জয়নালের মুক্তিযুদ্ধ

22

ফাউজুল কবির

দুপুরের খাঁখাঁ রোদ চীর্ণ করে ভেসে আসে এক অস্থির চীৎকার
কোথায় কোথায় তুমি স্বরচিত চিত্রার্পিত প্রিয় বাংলাদেশ—-
আয়নাটা ভেঙ্গে গেছে আকাশের গায়ে ছেঁড়াজামা মেঘের অসুখ
কথারা ঝরেছে ধুলিতে মাটিতে -দেখা দাও দেখা বাংলাদেশ
জয়নালের কণ্ঠ ছিঁড়ে রক্ত আসে জাগে না উত্তর -স্বদেশের মুখ:

জয়নাল ! লোকেরা তাকে ডাকে বহু নামে বহু রঙে ভেংচি কাটে
জয়নাল ওসব থোড়াই কেয়ার করে
হো- হো করে হেসে ওঠে মাতালের ঘোরে দারুণ শোরগোল তোলে
উত্তর দক্ষিণ পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্ত কাঁপিয়ে অদৃশ্যের চোখের ইঙ্গিতে
বলে ওঠে -ভাইসব সাবধান – অ্যামবুশ! অ্যামবুশ করো – মিশে যাও
গাছের পাতায় ফড়িঙের প্রাণে প্রাণ
হাতিয়ার রেডি – প্রতিটি বুলেট তোমার জীবন অথবা মৃত্যুর বাণী
ওই যে পাঞ্জাবি ওই যে বালুচ পাঠান মাকরানি রাজাকার আলবদরÑ

ফায়ার ফায়ার ফায়ার ফায়ার
পেছনে তাকালে মৃত্যু সামনে বীরের বিজয় —বলো মুখে জয় বাংলা
বলো বাঙালি মরে না – -মৃত্যুহীন বাংলাদেশ- বলো অশেষ অশেষ
ফায়ার ফায়ার
মৃত্যু নাও মৃত্যু – হাতের মুঠোয় জীবনেরে বাঁধো বিশ্বাসের রক্তপতাকায়
ফায়ার ফায়ার- নির্ভুল টার্গেটে – টগবগে রক্তের বিনিময়ে নাও মুক্তিসত্য
ফায়ার ফায়ার
এস এল আর – এস এম জি – থ্রি নট থ্রি
ভয়াল সন্ত্রাসী ক্ষীপ্রতায় – থার্টিসিক্স হ্যান্ডগ্রেনেড
ফায়ার ফায়ার ফায়ার ফায়ার :

জয়নাল একাই লড়ে একাই সে বীর – বীরোত্তম
রাস্তায় ছেলেরা প্রবীণ নবীন মানুষ-জনতা হি-হি করে হাসে : আর বলে
সাবাশ জয়নাল ! সাবাশ জয়নাল ! ফায়ার ফায়ার খুনরাঙ্গা Ñবুলেটফায়ার
অবিরাম চলতে থাকে জয়নালের শত্রুহননের অগ্নির সংগীত
বিস্ফোরণ বুকে বিষ্ফোরণ ঘাসে বিষ্ফোরণ লালে লাল হৃদয়ের শুভ্র মাঠে
বিষ্ফোরণ বোধে স্নায়ু প্রতিরোধে
আকাক্সক্ষার ফুলে রক্তজবাচোখে রঙ্গনেপলাশে
আকাশে হাওয়ায় জলে ও ডাঙ্গায়
রক্তকণিকায় মেঘেরমুক্তিতে ফায়ার ফায়ার-
অকস্মাৎ ঘুম থেকে জেগে ওঠা সৈনিক যেমন টের পায় বারুদের ঘ্রাণ
নিস্তব্ধ হাওয়ার অর্থ বুঝে যায়
গেরিলার স্বপ্ন ও দুর্দান্ত সাহসেরা জয়নালের প্রাণে জাগে সাহসে বাস্তবে
জাগে কল্পনারা বীর মুক্তিযোদ্ধা – মুক্তিযুদ্ধ মানে শুদ্ধতম প্রাণের কবিতা :

স্মৃতি তার জেগে ওঠে জয়নালের মগ্নস্মৃতি উৎস উত্তরাধিকার পুর্বপুরুষের
তারপর- আবার মরে যায় – পুনর্বার জেগে ওঠে – পুনর্বার মৃত হয়ে যায় ।

