টানেলের সংযোগ সড়ক ছুঁয়ে যাক বাঁশখালী

203

নিজস্ব প্রতিবেদক

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু টানেল। এর নির্মাণ ব্যয় ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এ টানেলের মাধ্যমে যোগাযোগ বন্ধুত্বের শক্ত বন্ধনে মিলবে শহর ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম। এর সংযোগ সড়কের ছোঁয়ায় দক্ষিণ চট্টগ্রামকে ছাপিয়ে একেবারে মহেশখালী ও কক্সবাজার পর্যন্ত বিভিন্ন্ ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। অর্থনীতিতে আসবে গতি। পর্যটন ও উন্নয়নের অপার সম্ভাবনাও অর্থনীতির মূলধারার সাথে যোগসূত্র স্থাপন হবে।
কিন্তু বাস্তবায়নাধীন স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু টানেলের ছোঁয়া লাগছে না বাঁশখালীর প্রধান সড়কে। এতে প্রাণ আসবে না পর্যটন ও শিল্পায়নে। ফলে সড়কপথে দূরত্ব কমে কাছে আসছে না পর্যটনের রাণী কক্সবাজার। ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখালীতে বাস্তবায়নাধীন দেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথেও সহজ যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছে না। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল, তেল সংরক্ষণাগার ও অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ ২২টি প্রকল্পের সাথে টানেল কেন্দ্রিক যোগাযোগের প্রধান সড়ক বাঁশখালী সড়কের সম্প্রসারণও হচ্ছে না।
এ সড়ক ধরে চললে কক্সবাজারের মতো মহেশখালীর দূরত্বও কমবে এটা একেবারেই জানা কথা। ঝামেলা কমবে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতে। সাশ্রয় হবে সময়ের। পটিয়া সাতকানিয়া লোহাগাড়া সড়ক হয়ে কক্সকাজার গেলে ৩৫ কিলোমিটার বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে। আর বাঁশখালী হয়ে গেলে এ ৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব কমে আসবে। তাই সড়কটি যেন বাঁশখালী ছুয়ে যায়, অর্থাৎ টানেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনাতে বাঁশখালী সড়ক সম্প্রসারণের দাবিটি এখন জোরদার হচ্ছে।
এ দাবি পূরণ হলে একদিকে যেমন পর্যটন খাতে গতি আসবে, অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প কেন্দ্রিক অর্থনীতিতেও প্রাণের সঞ্চার হবে। কিন্তু টানেলের সাথে সংযোগ ঘটাতে বাঁশখালীর সড়ক সম্প্রসারণ করার কোন প্রকল্প না থাকায় এই অঞ্চলের পর্যটন ও উন্নয়ন দুই ক্ষেত্রেই উপেক্ষার ছাপ স্পষ্ট হচ্ছে- এমনটিই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবিও তাদের।
এ বিষয়ে দোহাজারি সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন সিংহ জানান, টানেল কেন্দ্রিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে বাঁশখালী সড়ক সম্প্রসারণের কোন প্রকল্প আপাতত নেই। তবে টানেলে চলাচলকারী যানবাহনের কথা মাথায় রেখে পটিয়া-কক্সবাজার সড়কটি ৬ লেনে উন্নীত করার প্রকল্প ইতোমধ্যে প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জমা দেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে আবার টানেলে চলাচলকারী যানবাহনের সুবিধার জন্য পটিয়া সড়কটি ক্রসিং থেকে কেরানিহাট পর্যন্ত ৩৪ ফিট করা হচ্ছে। বর্তমানে সড়কটি রয়েছে ১৮ ফিট। এছাড়া আনোয়ারা-গাছবাড়িয়া সড়কটিও ১৮ ফিটের জায়গায় ৩৪ ফিট করা হচ্ছে।
এদিকে আনোয়ারা অংশে টানেল থেকে বের হয়ে গাড়ি আনোয়ারা-চন্দনাইশ হয়ে পটিয়া মূল সড়ক ধরে বেরিয়ে যাবে। কিছু ক্ষেত্রে ক্রসিং হয়ে পটিয়ার রাস্তায় উঠবে। টানেল থেকে বের হওয়া যানবাহন এসব সড়ক হয়ে কক্সবাজারের রাস্তা ধরলে দূরত্ব কমবে না। তবে কর্ণফুলী টানেল হয়ে আনোয়ারা উপজেলার সিইউএফএল ঘাট-চাতরি চৌমুহনী-বাঁশখালী-পেকুয়ার মগনামা হয়ে সরাসরি কক্সবাজার সদরে যুক্ত হলে সড়ক পথে দূরত্ব কমবে ৩৫ কিলোমিটার।
অন্যদিকে বাঁশখালীতে সাগর লাগোয়া প্রায় প্রতিটি অংশেই সমুদ্র সৈকত। কদমরসুল, ছনুয়া, গন্ডামারা, সরল, বাহারছড়া, খানখানাবাদের উপক‚লজুড়ে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকত। সৈকতে সারিসারি ঘন ঝাউ বাগান। জোয়ার-ভাটার ঢেউয়ের শব্দ পর্যটকের মন কাড়ে। সমুদ্র লাগোয়া অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর ভিত্তি করে এ এলাকায় পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইলশা খানখানাবাদ এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ হারেস জানান, এখানে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিদ্যমান। দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত রয়েছে এখানে। লাল কাঁকড়া সৈকতের সৌন্দর্য অনেকখানি বাড়িয়ে দেয়। এখান থেকে সরাসরি সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন পর্যটকরা। সমুদ্রের সঙ্গে গা ঘেঁষে রয়েছে কুতুবদিয়া চ্যানেল, আর নিকটেই দ্বীপ কুতুবদিয়া। কক্সবাজার, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের চেয়েও এখানকার সৈকত অনেক বেশি প্রশস্ত। তবে বর্ষাকালে প্রশস্ততা কিছুটা কমে আসে। ১৯৯১ সাল থেকে বেশ কয়েকটি প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় এই এলাকার বেড়িবাঁধ তছনছ করে দিয়ে গেছে। ফলে পর্যটনের সৌন্দর্য সেখানে বিকশিত হচ্ছে না। সবমিলে অপার সম্ভাবনার এই পর্যটনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে না বঙ্গবন্ধু টানেল কেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। বাঁশখালীতে রয়েছে ইকোপার্ক (বাঁশখালী ইকোপার্ক )।
