ডাচ ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছে জেনেসিস ডেনিম

11

উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎপাদনের মাধ্যমে গুণগত মানের পাশাপাশি পণ্যের মূল্যমান বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশের ডেনিম ও পোশাক প্রস্তুতকারীরা। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারে গতানুগতিকের তুলনায় উৎপাদন খরচও প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমবে বলে জানিয়েছেন পোশাক শিল্প মালিকরা। এমনকি কিছুক্ষেত্রে বাংলাদেশই হবে অত্যাধুনিক এসব প্রযুক্তির প্রথম ব্যবহারকারী। নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে পানি ও রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার কমিয়ে আরও পরিবেশ-বান্ধব উপায়ে পণ্য ওয়াশ করা সম্ভব হবে। অনেকক্ষেত্রে প্রযুক্তি সংস্থাগুলো বাংলাদেশকে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সহযোগী হিসেবে বেছে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশিশ্লষ্টরা। সম্প্রতি বিশ্বের প্রথম এলইইডি প্ল্যাটিনাম সার্টিফাইড ডেনিম উৎপাদনকারী এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেড প্রথম থেকে টেকসই পরিবেশবান্ধব টেক্সটাইল প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা স্প্যানিশ প্রতিষ্ঠান জিনোলজিয়া এসএলের সঙ্গে একটি অত্যাধুনিক ইকো-ল্যাব স্থাপনের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। প্রতিষ্ঠানের মতে, পরিবেশবান্ধব ল্যাব স্থাপন করতে প্রাথমিকভাবে ১২ মাসের জন্য দুই লাখ ৭০ হাজার ইউরো খরচ হবে, যা নিয়মিত হালনাগাদ করার প্রয়োজন পড়বে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চুক্তির উদ্দেশ্য হলো যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে ডেনিম শিল্প-প্রতিষ্ঠানকে রূপান্তরের মাধ্যমে টেকসই ও উদ্ভাবনী ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাপী দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দীন আহমেদ বলেন, এ ধরনের বাণিজ্যিক ল্যাব বিশ্বে এটাই প্রথম। কম খরচেই টেকসই পণ্য উৎপাদনে এই ল্যাব সাহায্য করবে। ক্রেতারা আরও টেকসই ডেনিমের সন্ধান করছেন। তাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখেই আমরা ইকো-ল্যাব স্থাপন করব। বেশ ব্যয়বহুল পদক্ষেপ হলেও এটি উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে। একইসঙ্গে ক্রেতারাও এধরনের পণ্যের জন্য বেশি দাম দিতে প্রস্তুত থাকবেন।
প্যাসিফিক জিনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, আমরা সর্ববৃহৎ ডেনিম উৎপাদনকারী হিসেবে ডেনিম শিল্পের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চলেছি। বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত ডেনিম প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা দেশগুলোর জন্য প্রোটোটাইপ হয়ে ওঠার এটাই সুযোগ। আমাদের ফিডব্যাকের ওপর ভিত্তি করে এই প্রযুক্তিগুলোর বাণিজ্যিক সংস্করণ আনা হয়েছে।
উন্নতমানের পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডাচ ফ্যাশন ব্র্যান্ড জি-স্টার প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের প্রায় ১০ লাখ জিন্স সংগ্রহ করে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির আঞ্চলিক কার্যক্রম ব্যবস্থাপক শফিউর রহমান। তিনি বলেন, ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের আরও ওপরে উঠার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, যেহেতু আমাদের দেশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে কম দামী জিনস উৎপাদন করে থাকে।
বিগত ১০ বছর ধরে একমাত্র বাংলাদেশি ডেনিম রপ্তানিকারক হিসেবে ডাচ ফ্যাশন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছে জেনেসিস ডেনিম। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনির আহমেদ উচ্চমানের পণ্য উৎপাদনের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন। ক্রেতাদের চাহিদা পূরণে কিছু অভিনব প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পণ্যের স্টাইল, ওয়াশ ও ক্যামিকেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডের শর্তগুলো বেশ জটিল ছিল বলে আমাদের শুরুটা ছিল বেশ কঠিন। এক জোড়া প্যান্ট বানাতে শুরুতে আমাদের সাত দিনের মতো সময় নিতে হয়েছিল। কিন্তু এখন আমরা ব্র্যান্ডের পছন্দ-অপছন্দ এবং ফ্যাশনের নান্দনিকতাগুলো বুঝতে পারছি।
মুনির আহমেদ জানান, এক জোড়া ডেনিম প্যান্টের জন্য জি স্টার ৩৫ ডলার পর্যন্ত দিয়ে থাকে, যেখানে নিম্নমানের ডেনিম রপ্তানিকারকরা গড়ে মাত্র ৬ ডলারের মতো পেয়ে থাকেন।
চট্টগ্রাম ইপিজেডের শিল্প-প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক জিনসের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত নাসির উদ্দীনের হাত করে বাংলাদেশে কোয়ালিটি ডেনিম রপ্তানির যাত্রা শুরু। ১৯৮৪ সালে এনজেডএন ফ্যাশনওয়্যার নামে ছোট একটি কারখানায় ডেনিম উৎপাদন শুরু হলেও তখন দেশে কোনো ওয়াশিং প্ল্যান্ট ছিল না। লন্ড্রির কাজগুলো ইতালিতে করতে হতো। এক বছর পর তারা ইতালির ক্রেতার সহযোগিতায় দেশে ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপন করে।
রপ্তানি বাজারে ডেনিম কাপড়ের চাহিদা বিবেচনায় টেক্সটাইল খাতের দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তা ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ১৯৯৮ সালে সুইস-জার্মান প্রতিষ্ঠান বেনিনজারের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডেনিমের জন্য বিশেষায়িত কারখানা সাশা ডেনিম স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরুর আগে আরও দুটো ডেনিম প্রস্তুতকারক বেঙ্গল ইনডিগো ও বেক্সিমকো ডেনিম উৎপাদন করলেও তা ছিল স্থানীয় বাজারের জন্য। ২০০৮ সালে এনভয় টেক্সটাইলস বাংলাদেশে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে রোপ ডাইড প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে।
স্থানীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের কারণে বাংলাদেশের ডেনিম জিনস আন্তর্জাতিক বাজারের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ঢিমেতালে চললেও ডেনিম জিনস প্রবৃদ্ধি রক্ষা করতে সক্ষম বলে জানিয়েছে কারখানা সংশ্লিষ্টরা। এনভয় টেক্সটাইলসের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দীন আহমেদ বলেন, যেহেতু এত আকর্ষণীয় মূল্যে ও কম সময়ে অন্য কোথাও থেকে ডেনিম পাওয়া সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও ভালো হলে ক্রেতারা বাংলাদেশে আরও ক্রয়াদেশ নিয়ে আসবে। ডেনিম রপ্তানিকারকদের সামনে মানসম্পন্ন ওয়াশের মাধ্যমে পণ্যের মূল্য নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও অধিকাংশ রপ্তানিকারকই এখনও সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন না। অনন্ত অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরীফ জাহির বলেন, মূলত দীর্ঘ সময়ের কারণেই ক্রেতারা হাই-ভেল্যু ডেনিম প্যান্টের জন্য বাংলাদেশে আসছেন না। আমাদের অধিকাংশ ডেনিম প্রস্তুতকারী নিম্ন থেকে মধ্যম মানের জিনস উৎপাদন করে থাকে। যারা উচ্চমানের জিনস উৎপাদন করছে তাদের তুরস্ক, চীন ও পাকিস্তান থেকে কাপড় আমদানি করতে হবে।