টুকটুকির বিয়ে

45

 

মায়াবী সুন্দর সকালটা কতো ভালো লাগছে। নিরা ভাবছে কতো সুন্দর সবুজে প্রকৃতি ভরা আমাদের দেশ।
ইচ্ছে করে মেঘের পাহাড় পাড়ি দিয়ে চাঁদের বুকে ঘুরে বেড়াতে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে আকাশের নীল। হৃদয়ের ক্যানভাসে আনন্দগুলো অনুভব হয়। কত সুরে পাখিরা করছে ডাকাডাকি, শিশির ভেজা সবুজ কচি ঘাসগুলো দুলছে। বড় বড় কচুপাতায় ফোটা জল করছে টলমল।

এই ফাঁকে কিছু শিউলি ফুল কুড়াবো।
রুজি আজ তার বন্ধুদের নিয়ে আমার বাড়িতে টুকটুকিকে দেখতে আসবে। টুকটুকি’র বিয়ে হলে বড্ড একা হয়ে যাবো। মায়ের মুখটা মলিন কষ্টের ছাপ। নিরা- মা, তোমার কি খুব কষ্ট, এতো চিন্তা কিসের? মুখটা ফ্যাকাশে করে রাখো কেন?
মা- তুমি লেখাপড়া না করলে আমার তো কষ্ট হবেই।
নিরা বললো, ঠিক আছে? টুকটুকির বিয়েটা হয়ে যাক, মন দিয়েই পড়বো।
এত্তো এত্তো কাজ আমি একা সামলাতে পারব না।

মা বললো, কী কাজ? কী হয়েছে নিরা, টুকটুকি বা কে?
-মা তুমি তো দেখছি সব ভুলে বসে আছো!
আর কয়দিন পর আমার পুতুল টুকটুকির বিয়ে।
তো বিয়ে কার সাথে হচ্ছে? পাত্র কে? রুজির ছেলে, ছেলেটি বেশ সুন্দর স্মার্ট অনেক পড়াশুনা জানা তাই ওদের ডিমেন্ট একটু বেশি। ঘটক ফাতেমা খালা যৌতুক চাইলো। আমার টুকটুকি বা কম কিসের? টুকটুকির মতো এই পাড়ায় কয়জন মেয়ে আছে বলো, রূপে গুণে অনন্যা। বেশি যৌতুক চাইলে রুজিকে বলে দেবো মেয়ে বিয়ে দেবো না।
মা- তুমি একটু রোজিকে বুঝাবে। আমি নগদ টাকা স্বর্ণ দিতেই পারব না। আমি ইসকুলের টিফিন থেকে কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছি। টুকটুকির বিয়েতে খরচ করবো। ধুমধাম করে টুকুটুকির বিয়ের আয়োজন করতে পারবো। আমি যা পারি উপহার দিবো, মেয়েটা আর শ্বশুর বাড়িতে ছোট হয়ে থাকবে না।

মা অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে নিরার মুখের দিকে। এতো কিছু কীভাবে শিখলো। সত্যই যেন নিরা বড় হয়ে গেল। মায়ের চোখ দুটো টলমল করে কবে নিরা বড় হবে। শ্বশুর বাড়ি যাবে। ‘মা’ বলে রুজি খুব ভালো মেয়ে, তোমার ভালো বন্ধু, তুমি বুঝিয়ে বলো সে নিঃশ্চয় বুঝবে। তোমাদের ঘটক কে?
নিরা-আর বলিওনা ফাতেমা খালা, সারাদিন এতো কথা কেমন করে বলে? ফাতেমা খালা তো যৌতুকের কথা বলল। তুমি বরং রোজিকে জিগ্যেস করো।
আজ রুজি, রুনা, বকুল, হাসিনা, শাহানা, শিল্পী, তারা আসবে বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করতে।
আমি বলে দিব ফাতেমা খালাকে বেশি যৌতুক চাইলে টুকটুকিকে বিয়ে দেবো না। মা ঠিক আছে, তুমি শান্ত হও ব্যাপারটা আমি দেখবো। নিরা এবার হাসে,তুমি আমার পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো সেরা ‘মা’।

পুতুল বিয়ে নিয়ে হইচই পড়ে গেছে চারপাশে। রুজি, রুনা, হাসিনা, শাহানা, শিল্পী, ফেরদৌসী, সবাই টুকটুকিকে দেখে মুগ্ধ হলো। ফাতেমা খালা যৌতুকের কথা বলে। নিরা আমি যৌতুক দিয়েই টুকটুকির বিয়ে দেবো না। রুজি কিছুটা লজ্জামাখা কণ্ঠে বললো। আমি তো যৌতুক চাইনি। চেয়েছিলো ফাতেমা খালা।
নিরা – সে তো তোমাদের ঘটক।
রুজি কী হয়েছে নিরা তোমার? কেনো মন খারাপ করে বসে আছো? আমাদের ভুল হয়ে গেছে। ফাতেমা খালা আর যৌতুক চাইবে না। আমি বলছি আর কোনো দিন কেউ যৌতুক চাইবে না। নিরা- এটা তো খুব ভালো কথা। তাহলে আর সমস্যা হবার কথা নয়।
শুক্রবার সবার ইসকুল বন্ধ, সেদিন বিয়ের আয়োজন করা হবে।

ড্রইং রুমে বসে সবাই নুডলস, স্যুফ, চিকেন, আনন্দ করে পরিবেশন করলো। নিরা বলে সেদিন রুজির হাতের নুডলস রান্না এখনো জিহবায় জল আসে। কী দারুণ নুডলস। রুজি বলে,আরে আরো কতো মজার মজার রান্না হবে।

শুক্রবার টুকটুকির বিয়ে।
বরযাত্রী এলো। রাজপুত্র বেশে বর। বেলুন আর ফিতা দিয়েই দারুণ ভাবে সাজিয়েছে বগার বিলের প্রকৃতির মাঝখানে বড় মাদুর, চাদর, বিছিয়ে সবাই বসেছে। রুজি টুকটুকিকে সাজিয়েছে যেনো একেবারে লালটুকটুকে পরী। রুজি- বেশ, বেশ, দেখতে হবে না বউমাটা কার?
নিরা- মেয়ে তো আমার। নিরা না হাসলেও অন্য সবাই হেসে উঠলো। এভাবেই বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হয়ে গেলো।
রুজি, নিরাকে বুকে জড়িয়ে বলে, তোমার টুকটুকি খুব ভালো থাকবেই খুব যতন করবো চিন্তা করো না।
টুকটুকি যাবার পর নিরার মনটা খারাপ।
টুকটুকি ছাড়া কখনো একা থাকেনি। তার চোখ থেকে অশ্রæ গড়িয়ে পড়লো।