শহর হতে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে অবস্থিত শীলকুপ গ্রামে আটারশ হেক্টর বনভূমিতে গড়ে ওঠা এই ইকোপার্কটি বামের ছড়া ও ডানের ছড়া নামে দুটি অংশে বিভক্ত, যার নয়নাভিরাম দৃশ্য মানুষকে বিমোহিত করে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, টানেল চালু হলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম হবে একটি বিজনেস হাব। ব্যবসা বাণিজ্যের এই ঢেউ ছড়িয়ে যাবে বাঁশখালী, কক্সবাজার, চকরিয়া, আনোয়ারা, পটিয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া পর্যন্ত।
তিনি আরো বলেন, টানেল কেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতে বাঁশখালী সড়ক সম্প্রসারণের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। টানেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনাতে এটা থাকা দরকার ছিল। এটা না থাকা মানে পরিকল্পনায় গলদ। এখন শুনলাম চন্দনাইশ, আনোয়ারা ও পটিয়ায় সড়ক সম্প্রসারণে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। সড়ক সম্প্রসারণের কাজ চলছে উল্লেখিত সড়ক কেন্দ্রিক। অথচ বাঁশখালী, কক্সবাজার ও মহেশখালী কেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দ্রুত সুফল নিশ্চিত করা, পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং কক্সবাজারের সাথে সড়ক যোগাযোগে ৩৫ কিলোমিটার দূরত্ব কমাতে বাঁশখালী সড়ক সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। এনিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া সময়ের চাহিদা বলেও মনে করেন বাঁশখালী থেকে নির্বাচিত সাবেক এই সংসদ সদস্য।
তথ্যমতে, টানেল চালু হলে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড আবর্তিত হবে মহেশখালীতে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, মহেশখালী এলএনজি টার্মিনাল, তেল সংরক্ষণাগার, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অর্থনৈতিক জোনসহ ২২টি উন্নয়ন প্রকল্প, বাঁশখালীর কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, আনোয়ারায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড গ্রুপের ৩০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাঁশখালীতে এস আলম গ্রুপের এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরেই। বিকাশমান অর্থনীতির সেতুবন্ধন হবে এই অঞ্চল। আনোয়ারার ৭৮৩ একর জমিতে ইকোনমিক জোনের কাজ চলছে।
মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী জানান, এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য শতভাগ সফল হতে পারে বাঁশখালী সড়ক ব্যবহারের মাধ্যমে। কারণ টানেল নির্মিত হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ করে উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য।
এদিকে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির স্থায়ী পরিষদের সভাপতি জসিম উদ্দিন চৌধুরী, কার্যনির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. শেখ শফিউল আজম ও মহাসচিব আলহাজ এইচএম মুজিবুল হক শুক্কুর জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ মেগাপ্রজেক্ট স্বপ্নের বঙ্গবন্ধু টানেলের কারণে বদলে যাচ্ছে দক্ষিণ চট্রগ্রাম। দেশের ১৭ কোটি মানুষের স্বপ্নের এই টানেল নির্মাণের ফলে চট্টগ্রাম পরিণত হবে চীনের সাংহাই এর মতো ওয়ান সিটি টু টাউন-এ। এ কারণে দক্ষিণ চট্টগ্রামসহ পর্যটন নগরী কক্সবাজার, মহেশখালীর সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ, মাতারবাড়ি ও বাঁশখালীতে নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ প্রকল্প ও দেশের একমাত্র বাতিঘর খ্যাত দ্বীপ কুতুবদিয়ার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব সুফল বয়ে আনতো যদি টানেলের সাথে সংযোগ বাশঁখালী সড়ক ছুঁয়ে কক্সবাজারের সাথে মিলত। কক্সবাজারের সাথে যুক্ত হলে সড়ক যাতায়াতের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম কক্সবাজারের রাস্তা ৩৫ কি.মি. কমবে এবং এই সংযোগ সড়কটি দেশের অর্থনীতিকেও সমৃদ্ধ করবে বলেও জানান নেতৃবৃন্দ।