জ্যোতির্ময়ী জগৎমাতার আগমন বার্তা

17

 

ঋতুচক্রে বৈচিত্র্য ও পূর্ণতার ছন্দময় শরৎ। নদীকূলে বা খাল-বিলের ধারে কাশবনে শুভ্রতার তরঙ্গায়িত নাচন। শিশিরকণার সাথে কমলা বৃন্তের শ্বেত শিউলি আর তুলতুলে সবুজ ঘাসের ঘনিষ্ট মিতালি। আকাশের নীলিমায় আদুরে নরম তুলোর পেঁজার মতো শুভ্র মেঘদলের উচ্ছ্বল ছুটোছুটি। কৃষাণ-কৃষাণীর সস্নেহ পরিচর্যায় দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ কচি ধানগাছের ক্ষেতে ফলন সম্ভাবনার হাতছানিতে কৃষকপল্লীতে আশা জাগানিয়া আনন্দ-গুঞ্জরণ। রঙ-বেরঙের পুষ্পরাজি যেমন মাধবী, মল্লিকা, কামিনী, বকুল, শাপলা, গোলাপ, পদ্ম প্রভৃতির প্রাচুর্যতা আর গাছ-গাছালির পত্রপল্লবে সবুজের সমারোহ। দোয়েল-শ্যামা-পাপিয়ার কলকাকলি ও রৌদ্র আর মেঘপুঞ্জের অনিন্দ্য-সুন্দর লুকোচুরিতে আলো-ছায়ার মতো মনমাতানো দৃশ্যপট। যখন শরৎ প্রকৃতি এমন মনোহারী বেশে সজ্জিত হয়ে রূপের অপরূপতায় রূপবতী ঠিক তখনই সূচনা হয় ‘মহালয়া তিথির। ‘মহালয়া’ মানে পিতৃপক্ষের শেষ দিন ও দেবীপক্ষের শুভারম্ভ।
প্রায় ৯০ বছর ধরে মহালয়ার ভোর শুরু হয় কিংবদন্তিতুল্য বা প্রবাদপ্রতিম পুরুষ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের (১৯০৫-১৯৯১) মন মোহিত করা মায়াবী কণ্ঠের প্রাণ জাগানিয়া উচ্চারণ দিয়ে।-‘আশ্বিনের শারদ প্রাতে/বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর/ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা/প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত/ জ্যোতির্ময়ী জগৎমাতার আগমন বার্তা…..।; এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে আসলেও তাঁর স্থলাভিষিক্ত আজো কেউ হতে পারে নি। বলছি আকাশবাণী কোলকাতা বেতারের সংগীতালেখ্য থমহিষাসুরমর্দিনী’র কথা। প্রতি বছর মহালয়া’র দিন ভোরে এ আলেখ্যানুষ্ঠান না শুনলে যেনো এক অপূর্ণতা গ্রাস করে আমাদের। বিশেষ করে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মোহনীয় কণ্ঠ। ‘মহিষাসুরমর্দিনীথ আলেখ্যানুষ্ঠানের রচয়িতা ছিলেন বাণীকুমার (বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য), সুরকার ছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক ও চন্ডীপাঠ করেছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। অবশ্য ১৯৭৬ সালে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রকে বাদ দিয়ে মহানায়ক উত্তমকুমারকে দিয়ে নতুন অনুষ্ঠান ‘দেবীং দুর্গতিহারিণী করানো হয়েছিল কিন্তু তা মানুষের হৃদয়ে আসন লাভে ব্যর্থ হলো। সমালোচনার ঝড় উঠেছিল তুঙ্গে। এমনকি জনতা বেতার অফিসেও বিক্ষোভ করেছিল। বিক্ষুদ্ধ মানুষকে সন্তুষ্ট করতে সেবছরই ষষ্ঠীপুজার দিন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহিষাসুরমর্দিনীথ আবার সম্প্রচার করতে হয়েছিল। উল্লেখ্য, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ১৯৮০ সালে মহানায়ক উত্তমকুমারের অন্তিমযাত্রার ধারা বিবরণী পাঠ করে শ্রোতাদের অঝোরে কাঁদিয়েছিলেন। আজ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র সশরীরে এ পৃথিবীতে না থাকলেও তাঁর কীর্তি তাঁকে অমর করে রেখেছে। তাঁর ‘মহিষাসুরমর্দিনীথ এক ঐতিহাসিক অলংকার হয়ে আছে মহালয়া তিথির ধর্মীয় ও সামাজিক তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শাস্ত্রমতে, মহালয়ার দুটো দিক। প্রথম দিক হচ্ছে মহালয়ার দিন দেবী দুর্গা মায়ের মর্ত্যলোকে আবাহন। এ দিন মঙ্গল প্রদীপ প্রজ¦লন