টিউশনও হতে পারে চাকরির অভিজ্ঞতা

হাসানুল বান্না

56

আমারা কমবেশি সবাই ছাত্রজীবনে টিউশন কিংবা কোচিংয়ে পড়িয়েছি। কিন্তু এ গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাটি চাকরি প্রত্যাশী ফ্রেশ-গ্র্যাজুয়েট কিংবা ইন্টার্নশীপের জন্য আবেদনকারীরা রেজ্যুমি বা সিভিতে কেউই সচরাচর উল্লেখ করেন না। এ বিষয়গুলোও যে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন অনেকেই। অথচ কিছু কৌশল খাটিয়ে এসবও চমৎকারভাবে রিজ্যুমিতে যুক্ত করে অভিজ্ঞতা দেখাতে পারেন। টিউশন অভিজ্ঞতা কেউই যুক্ত করতে চান না। একটা বিষয় মনে রাখবেন, খারাপ ছাত্ররা টিউশন করতে পারেনা। যারা পড়াশোনায় ভালো, লিডারশিপ-মেন্টরিংয়ে ভালো তারাই টিউশন করাতে পারে।
কিন্তু টিউটরিংকে পেশা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা একটি চ্যালেঞ্জের কাজও বটে। তাই অতি সাবধানে এ অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন, ছাত্রাবস্থায় টিউশন করলে পার্টটাইম আর পড়াশোনার শেষে করলে ফুলটাইম শব্দটি উল্লেখ করতে হবে। আমাদের একাডেমিক গ্রেড মূলত পাঠ্যবিষয়ের উপর আমাদের দক্ষতার প্রতিফলন ঘটায়। সে বিষয়গুলোতে আমাদের পারদর্শিতা প্রমাণ করে টিউটরিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানগুলো শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া।
এখন, শুধুমাত্র আমাদের কাজের প্রোফাইল বর্ণনা, পড়ালেখার বিষয়গুলোর উল্লেখ এবং শিক্ষার্থীদের ধরণ উল্লেখ করাই যথেষ্ট নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ কী-ওয়ার্ডের মাধ্যমে আবেদন করা কাজের সাথে টিউটরিংয়ের ব্যাকগ্রাউন্ডের রিলেটেড বর্ণনা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। একইসাথে ক্লাসের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং শিক্ষার্থীদের মেন্টরিংয়ের যে অভিজ্ঞতা সেগুলোও গুছিয়ে রেজ্যুমিতে উল্লেখ করতে হবে। নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করা যেতে পারে:
ক) বিভিন্ন জটিল বিষয়াদি শিক্ষার্থীদের কাছে সহজেই বোধগম্য করেছেন।
খ) বিভিন্ন শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের কার্যকরভাবে পাঠদান করেছেন।
গ) শিক্ষার্থীর অগ্রগতি সম্পর্কে স্কুলের শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করেছেন।
ঘ) শিক্ষার্থীদের পড়াতে গিয়ে বয়স/শ্রেণী অনুসারে নানা ধরনের শিডিউল তৈরি ও পরিচালনা করেছেন।
ঙ) শিক্ষার্থীদের এসাইনমেন্ট তৈরিতে সহায়তা করেছেন।
চ) শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি নেতৃত্ব ও নৈতিক শিক্ষা প্রদান করেছেন।
ছ) খেয়াল করে দেখবেন, যদিও আপনি কোনো চাকরি করেননি কিন্তু চাকরিদাতা কি চাচ্ছে তা মোটামুটি আপনি তুলে ধরতে পেরেছেন, যা বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে আসলেই গুরুত্বপূর্ণ।
জ) এছাড়াও আপনি এক্সট্রা আর কো-কারিক্যুলার কাজের অভিজ্ঞতাগুলো অবশ্যই গুছিয়ে উল্লেখ করবেন।
এগুলো কয়েকটি মৌলিক কাজের উদাহরণ মাত্র। আপনি আপনার অভিজ্ঞতানুসারে সংযুক্ত করতে পারবেন তবে মিথ্যের আশ্রয় একদম নিবেন না। এটা যেমন অনৈতিক তেমনই আপনাকে ইন্টারভিউ বোর্ডে বা পরবর্তীতে চাকরিতেও বিপদে ফেলবে।
এছাড়া, রেফারেন্স উল্লেখ করতে গিয়ে অনেকেই নানা জটিলতার সম্মুখীন হয়, যেমন আমার পরিবারের বা আত্মীয়-স্বজনের কেউই তেমন ভালো পজিশনে নেই কিংবা তারা ব্যবসা করে ইত্যাদি। এটা বাস্তবিকই একটা বড় সমস্যা, তবে দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
আপনি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কমবেশি অনেক শিক্ষকের সঙ্গেই ভালোমন্দ সম্পর্কে ছিলেন। এদের মধ্য থেকে সিনিয়র ক্যাটাগরির দু’জন শিক্ষকের নাম আপনি রেফারেন্সে ব্যবহার করবেন। বিষয়টি তাদের জানান, প্রয়োজনে পরামর্শ চান; এতে শুধু যে তাদের নাম ব্যবহারের উপকার পাবেন তাই নয় বরং তারা আপনাকে ক্যারিয়ার সম্পর্কিত পরামর্শও দিবেন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের কর্মকর্তাদের একটা ভালো সম্পর্ক থাকে। সুতরাং, এটা ভালো করে কাজে লাগান।
আর যাদের ইন্টার্নশীপ করা আছে তারা যে কোম্পানি থেকে করেছেন ওখানকার ১ জন (উচ্চ পর্যায়ের হলে ভালো) কর্মকর্তাকে রেফারি হিসেবে দেখান; আর একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ব্যাস, কাজ এটুকুই। এরপরও যদি আপনি না পারেন, তাহলে বুঝে নিবেন আপনার ‘কমিউনিকেশন স্কিল’ ভালো নয়, যা ছাড়া বর্তমান বাজারে জব পাওয়া নিতান্তই কঠিন।
সর্বোপরি, আমাদের কমবেশি সবাই নেটওয়ার্কিং করে থাকি। না করলে এখনই করেন। ভার্সিটির বড় ভাইয়েরা, কাজিনরা কে কোথায় জব করছে খবর নেন, তাদের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করুন, পরামর্শ নিন। তারা আপনার অনেক কাজে আসতে পারে।
আর শহরের বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টার ক্যারিয়ার সেমিনার, ওয়ার্কশপ, ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করে থাকে, সম্ভব হলে সেসবে যোগ দিন, শিখতে তো পারবেনই সাথে নেটওয়ার্কিং হবে সহজেই। ফেসবুকের চেয়ে লিংকডইন একাউন্টে নিয়মিত একটিভ থাকুন।
অবশেষে একটি কথাই বলতে পারি, নিজের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল কখনোই হারাবেন না। আপনার যেমন চাকরির প্রয়োজন, তেমনই প্রতিষ্ঠানগুলোরও প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে শাণিত করে দক্ষ একজন মানবসম্পদে পরিণত হয়ে উঠুন।

লেখক : সহকারী রেজিস্ট্রার,
ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম।