টোকেন নিলেই সব মাফ!

45

নিজস্ব প্রতিবেদক

কাপ্তাই রাস্তার মাথার গোলচত্বরে ভেঙ্গে পড়েছে পরিবহন ব্যবস্থা। বহদ্দারহাট মোড় থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত পুরো এলাকায় অটোরিকশা, অটোটেক্সি, টেম্পু নিয়ন্ত্রণে মোটা অংকের চাঁদাবাজি চলছে। যে চাঁদাবাজির খেসারত দিচ্ছে সড়কটি ব্যবহারকারী জনগণ। কাপ্তাই রাস্তার মাথায় প্রতিদিন দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে মানুষের কর্মঘন্টা। বোয়ালখালী ও রাউজান অংশের গ্রাম সিরিয়ালের সিএনজি অটোরিকশায় ভরপুর থাকে এই স্টেশনটি। গ্রামের গাড়ি নগরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও টাকার বিনিময়ে টোকেন নিয়ে গাড়িগুলো নগরীতে প্রবেশ করছে। চট্টগ্রাম অটোরিকশা অটোটেম্পু চালক সমন্বয় পরিষদের নামে টোকেনগুলো দেয়া হয়। পুলিশ মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে দায়মুক্তি নিলেও পুনরায় টোকেন বাণিজ্য শুরু হয়।
টেক্সি চালক ও যাত্রীরা জানান, অটোরিকশা-অটোটেম্পু চালক সমন্বয় পরিষদের নেতারা পুলিশকে ম্যানেজ করেই দীর্ঘদিন ধরে সেখানে অপকর্ম চালিয়ে আসছে। বোয়ালখালী ও রাউজান অংশের গ্রাম সিরিয়ালের গাড়ি নগরে প্রবেশের বিনিময়ে প্রতিমাসে ৬০০ টাকা টোকেন নিতে হয়। এছাড়াও প্রতিদিন সকাল ও বিকেল লাইনম্যানের দুইধাপে ২০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। টোকেন নিলেই সব মাফ।
কাপ্তাই রাস্তার মাথায় দেয়া একটি টোকেন সংগ্রহ করে দেখা যায়, টোকেনের গায়ে ক্রমিক নং, মাস, বছর লেখা আছে। টোকেনের উপরের দিকে ‘চট্টগ্রাম অটোরিকশা অটোটেম্পু চালক সমন্বয় পরিষদ’ ও একদম নিচে ‘কাপ্তাই রাস্তার মাথা পরিচালনা কমিটি’ লিখা আছে। কাপ্তাই রাস্তার মাথায় টোকেন বাণিজ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহরা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মোশাররফ হোছাইন পূর্বদেশকে বলেন, আগের তুলনায় এখন অবস্থা একটু ভালো। প্রতিদিনই আমি অভিযান চালাচ্ছি। টোকেন পেলেই ছিঁড়ে ফেলছি। একটি সিন্ডিকেট এটি নিয়ন্ত্রণ করে। যা নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় আছি। উল্টোমুখে গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে সেখানে কনস্টেবল একটি বাড়িয়েছি। আমরা যতক্ষণ চাপে রাখি ততক্ষণ ভালো থাকে একটু সরলেই আবারো সমস্যা সৃষ্টি করে। দীর্ঘদিনের অভ্যাস একদিনে ঠিক হচ্ছে না।
পুলিশকেও টোকেনের অর্থ দিতে হয়- এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, উনারা আমাদের বিক্রি করেন। বিক্রি না করলে তো টোকেনগুলো বিক্রি করতে পারবে না।
ভুক্তভোগীরা বলেন, কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় গাড়ি চলাচল নিয়ে প্রতিদিনই মারামারির ঘটনা ঘটে। টোকেন ছাড়া কোনো গাড়ি নগরে ঢুকলেই গাড়ি চালকের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালায় সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। কোনো যাত্রী এর প্রতিবাদ করলে তাদেরকেও হেনস্থার শিকার হতে হয়। প্রতিদিনই কাপ্তাই রাস্তার মাথা ও কালুরঘাট ব্রিজে লাঠিয়াল বাহিনী থাকে। প্রায় প্রতিদিনই তাদের হাতে নাজেহাল হচ্ছে লোকজন।
কাপ্তাই রাস্তার মাথায় এমন অপকর্মের প্রতিবাদ করায় গত ৯ জানুয়ারি এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এ ঘটনায় আজাদ, মুজিব, জাফরসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের হয়। এ ঘটনায় কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে প্রধান নিয়ন্ত্রক আজাদ।
সম্প্রতি পটিয়ার কোলাগাঁও থেকে ভাড়া নিয়ে মাইজভাÐার দরবার শরিফে যাচ্ছিলেন এক ট্যাক্সিচালক। কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস নেওয়ার সময় ট্যাক্সির টোকেন না থাকায় ট্যাক্সি আটকে রাখেন দুই যুবক। পুলিশের ভয় ও ট্যাক্সি পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়। চালক গড়িমসি করলে জুয়েল নামে এক লাইনম্যান চড়থাপ্পড় মারেন ট্যাক্সিচালককে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে সেখানে ছুটে যান সেখানকার নিয়ন্ত্রক আজাদও। পুলিশের উপস্থিতিতে ট্যাক্সিচালকের কাছ থেকে মাফ চাইতে বাধ্য করেই ঘটনার সুরাহা করা হয়।
মারধরের শিকার ওই টেক্সিচালক বলেন, আমি টোকেন না নিয়ে কেন শহরে ঢুকেছি সেটি জানতে চাওয়া হয়। আমি কোলাগাঁও থেকে যাত্রী নিয়ে মাইজভান্ডার যাচ্ছি বললে সে কথাও শুনেনি। একপর্যায়ে আমার মুখে থাপ্পড় মারে। খবর পেয়ে পুলিশ ও আজাদ নামে এক ব্যক্তি এসে ওই লাইনম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে আমার সাথে মিলিয়ে দেন। অবস্থা দেখে মনে হলো পুলিশ ও অপরাধীরা ভাই ভাই।
শুধু কাপ্তাই রাস্তার মাথায় নয়, কালুরঘাট থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত ব্যাটারিরিকশা, সিএনজি অটোরিকশা, অটোটেম্পু অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলছে। একই সিন্ডিকেট সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। হারুন ও আজাদ এসব গাড়ি চলাচলের বিনিময়ে মোটা অংকের চাঁদাবাজি করে। চাঁদাবাজির একটি অংশ দেয়া হয় পুলিশকে। এ সিন্ডিকেটের কারণেই পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে জানা যায়।
চট্টগ্রাম অটোট্যাক্সি-অটো টেম্পো সমিতির সভাপতি মো. আজাদ পূর্বদেশকে বলেন, ‘আমরা সদস্যদের কাছেই টোকেন দিই। বাইরের কারোও কাছ থেকে নিই না। প্রতিদিন ৫টা করে নিই। আপনি একটু হারুন ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করেন। নয়তো আমি আপনার সাথে যোগাযোগ করতে বলছি’।