‘জয় বাংলা’ হোক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতিসূচক প্রত্যুত্তর

183

গত ১ জানুয়ারী ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায় নির্বাচনোত্তর উপসম্পাদকীয় পাতার এক লেখায় বলেছিলাম, “জয় বাংলা হচ্ছে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর শ্লোগান। এই রাজনৈতিক গোষ্ঠী হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। যাদের নেতৃত্বে পাকিস্থানের বিরুদ্ধে ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৭০ এর নির্বাচন পর্যন্ত অনেক সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছিল। যার পরিণতিতে এই দলের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম বিশ্ব মানচিত্রে অংকিত হয়। এই প্রসঙ্গে আজকের এই লেখার মাধ্যমে আমার একটা অভিমত, পরামর্শ বা দাবী থাকবে। স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রতিক্ষেত্রে ‘জয় বাংলা’ ছিল সকলের শ্লোগান। এই শ্লোগানে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সকল মানুষ সকল বিষয়ে উদ্বুদ্ধ হত। তাই এই শ্লোগানকে একটি গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের ‘জাতীয় শ্লোগান’ হিসাবে স্বীকৃতি বা ঘোষণার দেয়া হোক।”
সেই দিনের লেখার সূত্র ধরে, এই প্রসঙ্গে আজ বলতে চাই, জয় বাংলা জাতীয় শ্লোগান হিসাবে স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পযর্ন্ত সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি সূচক ইয়েস স্যার, প্রেজেন্ট ম্যাডাম, উপস্থিত মহাশয় ইত্যাদি রকমের প্রত্যুত্তরের পরিবর্তে ‘জয় বাংলা’ বলার রেওয়াজ শুরু করা হোক। যা সরকারি অফিস আদেশ জারীর মাধ্যমে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিশ্চিত করা না গেলে, প্রয়োজনে আইন প্রনয়ণ করে হলেও বাধ্য করা হোক। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশাত্ববোধ জাগ্রত হবার পাশাপাশি ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শিত হবে। একই সাথে শৈশব থেকে শিক্ষার্থীরা জয় বাংলার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারবে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের গুজরাটসহ বিভিন্ন প্রদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বিষয়ে ‘জয়হিন্দ’ বা ‘জয় ভারত’ বলার প্রচলন রয়েছে।
আমরাও এক কালে অবিভক্ত ভারতের অংশ ছিলাম, জাতীয়তায় ভারতীয় ছিলাম। তাই তারা পারলে আমরা কেন পারবো না। শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃত প্রগতি প্রতিক্ষেত্রে আমরা বর্তমানে ভারতের সমপর্যায়ে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রপর্যায়ে আছি। তাই তারা পারলে আমাদেরও পারার কথা, এবং পারতেই হবে। কারন আমরা জেনেছি, ‘জয় বাংলা’র জয়ধ্বনি মুক্তিযুদ্ধে প্রবলভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ কালীন সফল অপারেশনের পর অবধারিতভাবে মুক্তিযোদ্ধারা উচ্চস্বরে চিৎকার করে ‘জয় বাংলা’ বলে শ্লোগান দিয়ে জয় উদযাপন করেছিল।
এছাড়া ‘জয় বাংলা’ শব্দটি খাঁটি বাংলা শব্দ। আর বিশ্বের একমাত্র স্বাধীন সার্বভৌম ‘বাঙ্গালী স্থান’ হচ্ছে বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশে জয় বাংলা শব্দ ব্যবহার করে বিতর্কিত হবার কথা নয়। এখানে এবিষয়ে সাধারণ দৃষ্টিতে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রাজনৈতিক মনে হলেও বাস্তবে কিন্তু তা নয়।
‘জয় বাংলা’ শ্লোগান উদ্ভব সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মধুর ক্যান্টিনে, যৌথভাবে শিক্ষা দিবস পালন উপলক্ষে, ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ কর্তৃক এই শ্লোগান উচ্চারণ করা হয়েছিল। ১৯৭০ সালে ঢাকায় এক জনসভার মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান প্রথম এই শ্লোগান উচ্চারণ করেন। ’৭১সালের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণে উচ্চারণের মাধ্যমে যার পরিপূর্ণতা পায়।
মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা পত্র পাঠ শেষে, ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করে শেষ করেন। এছাড়া স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, জাতির উদ্দেশ্যে তাঁর প্রথম বেতার ভাষণেও জয় বাংলা শ্লোগানের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাই সার্বিক বিচারে জাতি ধর্ম বর্ণ দল মত নির্বিশেষে সর্বদলীয় বা সার্বজনীন শ্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’।
আমাদের দেশে জাতীয় ফল, জাতীয় পাখি, জাতীয় ফুল কিংবা জাতীয় সঙ্গীত এমনকি জাতীয় মসজিদ, জাতীয় মন্দির ইত্যাদি জাতীয় বিষয়বস্তু সমৃদ্ধ অনেক কিছু রয়েছে। সেই হিসাবে জাতীয় শ্লোগান কোথায়? আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা, রক্ত দিয়ে অর্জিত শ্লোগান হচ্ছে জয় বাংলা, যার ঝাঁঝালো সুরে এখনো দেহে কাঁপন ধরে, আন্দোলিত হয় হৃদয়ে, শিহরণ জাগে মনে। এখনো জয় বাংলা ধ্বনিতে বীর বাঙ্গালী রক্ত টগবগে প্রবাহিত হয়। এখনো জয় বাংলার ঝংকার শব্দে, বাঙ্গালীর শিরা উপশিরায় অলৌকিক শক্তি সঞ্চিত হয়, সঞ্চালিত হয়। এ শ্লোগান অদম্য শক্তির প্রতীক, গভীর দেশ প্রেমের প্রতীক, সুদীপ্ত সাহসের সুমধুর ধ্বনি। যে শ্লোগান ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধার ছিল প্রাণের প্রনোদনা। যার সুর ধ্বনি আকাশে বাতাসে মুখরিত হত, প্রকম্পিত হত ভূমি। পক্ষান্তরে যুদ্ধের সময় হানাদার বর্বর নরপিশাচ পাকিস্তানীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল এই শ্লোগান। আজ বাংলার শ্যামল মাঠ-ঘাট বনবনানী থেকে শুরু করে, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আপামর জনগণের দিগন্ত বিস্তৃত হৃদয় কাঁপানো অগ্নিঝরা আর শাণিত মুখরিত মুখের অ¯্র ‘জয় বাংলা’র ধ্বনি, যা সর্বসাধারণে চিন্তা চেতনায় রণক্ষেত্রের মত উঠে রণি। তাই এই শ্লোগানকে জাতীয় শ্লোগান ঘোষণার জন্যে নীতি নির্ধারণীমহল তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভিমুখে আমার একান্ত প্রার্থনার মাধ্যমে আবেদন জানাচ্ছি। কেবল আবেদন নয়, উপস্থিতি বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্যে, সর্বসাধারণের পক্ষে দাবী জানিয়ে সেই শ্লোগান দিয়ে আজকের এই লেখা শেষ করছি, ‘জয় বাংলা’।