টিসিবির ‘ট্রাক সেল’ কার্যক্রম ভিড় বেশি, পণ্য কম

9

মনিরুল ইসলাম মুন্না

নগরীর স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষের একমাত্র ভরসা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) পণ্য। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ন্যায্যমূল্যে টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে নগরবাসী ভিড় জমান। কিন্তু চাহিদার তুলনায় পণ্য কম দেয়ায় বিক্রেতাদের উপর ক্ষিপ্ত হচ্ছেন ক্রেতারা। বিক্রেতাদের দাবি, ‘অফিস থেকে আমাদের যা পণ্য দেয়া হয়, তা শেষ হলে আমরা কোথা থেকে দিব’? প্রয়োজনের তুলনায় ট্রাকের সংখ্যা কম থাকায় অন্যান্য যে সকল স্থানে আগে পণ্য বিক্রি হতো, সেখান থেকে অনেক মানুষ পণ্য কিনতে বর্তমান ট্রাক সেল কার্যক্রম স্পটে চলে আসছেন। আবার চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় দীর্ঘ সময় লাইনে থেকেও কেউ কেউ ফেরত যাচ্ছেন ‘পণ্য নাই’ এই কথা শুনে। তাই স্বল্প আয়ের মানুষকে সুবিধা দিতে বরাদ্দ বাড়াতে টিসিবির প্রতি আহবান জানান ক্রেতারা।
টিসিবি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চাহিদার তুলনায় পণ্য অপ্রতুল। বর্তমানে যেভাবে পণ্য দেয়া হচ্ছে সেভাবেই দেয়া হবে। এটাই কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা। পরবর্তী নির্দেশনা আসলে তা বাড়ানো হবে। সরেজমিন কোতোয়ালী থানাধীন সরকারি মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে গতকাল মঙ্গলবার সকালে কয়েকশজনকে টিনিবি’র পণ্য নেয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে। তবে দুপুর একটার দিকে মানুষের ভিড় আরও বেড়ে যায়। যার মধ্যে বেশিরভাগই স্বল্প আয়ের নারী-পুরুষ। সকাল ১০টার দিকে কথা হয় দিলরুবা বেগম নামে এক গৃহিণীর সাথে। ফিরিঙ্গী বাজার থেকে তিনি এসেছেন পণ্য কিনতে। তিনি বলেন, ‘দাঁড়াইছি তখন নয়টা হবে। ট্রাক এসেছে প্রায় ১০টার দিকে। আমার আগে কয়েকজন থাকাতে পণ্য পেতে আরও ১০-১৫ মিনিট সময় লেগে যায়।’ দুপুর একটার দিকে টিসিবি’র ট্রাক ঘিরে মানুষের হুড়োহুড়ি বাড়তে থাকে। এসময় প্রায় ৩শত’ লোকের ভিড় জমে যায়। পরে অনেকে পণ্য না পেয়ে ফিরেও যান। এজন্যে বিক্রয়কর্মীর উপর ক্ষেপে যান লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজন ক্রেতা।
পণ্য নিতে আসার পরও না পেয়ে ছবির উদ্দিন জানান, প্রায় একঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর যদি বলে পণ্য শেষ হয়েছে, চলে যান। তখন মেজাজ খারাপ না হয়ে, কি হবে? সরকারের উচিত নি¤œবিত্তদের জন্য পণ্য বাড়িয়ে বিক্রি করা। কিন্তু এখন পণ্যের তুলনায় মানুষের সংখ্যা বেশি। যত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছে ততকেজি পণ্যও দেয়নি তারা। টিসিবির প্রতি সরকারের আরও নজরদারি বাড়ানো উচিত।
কোতোয়ালি এলাকায় টিসিবি’র টু ব্রাদার্সের পরিবেশক মো. আনোয়ার বলেন, পণ্য দিতে না পারার কারণে মাঝে মাঝে ভোক্তারা আমাদের উপর চরম ক্ষিপ্ত হন। আর এখানে তো আমাদের কিছু করার নেই। আমরা যা পণ্য আনছি তা বিক্রি করে ফেলছি। কোন পণ্য রেখে দেয়া হচ্ছে না, কিন্তু সেটা ভোক্তারা বুঝতে চান না। তারা আমার বিক্রয় প্রতিনিধির উপর ক্ষিপ্ত হচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, আজকে টিসিবি থেকে আমাদেরকে মাত্র ৫০০ লিটার তেল, ২০০ কেজি চিনি আর ৪০০ কেজি ডাল ও ৪০০ কেজি পেঁয়াজ প্রদান করা হয়েছে। তাই চাহিদার তুলনায় পণ্য কম থাকাতে সকলকে দেয়া সম্ভব হয়নি। আমরা চাই না কাউকে খালি হাতে ফেরত দিতে। কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের বাধ্য করে।
