টিসিবির কার্যক্রম আরো বাড়ানোর তাগিদ

7

মনিরুল ইসলাম মুন্না

সারাদেশের পাশাপাশি চট্টগ্রামেও নিত্যপণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। লাগাম টানার মত অবস্থা নেই। পাশাপাশি প্রতিবছর এ সময়ে বাড়ে পেঁয়াজের দামও। সেই সাথে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে। ক্রেতারা বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম এখন হাতের নাগালের বাইরে। তাই ভোগান্তি হলেও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবি থেকে পণ্য কিনছি। টিসিবি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পূর্বের তুলনায় বর্তমানে ট্রাক সেলিং কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ট্রাক সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
গতকাল মঙ্গলবার নগরীর বিভিন্ন ট্রাক সেলিং পয়েন্ট পরিদর্শনে গেলে টিসিবি পণ্যের চাহিদা সম্পর্কে নানা তথ্য দেন মধ্য ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির ক্রেতা সাধারণ।
ক্রেতা মো. ওমর আলী রনি বলেন, যে হারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, লাইনে দাঁড়ানো ছাড়া উপায় নেই। সরকারের উচিত টিসিবি’র সেলিং পয়েন্ট আরও বাড়ানো। একে তো গরম, তার উপর লম্বা লাইন। ভোগান্তির যেন শেষ নেই।
জানা গেছে, প্রতি বছরের এই সময়ে আমাদের দেশে পেঁয়াজের একটি সংকট তৈরি হয়। গত কয়েক বছরের প্রবণতা এবং তথ্য তুলনা করলেই দেখা যাবে, এ সময়টা পেঁয়াজের বাজার ঊর্ধ্বমুখি থাকে। এ প্রবণতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ সময় দেশি পেঁয়াজের মজুদ শেষ হয়ে আসে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটা পরিবারে দেড় কেজি থেকে ৬ কেজি পেঁয়াজ লাগে মাসে। এই পরিমাণ পেঁয়াজ কিনতে বাড়তি যে খরচ হয়, তা কিছু মানুষের জন্য বড় সমস্যা। বিশেষ করে মধ্য ও নি¤œবিত্ত মানুষদের ক্ষেত্রে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার টিসিবির মাধ্যমে সহনীয় দামে তাদের হাতে পেঁয়াজ পৌঁছাতে পারে। এখনকার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই সরকার তা করতে পারত। টিসিবির খোলাবাজারে বিক্রি কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। এই কার্যক্রম আরও বাড়ানোর প্রয়োজন। সেটা সম্ভব হলে শুধু পেঁয়াজ নয়, অন্যান্য নিত্যপণ্য নিয়েও সাধারণ মানুষের কষ্টটা কমবে। বিশেষ করে করোনার কারণে অনেকে কাজ হারিয়েছেন, অনেক পরিবার সংকটে পড়েছে। তাদের কাছে টিসিবিই একমাত্র ভরসার জায়গা।
দেশের পেঁয়াজের বড় মোকাম খাতুনগঞ্জ হামিদউল্লাহ মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বলেন, কয়েক বছর ধরে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে। প্রায় ৮০ শতাংশ স্থানীয়ভাবেই জোগান দেওয়া হচ্ছে এখন। বাকিটা আমদানি করা হয়। আমদানির একটা বড় অংশই আসে ভারত থেকে। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। ফলে পেঁয়াজ আসতে কোনো বাধা নেই। জানুয়ারি নাগাদ দেশি নতুন পেঁয়াজও বাজারে উঠবে। এর আগেই মুড়ি পেঁয়াজ নামে কিছুটা অপরিণত পেঁয়াজ পাওয়া যাবে বাজারে। তখন বাজার আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তাই পেঁয়াজ নিয়ে আতঙ্কিত কিংবা হাহাকারের কারণ নেই। বেশি কিনে ঘরে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।
এদিকে টিসিবি’র তথ্যমতে, ইতিপূর্বে প্রতিটি ট্রাকে দেড় টনের কম পণ্য দেওয়া হতো। বর্তমানে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি ট্রাকে এখন এক হাজার ৭০০ কেজি করে পণ্য দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বাড়ানো হয়েছে ট্রাকের সংখ্যাও। টিসিবি’র পণ্যগুলো সরকার ভর্তুকিমূল্যে বিক্রি করছে। এসব পণ্যের মধ্যে কেজি ৩০ টাকা দরে পেঁয়াজ, ১০০ টাকা লিটারে বোতলজাত সয়াবিন তেল ও ৫৫ টাকা কেজি দরে চিনি ও মসুর ডাল বিক্রি করা হচ্ছে।
বাজারে পেঁয়াজ, চিনি, মসুর ডাল ও সয়াবিন তেলের দাম বেশ চড়া। প্রতিকেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি। টিসিবি’র ট্রাক থেকে কিনলে সাশ্রয় হচ্ছে ৪০ টাকা। চিনি এখন কেজিপ্রতি ৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। টিসিবির ট্রাক থেকে কিনলে সাশ্রয় হচ্ছে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা। মাঝারি দানার মসুর ডাল কিনলে সাশ্রয় কেজিতে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। বাজারে এ ডাল কেজিপ্রতি ৮০ টাকা, টিসিবি বিক্রি করছে ৫৫ টাকা দরে। এক লিটার সয়াবিন তেলেও ৫০ টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। টিসিবির বোতলজাত তেলের লিটার ১০০ টাকা, আর বাজারে ১৫০ টাকার বেশি। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহে ৬ দিন চলছে এই কার্যক্রম।
টিসিবি’র চট্টগ্রাম আঞ্চলিক অফিস প্রধান জামাল উদ্দিন আহমেদ দৈনিক পূর্বদেশকে বলেন, আমরা যেখানে ৯টি পয়েন্টে ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করতাম, সেখানে আজ (মঙ্গলবার) থেকে মহানগরে আরও ৪টি পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে এবং জেলাতে একটি পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। একইসাথে বাড়ানো হয়েছে পণ্যের পরিমাণও। আগামী ২৮ তারিখ পর্যন্ত আমাদের পণ্য বিক্রি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। বর্তমানে পণ্য কিনতে মানুষ যাতে গাদাগাদি না করে সে জন্য তিন ফুট দূরত্বে বৃত্ত করে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতি ট্রাকে এক হাজার ৭০০ কেজি পণ্য সরবরাহ করছি। যাতে রয়েছে- ৭০০ কেজি পেঁয়াজ, ৪০০ লিটার সয়াবিন তেল, ৩০০ কেজি চিনি এবং ৩০০ কেজি ডাল।
ট্রাক সংখ্যা আগামীতে আরও বাড়ানো হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারকদের পরামর্শমতে ৫টি পয়েন্ট বাড়িয়েছি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সামনে আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও জামালখান প্রেস ক্লাবের সামনের দুইটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট ছাড়াও আন্দরকিল্লা, ২ নম্বর গেট, স্টিলমিল বাজার, চান্দগাঁও, কাটগড়, ইপিজেড থানার সামনে, বন্দর থানার সামনে, আগ্রবাদের হোটেল সাংরিলা’র সামনে, আলকরণ, নিউ মার্কেট মোড়, বিবিরহাট, মুরাদপুর, উত্তর কাট্টলি, হালিশহরে পর্যায়ক্রমে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।