ট্যুরিস্ট জোন যখন ‘ডেঞ্জার জোন’

31

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আধার বাঘাইছড়ির দুর্গম পর্যটর স্পট সাজেক অনিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখন ‘ডেঞ্জার জোনে’ পরিণত হয়েছে। চলতি শীত মৌসুমে সাজেকগামী পর্যটক বৃদ্ধির কারণে বেড়েছে যান চলাচল। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকের দৌরাত্ম্যে প্রতিনিয়ত ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। সর্বশেষ গতকাল সোমবার দুপুরে দীঘিনালা-সাজেক সড়কের হাউজ পাড়ায় পর্যটকবাহী পিকআপ দুর্ঘটনায় চার পর্যটক আহত হয়েছেন। এতে পর্যটকদের মাঝে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, পর্যটকবাহী পিকআপ, জিপ বা চাঁদের গাড়ি আর মোটরসাইকেলই সাজেকে পর্যটক আনা-নেওয়া করে। কিন্তু আকাবাঁকা ও ঝঁকিপূর্ণ সড়কে বেপরোয়া গতিতে এসব যানবাহন চলাচলের কারণে পর্যটন মৌসুমে দুর্ঘটনাও বেড়েছে। অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন পরিবহনের দৌরাত্ম্য বাড়লেও প্রশাসনের কারও কোনও হস্তক্ষেপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গত ২৩ ডিসেম্বরও সাজেক সড়কে জিপ গাড়ি ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক পর্যটক নিহত হয়েছেন।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, সাজেক বাঘাইছড়ি উপজেলা থেকে অনেক দূরে। অপেক্ষাকৃত দুর্গম এলাকা হওয়ায় সেখানে প্রতিনিয়ত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন। তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। দুর্ঘটনা বাড়ছে, এটাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় সেটা নিয়ে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি। এছাড়া সাজেকে একটি হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়েও ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আক্তার বলেন, আমরা কিছুদিন পরপর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে চালকের লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস সনদ যাচাই করে দেখার চেষ্টা করে থাকি। মুশকিল হচ্ছে, যখন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচলানা করা হয়, তখন কয়েকদিন সব ঠিকঠাকমত চলে। পরে আবার ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সহীন চালকরা সড়কে নেমে আসে। দুর্গম হওয়ায় উপজেলা থেকে প্রতিদিন এতটা দূরে গিয়ে এসব তদারক করার সুযোগ নেই। সড়ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি এখানে একটি হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করি, এসব হয়ে গেলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।
বাঘাইছড়ি থানা পুলিশ জানায়, গতকাল সোমবার সকালে খাগড়াছড়ি থেকে পর্যটক নিয়ে সাজেক যাওয়ার পথে বাঁকের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি পিকআপ উল্টে যায়। এ সময় সড়কে ছিটকে পড়ে চার জন আহত হন। এদের মধ্যে জুবেদা বেগম নামে এক নারীকে দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। ঢাকা থেকে তারা পরিবার নিয়ে সাজেক ঘুরতে যাচ্ছিলেন। এর আগে গত ২৩ ডিসেম্বর দুপুর পৌনে এটার দিকে উপজেলার মাচালং এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় হৃদয় নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে বাঘাইছড়ি থানা পুলিশ জানায়, ওইদিন সাজেক পর্যটন কেন্দ্র থেকে ফেরার পথে মাচালং এলাকায় পর্যটকবাহী চাঁদের গাড়ি ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে হৃদয় নামে মোটরসাইকেল আরোহী পর্যটক গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে দীঘিনালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
পুলিশ আরও জানায়, গত অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকেই সাজেকগামী পর্যটকের ভিড় বাড়তে শুরু করে। তখন থেকে দুর্ঘটনাও বাড়তে থাকে। এর মধ্যে গত ১৯ অক্টোবর সকালে সাজেক ইউনিয়নের হাউসপাড়া এলাকায় পর্যটন কেন্দ্র থেকে ফেরার পথে চাঁদের গাড়ি পাহাড়ের খাদে পড়ে এক পর্যটক নিহত হন। এতে আহত হন আরও আট পর্যটক। দুর্ঘটনাকবলিত চাঁদের গাড়িতে ছিলেন ৩০ বছর বয়সী মো. সাগর। নারায়ণগঞ্জ থেকে বন্ধুদের নিয়ে সাজেকে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। বেড়াতে এসে লাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে। এর একদিনের ব্যবধানে হাউজ পাড়া এলাকায় আবারও যাত্রী বোঝাই চাঁদের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শত ফুট নিচে পাহাড়ি খাদে পড়ে ১২ যাত্রী গুরুতর আহত হন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশের একটি দল স্থানীয়দের সহায়তায় আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত দীঘিনালা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। আহতরা সবাই সাজেকের স্থানীয় বাসিন্দা।
সাজেক থানার ওসি মো. নুরুল আলম বলেন, সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল ইদানীং বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনাও বেড়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে শীঘ্রই চালক ও মালিক সমিতির সাথে কথা বলে একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নেয়া হবে। এছাড়া এই সড়কে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কোনও চালককে গাড়ি নিয়ে বের হতে দেয়া হবে না।