে। তাহলে আর কোনো সমস্যা হবার কথা না। কথা হচ্ছে, মূল ডিজাইনে ফিরে যেতে হবে।
লুপ নির্মাণের কথা মূল পরিকল্পনায় থাকলেও ফ্লাইওভারটির নির্মাণ কাজ শেষ করা হয় লুপ ছাড়াই। ২০১৩ সালে ফ্লাইওভারটি চালু হওয়ার চারবছর পর র‌্যাম্প নিমাণ করা হয়। র‌্যাম্প নির্মাণের সময় হালকা যান চলাচলের কথা বলা হলেও কোনো তদারকিতে ছিল না নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সিডিএ বা রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। যার কারণে র‌্যাম্প চালুর চার বছরের মাথায় এসে পিলারে ফাটল দেখা দিয়েছে।
ফ্লাইওভারের প্রকল্প পরিচালক সিডিএ’র প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, ফ্লাইওভারের এ অংশটি (র‌্যাম্পটি) ডিজাইন করা হয়েছিল হালকা যানবাহনের জন্য। কলামের উপরে ক্যান্টিলিভার করে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের সাথে র‌্যাম্পটি করা হয়েছে। ভারী যানবাহন চলাচল করায় পিলারের উপরের অংশে ফাটল তৈরি হয়েছে। তবে এটা মেরামত করা যাবে। উদ্বোধনের সময় হাইট ব্যারিয়ার (প্রতিবন্ধকতা) ও সাইনবোর্ড ছিল। পরবর্তীতে ব্যারিয়ার ও সাইনবোর্ড নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ভারি গাড়ি চলাচল শুরু করে।
বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে দুর্ঘটনার পর বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। পূর্বের এক্সপানশন জয়েন্ট নিয়ে সন্দেহ থাকায় দুর্ঘটনার পর দুটি স্প্যানের মধ্যবর্তী জয়ন্টে ব্যবহৃত উপকরণ বদলে আন্তর্জাতিক মানের এক্সপানশন জয়েন্ট ব্যবহার করা হয়। এমনকি বেশি ভার নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নতুন করে এক্সপানশন জয়েন্ট স্থাপন করা হয়। যদিও র‌্যাম্প নির্মাণে কি ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল তার কোনো সঠিক তথ্য সিডিএ’র কাছে নেই।
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক বলেন, দুটি কারণে ফাটল দেখা দিতে পারে। একটি নকশাগত ত্রæটি, অন্যটি নির্মাণ ত্রæটি। কী কারণে হয়েছে, সেটা না দেখে এই মুহূর্তে বলা যাবে না। তবে ওভারলোডের গাড়ি চলাচলের কারণে এটা হয়েছে। নির্মাণে যুক্ত থাকা প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সের সঙ্গে কথা বলেছি। এই র‌্যাম্পটা মূল নকশায় ছিল না। পরে এটা বর্ধিত করা হয়েছে। এ জন্য ডিজাইনের ত্রæটি থাকতে পারে। এটি সিডিএ নির্মাণ করেছে, সমস্যার সমাধানে তারাই ব্যবস্থা নেবে। কী পরিমাণ লোড নিতে পারবে, সেটা তারাই হিসাব করে এটি নির্মাণ করেছে। গাড়ি চলাচল না থাকায় ফাটল বড় হওয়ার আশঙ্কা নেই।
২০১০ সালের জানুয়ারিতে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১১ সালের মার্চে ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ শুরু হয়। প্রথমে নির্মাণের কার্যাদেশ পায় মীর আক্তার-পারিশা (জেভি) কনস্ট্রাকশন। মীর আকতার প্রধান অংশীদার হলেও মূল কাজ করে পারিশা। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করার সময় ২০১২ সালের ২৯ জুন একটি গার্ডার হঠাৎ ধসে পড়ে। এতে একজন রিকশাচালক সামান্য আহত হন। এরপর একই বছরের ২৪ নভেম্বর ফ্লাইওভারের তিনটি গার্ডার ধসের ঘটনা ঘটে। এতে ১২ জন নিহত হন। আহত হন আরো বহু লোক। এই ঘটনার পর সিডিএ’র প্রকল্প পরিচালক নির্বাহী প্রকৌশলী এ এম হাবিবুর রহমানকে বরখাস্ত করা হয়। পরে তাকে মামলার আসামি করা হয়। ফ্লাইওভার ট্র্যাজেডির দুই মাস ১৯ দিন পর সেনাবাহিনীর তত্ত¡াবধানে বাকি কাজ শুরু হয়। সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্ক অর্গানাইজাশেনের (এসডবিউও) তত্ত¡াবধানে কাজ সম্পন্ন করার জন্য সিডিএ এবং এসডবিডবিøউ’র মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
প্রথমে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৯১ কোটি টাকা। পরে সংশোধন করে ১০৬ কোটি টাকা করা হয়। ফের সংশোধন করে প্রকল্প ব্যয় ১২০ কোটি টাকা করা হয়। ১৩৩২ মিটার দৈর্ঘ্যরে ফ্লাইওভারটির প্রস্থ ১৪ মিটার। চার লেনের বহদ্দারহাট এ ফ্লাইওভারের দুই পিলারের দূরত্ব ১৩০ ফুট। নির্মাণ কাজ শেষে ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর ফ্লাইওভারে যান চলাচল শুরু হয়। ফ্লাইওভারটিতে যানবাহন চলাচল বাড়াতে ২০১৭ সালে টার্মিনালমুখি একটি র‌্যাম্প নির্মাণের কাজ করা হয়। ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে র‌্যাম্প নির্মাণ শেষে একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর ওই অংশের যান চলাচল শুরু হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ফ্লাইওভারটি রক্ষণাবেক্ষণের ভার চসিককে স্থানান্তর করে সিডিএ।
গার্ডার ধসের মতো ঘটনা ঘটায় বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে শুরুতে যানবাহন চলাচল ছিল একেবারেই কম। ফ্লাইওভারটির প্রতি মানুষের আস্থা ফেরাতে সময় লাগে অনেক। র‌্যাম্প নির্মাণের পর ফ্লাইওভারটিতে যানবাহন চলাচল অনেক বেড়ে যায়। নতুন করে পিলারে ফাটল দেখা দেয়ায় ফ্লাইওভারটির প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে। অনেক মানুষ ভয়ে ফ্লাইওভারটি পরিহার করতে পারে। দ্রুত ত্রুটি সমাধান করে ফ্লাইওভারটির ব্যবহারে মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।