বিস্মরণ রোগ নয়- স্মরণের, মূর্ত জীবনের – চিরন্তন শত্রু
স্মৃতিও কি ঘাতক নয় ? সতত সুখের ? করে না কাতর দিগন্ত নিষ্ফলা ?
জয়নালের অপরাধ আর কিছু নয় – সে নিত্য স্মৃতি ও স্মরণেরে খোঁজে
ঝাঁকি জাল ঠেলে ঠেলে মাছ ধরে নির্মম হত্যার যুদ্ধ ও মৃত্যুর স্মৃতিমাখা:
জয়নালের অপরাধ আর কিছু নয়
তার পিতা-পিতামহ ছিলো স্নায়ুরোগাক্রান্ত
তিনপুরুষ শুধু দুচোখে দেখেছে স্বপ্ন
রূপালি হাওয়ার দেশ গুলঞ্চচাঁপার রূপ
সোনালি ধানের শস্যলীনা সুর সুন্দরস্বদেশ মায়াবিপাখার
এবং রূপকথা চন্দ্রকল্পনার শরতে-শিশিরেমাখা ছায়াচ্ছবি Ñসোনার বাংলা :
জয়নাল এখনো যুদ্ধ করে প্রতিদিন প্রতিটি মহুর্ত
একাত্তুরের ফেনি নদীর চর থেকে বুকে বেঁধে তুলে আনে অরুন্তুদ ইতিহাস
শুভপুর ব্রিজে ধুমঘাট ব্রিজে হায়েনার গুলি করা
হাতবাঁধা কোমরে দড়িবাঁধা মানুষের লাশ
এখনো তার নাকে দুঃসহ গন্ধ লাগে চোখে ভাসে গলিতপাথর জলেরক্রন্দন
গন্ধ জাগে – জাগে বীভৎস অন্ধের কালো বারুদের পচিত শবের
আর প্রাণে জাগে প্রফুল্ল-রক্তের গেরিলা-কমরেড
বন্ধু ও স্বজন সামনে হানাদার- ফায়ার ফায়ার-ফায়ার ফায়ার মুক্তিরফায়ার Ñ

জয়নালের বুকে ক্রন্দনের চোখ নেই । আছে বিস্ময় ও মোমের বেদনা
স্মৃতি ও বিশ্বাস মন্দ্রিত সংগ্রামে স্বপ্ন আর মাতৃভুমি প্রেমে
রক্ত মৃত্যু লাশে যখন মেলে না দিবসরাত্রির প্রগাঢ় আততি
যুদ্ধ ও দেশের আশাবরী ছবি
সব প্রীতি উবে যায় – দেশপ্রেম অদ্ভুতঅসার ফাঁকা মনে হয়
নিজেকেই মনে হয় যোদ্ধা নয় গেরিলাও নয়- একান্ত মীরজাফর :

কারো কারো কাছে জয়নাল গভীর এক ধাঁধা আজ – ধূসর মাতাল
অথচ নিস্তব্ধ অথচ চঞ্চল সব সত্য জানে
একাত্তুরে অগ্নিমন্ত্রেসিদ্ধ সময়ের দিবসরজনী
জানে ইছাখালী তেমুহানি
আবুরহাট ওসমানপুর
মাদবারহাট সাহেবদিনগর
জয়নগর আজমপুর
ঝুলনপোল দুর্গাপুর তেতৈয়া জোরারগঞ্জ মাস্তানগড় বাংলাবাজার
মুরাদপুর শশিমুহুরীর হাট চৈতন্যবাজার দারোগারহাট তালবাড়িয়া
এবং নিশ্চিত একটি নদী -জোয়ার ভাটার -নাম তার ফেনি নদী:

স্বপ্ন আর কষ্ট বেদনার লোনা অশ্রু চৈতন্যের বিষ্ফোরণ মিথ্যা হয়ে গেলে
বোন আর ভাই মায়ের কপাল ভেঙে টুকরো টুকরো হলে
মৃত্তিকারা যদি খাঁখাঁ করে ওঠে শরীরে ও মনে -প্রত্যহ সুনামি ঘটে
জীবনের ঘাটে ঘাটে মস্তিষ্কের কোষে কোষে স্বপ্নাতুর বোধে -নিউরনে
তখন একজনÑ বীরমুক্তিযোদ্ধা Ñযেমন জয়নাল
বিশ্বসের ভিত স্বপ্নমঙ্গলের সমস্ত আকাশ ঘরদোর খেয়াঘাট ভেঙ্গেভেঙ্গে
একা একা কবি হয় উন্মাতাল – খোঁজে সন্ন্যাসী পাতাল
কোমরে ঝুলানো ক্ষুধার্ত গ্রেনেড কাঁধের স্টেনগান সকলেই বলে ওঠে ::
জয়নাল হয়েছে পাগল- এখনো জয়ধ্বনি দেয় – মুজিবের নামে স্বপ্ন দেখে
পথের বৃক্ষরা নীরবে ক্রন্দন করে ঝরাপাতা বলে – জয়নাল অসুস্থ এখনÑ

কে আছে এমন বন্ধু জয়নালকে ফিরিয়ে দেবে সুস্থতার বাঁশি
একাত্তুরের একটি অদ্ভুতসুন্দর হৃদয়ের পাখি নীলিমার চশমা !

[জয়নাল কি বেঁচে আছে? হয়তো বা আছে। হয়তোবা নেই। হয়তোবা এনামে কেউ ছিলোই না। এখানে বীর মুক্তিযোদ্ধা জয়নাল একটি প্রতীক নাম। কোনো ব্যক্তিবিশেষের সাথে এর সম্পর্ক নেই। মুক্তিযোদ্ধা জয়নালের স্মৃতিতে এবং শ্রদ্ধায় এ লেখা একটি শ্রদ্ধার্ঘ্য। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতীকী নামে এবং আরও অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা]