ডলার সংকট : পরিস্থিতির উন্নতি নেই

21

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে প্রায় ১০ মাস ধরে ডলারের সংকট চলছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগেও নতুন বছরের শুরুতে পরিস্থিতির উন্নতির কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যদিও এর আগে একাধিকবার সরকারের পক্ষ থেকে নতুন বছরে নগদ ডলার সংকট মিটে যাবে বলে আভাস দেওয়া হয়েছিল। উল্টো পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে বলে আশংকা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এখনো ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকে এলসি খোলা যাচ্ছে না। এমনকি ব্যাংক ঋণপত্রের বিপরীতে রপ্তানিকারককে ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে না পারায় আমদানি করা পাঁচটি জাহাজের ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪০১ টন তেল ও চিনি দীর্ঘদিন ধরে সাগরে ভাসছে। রোজাকে সামনে রেখে পাঁচটি জাহাজে করে এসব পণ্য এনেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রæপ।
আগামী মার্চ মাসে শুরু হচ্ছে রোজা। রোজা সামনে রেখে সাতটি পণ্য জরুরি ভিত্তিতে আমদানিতে সহায়তা করার জন্য ডিসেম্বরের শুরুতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে’ এসব পণ্য আমদানিতে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দিয়েছিল। এসব পণ্য আমদানিতে প্রায় আড়াইশো কোটি ডলার দরকার হবে। সেই সময় ব্যবসায়ীদের এলসি সমস্যা মেটাতে একটা ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেল’ খোলার কথাও জানিয়েছিল সরকার। কিন্তু জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে এসেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। ফলে সোমবার আরেক দফা চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
সভার শুরুতে আলোচনায় অংশ নিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা বলেন, আমদানি না হওয়ায় আদা-রসুনের দাম বাড়ছে। ভারত থেকে রসুন আমদানি বন্ধ ছিল। চীন থেকেও আমদানি হচ্ছে না। আদা-রসুন আমদানিতে এলসি স্বাভাবিক না হলে দাম আরও বাড়বে। ডলারের মূল্য অনেক বেড়েছে। ব্যাংকে এলসি খোলা যাচ্ছে না। অনেক জটিল হয়ে গেছে। এ অবস্থায় রমজান সামনে রেখে এলসি জটিলতা দূর করাসহ শুল্ক প্রত্যাহার করে পণ্য আমদানি বাড়ানোর সুযোগ দিতে হবে। যদি এখন থেকে পণ্য আমদানি করা না যায়, তাহলে রমজানে দাম বাড়বে। এমন আশংকা প্রকাশ করেন তারা।
একইভাবে আমদানি পণ্যের দাম বাড়ার আশংকার বিষয়টি সামনে আনেন সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপ-পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এবার রোজায় আমদানি করা পণ্যের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম না বাড়লেও দেশে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করবে। এর বেশি বাড়বে না।’
তবে বর্তমানে ঋণপত্র (এলসি) খোলা নিয়ে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা আগামী দু-এক মাসের মধ্যে স্বাভাবিক হতে পারে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার।
রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে বলে জানান আব্দুর রউফ তালুকদার। তিনি বলেন, রমজানের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে এলসি মার্জিন ন্যূনতম করাসহ বেশ কিছু নীতিগত পদক্ষেপ নিয়ে কাজ চলছে।
গত ডিসেম্বর থেকেই রমজানকেন্দ্রিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির এলসি খোলা শুরু হয়েছে। কিন্তু ডলার সংকটের কারণে নিত্যপণ্য আমদানি বিল পরিশোধে বিলম্ব ও এলসি খোলা নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এতে গত তিন মাস (অক্টোবর-ডিসেম্বর) এলসি খোলার হারও কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) অপরিশোধিত চিনির ঋণপত্র খোলার পরিমাণ আগের বছরের চেয়ে ২৮ শতাংশ কমেছে। এছাড়া অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের ৪৭ শতাংশ, সয়াবিন বীজ ৮৩ শতাংশ, অপরিশোধিত পাম তেল ৯৯ শতাংশ, ছোলা ৪৭ শতাংশ ও খেজুর আমদানির ঋণপত্র খোলা কমেছে ৩০ শতাংশ।
প্রসঙ্গত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে রোজায় বাজার স্বাভাবিক রাখতে চলতি জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৭ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল, ৬ লাখ মেট্রিক টন চিনি, ২ লাখ মেট্রিক টন মসুর ডাল, ৬ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ, ১ লাখ মেট্রিক টন ছোলা ও ৭৫ হাজার টন খেজুর আমদানি করতে হবে। আর এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ব্যয় হবে ১৩৮ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ভোজ্যতেল আমদানিতে ৭৭ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন। বর্তমানে বিশ্ববাজারে এক মেট্রিক টন সয়াবিনের মূল্য ১ হাজার ২১৭ মার্কিন ডলার এবং পাম অয়েল ৯৮০ ডলার। যেহেতু দেশে সয়াবিন ও পাম উভয় ধরনের ভোজ্যতেল আমদানি হয়, সে হিসাবে ভোজ্যতেল আমদানির গড় মূল্য ধরা হয় প্রতি টন ১ হাজার ৯৯ ডলার। একইভাবে চিনিতে ২৭ কোটি, মসুর ডালে ১০ কোটি, পেঁয়াজে ১২ কোটি, ছোলায় ৭ কোটি এবং খেজুর আমদানিতে প্রয়োজন ৫ কোটি মার্কিন ডলার। শুধু রোজার এক মাসের জন্য প্রয়োজন হয় ভোজ্যতেল ৩ লাখ, চিনি ৩ লাখ, পেঁয়াজ ৪ লাখ, মসুর ডাল ১ লাখ, ছোলা ১ লাখ এবং খেজুর ৫০ হাজার মেট্রিক টন।