টিসিবি সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরীতে ১২টি ট্রাকের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। পেঁয়াজ, ডাল, চিনি ও সয়াবিন তেল এই চারটি পণ্য নিয়ে বিক্রি করছে ট্রাকগুলো। এসব ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩০ টাকা, চিনি বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৫৫ টাকা, মসুর ডাল ৬০ টাকা কেজি এবং সয়াবিন তেল লিটার প্রতি বিক্রি হয়েছে ১১০ টাকায়।
জানা গেছে, পেঁয়াজ, চিনি, মসুর ডাল ও সয়াবিন তেলের দাম বাজারে বেশ চড়া। যেমন- বাজারে পেঁয়াজ কেজিপ্রতি ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করা হচ্ছে। টিসিবি’র ট্রাকে বিক্রি করছে ৩০ টাকা। তাহলে সাশ্রয় হচ্ছে ১৫ টাকা। চিনি এখন কেজিপ্রতি ৭৫ থেকে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। টিসিবির ট্রাক থেকে কিনলে সাশ্রয় হচ্ছে কেজিতে ২০ থেকে ২৫ টাকা। মাঝারি দানার মসুর ডাল কিনলে সাশ্রয় কেজিতে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। কারণ, বাজারে এ ডাল কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকা, টিসিবি বিক্রি করছে ৬০ টাকা দরে। সাশ্রয় হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। এক লিটার সয়াবিন তেলেও ৪০ থেকে থেকে ৫০ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। কারণ, টিসিবির বোতলজাত তেলের লিটার ১১০ টাকা, আর বাজারে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা পর্যন্ত। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহে ৬ দিন চলছে এই কার্যক্রম। টিসিবি বাজারের প্রচলিত ব্র্যান্ডের তেল-চিনি-ডাল বিক্রি করছে বলে জানিয়েছে।
টিসিবি’র চট্টগ্রাম আঞ্চলিক প্রধান জামাল উদ্দিন আহমেদ দৈনিক পূর্বদেশকে জানান, আমরা সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত ও মাস্ক পরিধানকারীদের পণ্য বিক্রি করার জন্য পরিবেশকদের বলে দিয়েছি। এতে স্থানীয় প্রশাসন সহায়তা করছে। আগামী ২৮ তারিখ পর্যন্ত পণ্য বিক্রি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতি ট্রাকে এক হাজার ৫০০ কেজি পণ্য সরবরাহ করছি। যাতে রয়েছে- ৪০০ কেজি পেঁয়াজ, ৫০০ লিটার সয়াবিন তেল, ২০০ কেজি চিনি এবং ৪০০ কেজি ডাল প্রদান করছি।
পণ্য না পেয়ে অনেকে খালি হাতে অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন, পণ্যের পরিমাণ বাড়ানো হবে কি না প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মতে পণ্য সরবরাহ করছি। নির্দেশনার বাইরে কিছু করা যাচ্ছে না। আমরাও চাই পণ্যের পরিমাণ ও ট্রাক সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল। এছাড়াও বিষয়টি আমরা আমাদের (টিসিবি) প্রধান কার্যালয়ে জানিয়েছি।
বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের গেট, জামালখান প্রেসক্লাবের সামনে, আগ্রাবাদ, স্টিলমিল বাজার, ২নং গেট, বহদ্দারহাটসহ বারোটি পয়েন্টে এসব পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি। এছাড়াও শহরের বাইরে জেলা এলাকায় আরও আটটি পয়েন্টে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম চলছে। তবে নগরীর অভ্যন্তরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে একদিন পর পর পর্যায়ক্রমে বিক্রি করবে বলে জানিয়েছে আঞ্চলিক প্রধান জামাল উদ্দিন আহমেদ।