টাকায় মলমূত্রের ব্যাক্টেরিয়া সুরক্ষার উপায় কী?

50

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানের ছাত্রী নিশাত তাসনিম প্রায় ছয়মাস ধরে গবেষণা করেছেন টাকা ও কয়েন নিয়ে। আর খুলনা শহরের বিভিন্ন পর্যায়ের দোকান ও বিভিন্ন পেশার মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা টাকা ও কয়েনে তিনি এমন ব্যাকটেরিয়া পেয়েছেন যা মানুষের মলমূত্র থেকে আসে। ই-কোলাই জাতীয় ব্যাকটেরিয়া মানুষের মলে পাওয়া যায়। এই ব্যাক্টেরিয়াই ক্ষতিকর মাত্রায় নমুনা হিসেবে সংগ্রহ করা টাকা ও কয়েনে পাওয়া যায়।
তিনি জানান, এক হাজার মাত্রা পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়াকে সহনশীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য মনে করা হলেও ১২টি উৎস থেকে
নেয়া কাগজের টাকার নোট ও কয়েনের আরও অনেক বেশি মাত্রায় ব্যাকটেরিয়া পেয়েছেন তারা। সবচেয়ে বেশি পরিমাণ ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া পেয়েছি মাছ, মাংস আর মুরগীর দোকান থেকে সংগ্রহ করা টাকার নোট আর কয়েনে।
তিনি বলেন, এসব জায়গায় বিক্রেতারা যেই হাতে মাছ, মাংস, মুরগী ধরছেন এবং পরিষ্কার করছেন আবার সেই হাতেই টাকা ধরছেন। আবার ক্রেতারাও তাদের সাথেই হাত দিয়ে ধরে নোট বা কয়েন বিনিময় করছেন। আমরা দেখার চেষ্টা করছি যে প্রতিদিন যে এতো টাকা আমরা একে অন্যের সাথে শেয়ার করছি তা কতটা নিরাপদ। কিন্তু এটি করতে গিয়ে পুরনো সব নোট ও কয়েনেই ক্ষতিকর মাত্রায় ই-কোলাই ও ফেকাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পেয়েছি আমরা।
নিশাত তাসনিমের এই গবেষণার তত্ত¡াবধায়ক ছিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ হারুণ চৌধুরী। তিনি বলেন, খুলনা শহরে ছয় মাস ধরে এ পরীক্ষায় আমরা যা পেয়েছি, তা জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ভয়াবহ। কারণ সাধারণ ব্যাকটেরিয়া তো আছেই, সাথে পাওয়া গেছে মানুষের মলমূত্র থেকে আসা ব্যাকটেরিয়া, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক।
তিনি বলেন, টাকা সবার জন্যই জরুরি নিত্যপ্রয়োজনীয় কারণ টাকা ছাড়া সব অচল। কিন্তু অসাবধানতার কারণেই সেই টাকাই মানুষের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। টাকা আমরা যেভাবে ব্যবহার করছি আবার ঠিকমতো হাত না ধুয়েই খাবার খাচ্ছি। রাস্তায় সব এক হাতেই হচ্ছে।
নিশাত তাসনিম বলেন, যেখানে মাছ, মাংস ও মুরগী বিক্রি হয় সেই জায়গাগুলো প্রায় সবই নোংরা। আবার টাকা দাতা ও গ্রহীতার পরিচ্ছন্নতার অভাব থেকেও টাকা বা কয়েনে ব্যাকটেরিয়ো আসতে পারে।
অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, কিছু ব্যাকটেরিয়া এমনিতেই হয়। আবার কিছু ব্যাকটেরিয়া মলমূত্রের সাথে থাকে। যেমন ধরুন সুইপার হিসেবে যারা কাজ করেন, তারা সরাসরি মলমূত্র নিয়ে কাজ করেন। তাদের কাছেও প্রতিনিয়ত অনেক টাকা বা কয়েন হাতবদল হয়। আবার বাজারে টাকা মাটিতে পড়ে। মূলত এভাবে মলমূত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া চলে আসে নোট বা কয়েনে। পরীক্ষাটি করার জন্য তারা মুরগী, মাছ, মাংস, ফুচকাসহ রাস্তার খাবারের দোকান, রিকশা ও ভ্যান চালকসহ মোট বারটি উৎস থেকে নোট ও কয়েনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আবার নোট ও কয়েনের ক্ষেত্রেও বাজারে প্রচলিত সব কয়েন ও নোটের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে খুলনা শহরের নানা জায়গা থেকে।
অধ্যাপক আব্দুল্লাহ হারুণ বলেন, নোট বা কয়েন হাতে নেয়ার পর সেই হাত না ধুয়ে খাবার খেলে ব্যাকটেরিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা থাকে। অনেকেই ওয়াশরুম থেকে আসার পর ঠিকমতো হাত ধোয়ার অভ্যাস নেই। তারাই আবার টাকা ধরছেন এবং সেই টাকা তাদের কাছ থেকে অন্যদের কাছে যাচ্ছে। এভাবেই ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ছড়াচ্ছে। তাই ঝুঁকি মুক্ত থাকতে চাইলে সচেতনতার বিকল্প নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীমা নাসরিন শাহেদ বলেন, যথাযথভাবে হাত না ধুয়ে খাবার খেলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার কারণে ডায়রিয়াসহ নানা সমস্যা হতে পারে। এমনকি খুব বেশি মাত্রায় ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার কারণে পরিপাকতন্ত্রের আরো নানা ধরণের রোগবালাই হবার আশংকা থেকে যায়।
অধ্যাপক আব্দুল্লাহ হারুণ জানান, মাংসের দোকানে সর্বোচ্চ ২৬৭০, মাছ বিক্রেতার কাছে থাকা টাকায় ২৬০০ ও মুরগি বিক্রেতার টাকায় ২৩০০ ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া এবং এর চেয়ে বেশি মাত্রায় ফেকাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। এমনকি ভিক্ষুকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা কয়েনেও এক হাজার মাত্রার চেয়ে বেশি মাত্রায় কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে।
তিনি জানান, খুলনায় তারা একই বিষয়ে আবারো পরীক্ষা নিরীক্ষা করবেন এবং এরপর আরও কয়েকটি বড় শহরের নোট ও কয়েনের ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি নিয়েও গবেষণার পরিকল্পনা আছে তাদের।