টুনটুনের সকাল

53

টুনটুনের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। এখন তার কিছুদিনের জন্য ছুটি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই আগের মতো স্কুলে যাবার তাড়া নেই। কোচিং করার ঝামেলা নেই। ঘরের স্যারের পড়া তৈরি করার চিন্তা নেই। মাও তাকে সকাল সকাল ঘুম থেকে ডেকে বলে না, টুনটুন ওঠো বাইরে সকাল তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। টুনটুন ভাবে সকাল কি সত্যিই অপেক্ষা করে? তবু ও এই কথাটা যখন মা বলে টুনটুনের খুব ভালো লাগে। ঘুম ভাঙলেও সে উঠে না, যতক্ষণ না মা তাকে এভাবে না ডাকে। এখন তার পড়া নেই। তাই মা তাকে এখন বেলা করেই ডাকেন। আজ টুনটুন নিজেই উঠে পড়েছে। কারণ মায়ের এখন খুব কাজ বেড়ে গেছে। কলকাতা থেকে তার পিসি,পিসো আর ছোট দুজন ভাইবোন এসেছে। ওদের জন্য মা রোজ নতুন নতুন রান্না করে। সবাই খেয়ে মায়ের রান্নার খুব প্রশংসা করে। টুনটুনের ওদের প্রশংসা শুনতে ভালো লাগলেও মায়ের জন্য খুব কষ্ট হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মা সারাদিন কাজ করে। এক এক সময় মা আর পারেনা। তখন মায়ের মুখে কেমন যেন ক্লান্তি। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আনমনে মা যেন কি ভাবে। টুনটুনের তখন ইচ্ছে করে একটুকরো আনন্দ হয়ে সে যদি মায়ের মনে ঢুকে যেতে পারতো। এইসব ভাবতে ভাবতে টুনটুন ওদের উঠোনে নেমে আসে। এখন শীত এসেছে। ঘাসের ডগায় শিশির জমে আছে। সকালের রোদ শিশিরের উপর পড়তেই হীরের মতো ঝলমল করে উঠেছে।
টুনটুনের মনে হয় মায়ের হাসি ঠিক এরকম যখন টুনটুনের ভালো কিছু হয়। টুনটুন উঠোন ছেড়ে তাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় আসতেই দেখে অন্ধ ছেলেটা এখনো ঘুমাচ্ছে গাছের নীচে। তার পাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে নেড়ি কুকুরটা। শীতে কুকড়ে আছে ছেলেটা। গায়ে কিচ্ছু নেই। টুনটুন ওদিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে কাছে গিয়ে ওর গায়ে শাল যেটা মা ঘুমের মধ্যে ওর গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিল সেই শাল ছেলেটার গায়ে আলতোভাবে ঢেকে দিয়ে বাড়ির দিকে ফিরে আসতে লাগল।
মনে মনে একটু ভয়, যদি মা কিছু বলে। আবার ভাবলো যদি মা জিজ্ঞেস করে বলবে, মাগো আমার মতো একজন টুনটুনকে দিয়েছি। ওর মা নেই কিনা, তাই। কিন্তু ঘরে এসে মায়ের সামনে দাড়াতেই, মা ওকে আদর করে করে বললেন চাদরটা ঐ অন্ধ ছেলেটাকে দিয়েছিস? খুব ভালো করেছিস। ভাবছিলাম ওকে শীতে গরম কাপড় দেব। ঠাকুর আমার ইচ্ছে শুনেছে। টুনটুন খুব অবাক হয়ে ভাবছে মায়েরাও কি মনের কথা সব জানে?