ঝুঁকি যতই আসুক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

6

পূর্বদেশ ডেস্ক

সকলকে দুর্যোগের ঝুঁকি বিষয়ে সতর্কতার সাথে কাজ করার আহŸান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যতই ঝুঁকি আসুক দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশটা আমাদের, কাজেই যত ঝুঁকি আসুক দেশের উন্নয়ন আমাদেরকে অব্যাহত রাখতে হবে। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে। দারিদ্রের হাত থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। বঙ্গবন্ধু কন্যা জাতির পিতার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ থেকে সেই বিখ্যাত উক্তি ‘আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবানা’র উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেন, যত দুর্যোগই আসুক বাঙালিকে, বাংলাদেশকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না-এটাই হচ্ছে আমাদের কথা।
শেখ হাসিনা গতকাল সকালে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি’র (সিপিপি) ৫০ বছর পদার্পন ও আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস ২০২১ উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।
তিনি গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের অপরপ্রান্তে মুক্তিযোদ্ধা মাঠ কক্সবাজার প্রান্তও সংযুক্ত ছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সাড়াবিশ্বে আজকে দুর্যোগ ঝুঁকি মোকবেলায় একটি আদর্শ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আমাদের এই সম্মান যাতে বজায় থাকে সেজন্য ভবিষ্যতে সে বিষয়েও সকলকে সচেতন থাকতে হবে এবং এই ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি এ সময় ’৯১ সালের ঘুর্ণিঝড়ের পর আওয়ামী লীগের সংসদে এই নিয়ে কথা তোলার প্রেক্ষিতে সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উক্তি ‘যত মানুষ মরার কথা ছিল তত মানুষ মারা যায় নাই’ উল্লেখ করে বলেন, এই কথা জীবনে যেন আর শুনতে না হয় সেজন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে এবং মানুষকে সচেতন করতে হবে। খবর বাসসের।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো এনামুর রহমান এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে চারটি ইউনিটেরও উদ্বোধন করেন। এগুলো হচ্ছে- দ্রæত সাড়াদান ইউনিট, পানি থেকে উদ্ধার ইউনিট, অতি জোয়ার মনিটরিং ও সাড়াদান ইউনিট এবং খেলায় খেলায় দুর্যোগ প্রস্তুতি ইউনিট (স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে জনসচেতনতামূলক)। এছাড়া, ‘দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনা’ শীর্ষক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক একটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন তিনি এবং দুর্যোগ প্রশমন বিষয়ক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচেষ্টা সম্পর্কিত ভিডিও চিত্র ‘দুর্যোগ প্রশমনের ৫০ বছর বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা’ শীর্ষক ভিডিও চিত্র ও অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়।
সিপিপি’র ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ৩ জন সংগঠক এবং ৬ জন স্বেচ্ছাসেবক নারী-পুরুষকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে ডা. এনামুর রহমান অনুষ্ঠানে আজীবন সম্মাননা প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস গণভবন প্রান্ত থেকে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যগণ, তিনবাহিনী প্রধানগণসহ সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ, বিদেশি কূটনিতিক ও মিশন প্রধান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সবসময় জনগণের পাশে আছে। দুর্যোগে আর কেউ না থাকুক আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সবসময় পাশে রয়েছে।
তিনি এই সময় করেনাকালিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা স্মরণ করে বলেন, মৃতের দাফন-কাফন থেকে শুরু করে তাদের ঘরে খাবার পৌঁছে দেয়ার কাজটা আমরা সরকারের পক্ষ থেকে যেমন করেছি তেমনি দলের পক্ষ থেকেও করেছি । তবে, আর কাউকেই এভাবে এগিয়ে আসতে আমি দেখি নাই।
জাতির পিতা ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই দুর্যোগ ঝুঁঁকিহ্রাসে ‘ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি)’ গ্রহণ করেন, যা আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু ঘূর্ণিঝড় থেকে জনগণের জানমাল রক্ষায় সেই সময় ১৭২টি উঁচু মাটির কিল্লা তৈরি করেন যা পরবর্তীকালে জনগণ ‘মুজিব কিল্লা’ নামকরণ করেন।
তিনি বলেন, আমরা পূর্বের মুজিব কিল্লাসমূহ সংস্কারসহ নতুন করে আরও ৩৭৮টি মুজিব কিল্লা নির্মাণ করছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল গঠন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন করেছে এবং এই আইনের আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর গঠন করেছে যা দুর্যোগ মোকাবিলা, ঝুঁকি হ্রাসকরণ ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পাশাপাশি, সরকার ২০২১-২০২৫ সাল মেয়াদের জন্য জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে।
তিনি বলেন, আমরা ২০২২ সালের মধ্যে ৫১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা নিয়েছি এবং গ্রীষ্মকালে সেচের পানি সংরক্ষণের জন্য জলাধার নির্মাণ, ৪ হাজার ৮৮৩ কিলোমিটার খাল খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, সংস্কারসহ নানাবিধ প্রকল্প গ্রহণ করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগ ঝুঁঁকিহ্রাসে আমাদের সময়ে সারাদেশে ২৩০টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র ও ৩২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ২২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ও ৪২৩টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। ৬৪ জেলায় ৬৬টি জেলা ত্রাণ গুদাম কাম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তথ্য কেন্দ্র স্থাপন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় গ্লোবাল এডাপটেশন সেন্টারের কার্যালয় স্থাপন করেছি। এবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা-দশক ২০৩০’ এর কার্যক্রম সম্পর্কে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে অবহিত করেছি এবং এটা প্রত্যেকর কাছে খুব সমাদৃত হয়েছে। পাশাপাশি, আমি বিভিন্ন ফোরামে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্বাসনের বিষয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো যেন সহায়তা পায় তা জোড়ালো ভাবে তুলে ধরেছি।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের দুর্যোগ প্রশমন কার্যালয় (ইউএনডিআরআর) এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্বাচন করেছে- ‘দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে, কাজ করি একসাথে’। আর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসে এ বছর জাতীয়ভাবে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘মুজিববর্ষের প্রতিশ্রুতি, জোরদার করি দুর্যোগ প্রস্তুতি।’