জয় বাংলা বাংলার জয়

12

জামাল উদ্দিন

আজ ১ ডিসেম্বর। শুরু হলো বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালের এই মাসে ত্রিশ লাখ শহীদ আর দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত হয় মহান স্বাধীনতা। বিশ্বের মানচিত্রে সার্বভৌম-স্বাধীন দেশ হিসেবে স্থান করে নেয় বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে পর্যুদস্ত করে অর্জিত এ বিজয় ছিল আনন্দ, উল্লাস ও গৌরবের সাথে ছিল স্বজন হারানোর বেদনাও।
বাংলাদেশের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম ঘটনা হলো ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির কয়েক হাজার বছরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বপ্ন-সাধ পূরণ হয় এ মাসে।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ আর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর জল, স্থল আর আকাশপথে সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয়ের খবর চারদিক থেকে ভেসে আসতে থাকে। এ মাসেই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদর আল শামসদের সহযোগিতায় দেশের মেধা, শ্রেষ্ঠ সন্তান-বুদ্ধিজীবী হত্যার নৃশংস হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। সমগ্র জাতিকে মেধাহীন করে দেয়ার এধরনের ঘৃণ্য হত্যাযজ্ঞের দ্বিতীয় কোনো নজীর বিশ্বে নেই।
আক্রমণ
এদিন বাংলাদেশকে শত্রæমুক্ত করার পদক্ষেপ হিসেবে চট্টগ্রামকে মুক্ত করার জন্য গঠিত হয় ‘কিলো ফোর্স’। এ ফের্সের অন্তর্ভুক্ত হয় এক ব্রিগেড সেক্টরট্রুপস, বেঙ্গল রেজিমেন্টর ২টি ব্যাটালিয়ান, ভারতীয় বাহিনীর ২টি ব্যাটেলিয়ান। যৌথ কমান্ডের অধিনায়ক হন ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার আনন্দ স্বরুপ ও ১নং সেক্টও কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম। মিত্রবাহিনীর ভারতীয় ব্রিগেড কমান্ডার আনন্দ স্বরুপ তার ৮৩ তম মাউন্টেন ব্রিগেড সহকারে নোয়াখালীর চাঁদগাজী এলাকায় মেজর রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগ দেন। অপরদিকে ‘অপারেশন ঈগল’ নামেয় বিশাল একদল মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল ওভান- ও বিএলএফ পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার শেখ ফজলুল হক মণি’র নেতৃত্বে ভারতের দেমাগ্রী থেকে বিশাল এক যৌথবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিমুখে অভিযান শুরু করেন। এই যুদ্ধে অন্যান্য কমান্ডারের মধ্যে ছিলেন চট্টগ্রামের এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, নুরুন্নবী চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন হারুন। ঢাকার হাশিম উদ্দিন পাহাড়ি, কুমিল্লার খুরশিদ আলম পাখি, মনিরুল হক চৌধুরী। তাঁদের নেতৃত্বে কয়েক হাজার বিএলএফ-যোদ্ধা ডিসেম্বরের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করলেন। শুরু হয় চট্টগ্রাম দখলের প্রক্রিয়া।
এদিকে ১ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গণে পাকসেনারা পদে পদে মার খেতে শুরু করে। সিলেটের কানাইঘাটে লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর হাতে ৩০ জন পাকসেনা ও রাজাকার নিহত হয়। জুড়ি, বড়লেখা এলাকা থেকে পাকবাহিনী কামান সরিয়ে ফেলে। আর মুক্তিবাহিনীর হাতে পাকসেনারা বিপুল ক্ষতির শিকার হয়ে কুলাউড়া থেকে পালিয়ে যায়।
এদিন মুক্তিবাহিনী কুষ্টিয়ার দর্শনা ও সিলেটের শমসের নগর আক্রমণ করে। কুষ্টিয়ার কাছে মুন্সীগঞ্জ ও আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনের মধ্যে মুক্তিসেনারা মাইন বিস্ফোরণের মাধ্যমে পাক সৈন্যবাহী ট্রেন বিধ্বস্ত করে। এতে বহু পাকসেনা হতাহত হয়। সিলেটের ছাতক শহরে মুক্তিবাহিনী ও পাকসেনাদের মধ্যে প্রচÐ যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে ৬৫ জন রাজাকার নিহত হয়। আর মুক্তিযোদ্ধারা সুনামগঞ্জ মৌলভীবাজার মুক্ত করে সামনে এগিয়ে যায়। কুমিল্লার কসবা রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর হাতে ৬০ জনের বেশি পাকসেনা নিহত হয়।
সিলেটের শমসের নগর ও কুষ্টিয়ার দর্শনা দখল লড়াইয়ের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে। এদিন রাতে কর্নেল শফিউল্লাহ, ২য় বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার মেজর মঈন, ১১ বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার মেজর নাসিমের নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী ও বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেরানী, সিঙ্গারাইল গৈরালসানী, রাজাপুর ও আজমপুর এলাকা শত্রæমুক্ত করে। যুদ্ধে মুজিব বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন খাঁ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) শহীদ হন। আর ২৩ জন পাকসেনা নিহত হয়।
সাতক্ষীরা মহকুমার কালিগঞ্জ পাকবাহিনী মুক্ত হওয়ায় বিপ্লবী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান, ফণি ভ‚ষণ মজুমদার, তোফায়েল আহমেদ এম এন এ, অর্থসচিব এ জামান, আইজি এম এ খালেক কালিগঞ্জে বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
এদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী পশ্চিম ফ্রন্টে আক্রমণাত্মক ও পূর্ব ফ্রন্টে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে বাংলাদেশকে হানাদার বাহিনী মুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী রাজ্য সভায় বক্তৃতাকালে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্য অপসারণের নির্দেশ দেয়ার জন্য পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহŸান জানান। অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, রাজশাহী ও যশোর জেলার ৬২টি থানা এবং নোয়াখালী জেলার সব চর এলাকায় বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
লেখক : মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, সাংবাদিক ও প্রকাশক।