করে পবিত্র চÐীপাঠ, মহালয়ার ঘট স্থাপন ও বিশেষ পূজার মধ্য দিয়ে ঢাক-শাঁখ-কাঁসা-উলুধ্বনিতে মর্ত্যলোকে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে আহ্বান করে শারদীয়া পুজোৎসবের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। শারদীয় দুর্গোৎসব বাঙালির কাছে আবহমানকাল থেকে আনন্দবীণায় ঝংকৃত প্রাণের উৎসব। এই উৎসবের সাথে মিশে আছে বাঙালির অনুরাগ ও আবেগ। ধর্মীয় আবহের বাইরেও ঐতিহ্য, সামাজিক ঐক্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা আর সর্বজনীনতার ছকে শারদীয় দুর্গোৎসব গুরুত্ব বহন করে। এ উৎসব উদ্যাপনের সাথে সংগীত-নৃত্য-চিত্র-শিল্পকলারও যোগসূত্র আছে। এরই সাথে আছে পেশাজীবীদের নানান অর্থনৈতিক দিক। গত বছর বিশ্ব সংস্কৃতি বিভাগের সেরা উৎসবের তালিকায় অন্তর্ভূক্তির মধ্য দিয়ে বাঙালির শারদোৎসব ইউনেষ্কো কর্তৃকও স্বীকৃত হয়েছে। আর মহালয়া থেকেই শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনের আনন্দ ধ্বনি প্রকট হয়। তাই শারদীয় দুর্গাপূজার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ ‘মহালয়া’। এ দিন আদিশক্তির আহ্বানের দিন। দেবী দুর্গাই আদ্যাশক্তি মহামায়া।
দেবী দুর্গা বিভিন্ন দেবগণের অপরিমেয় তেজরশ্মি ও নানাবিধ অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অপরাজেয় শক্তি। এখানে দেবগণ পুরুষশক্তি আর দেবী দুর্গা নারীশক্তি। পুরুষশক্তি ও নারীশক্তির সম্মিলিত প্রয়াসেই অসুর বধ সম্ভব হয়েছিল। তারপর দেবতারাও ফিরে পেয়েছিলেন তাঁদের হৃত স্বর্গরাজ্য। এ পৃথিবীও বর্তমানে মানুষ নামধারী বহুরূপী অসুরদের উৎপাতে অতিষ্ট। জগৎ সংসারের আসুরিক ও পাশবিক কর্মের হোতা মানুষরূপী অসুরদের ধ্বংস করার জন্য জগতের সকল নারী ও পুরুষকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। তবেই এ জগৎ থেকে অসুররা সমূলে উৎপাটিত হবে। নচেৎ অসুরদের উৎপাতে অশান্তির অনলে আমাদের অনবরত জ্বলতে হবে। মহালয়াতে দেবী দুর্গার আবাহনের দিনে মহালয়া উদযাপনের সাথে সাথে দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধ কাহিনী থেকে আমাদেরকে নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবেই সকল ভালো কাজ করার শিক্ষাও গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি.।
মহালয়ার দ্বিতীয় দিক হচ্ছে, তর্পণের মাধ্যমে বিদেহী পূর্ব পুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। এ দিন জলাশয়ে কোমর সমান জলে দাঁড়িয়ে তিল ও জল দিয়ে তর্পণ বা পার্বণ শ্রাদ্ধ করে পূর্ব পুরুষদের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শাস্ত্রীয়বিধি ও মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক প্রথমে বিদেহী পূর্বপুরুষ তথা পিতৃ-মাতৃকুল ও পরবর্তীতে বিদেহী শ্বশুরকুল, গুরু, বন্ধু-বান্ধব, পুত্রক-অপুত্রক, পরিচিত- অপরিচিত সকলের উদ্দেশ্যে তর্পণ বা পার্বন শ্রাদ্ধ করেই তাঁদের আত্মার তৃপ্তি সাধন করা। আবার অন্যদিকে পূর্বপুরুষের আত্মাও তর্পণের মাধ্যমে সন্তুষ্টি লাভ করে তাঁদের উত্তরপুরুষদের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য আশির্বাদ করেন। ‘আব্রহ্মস্তম্ব পর্যন্তং জগৎ তৃপ্যতুথ (সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা থেকে তৃণরাজি- এ জগতের সকলেই তৃপ্ত হও।)- এই মন্ত্র সকল তর্পণকারীকে উচ্চারণ করতে হয়। হিন্দুশাস্ত্রে তর্পণ মন্ত্রের একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, আপন-পরসহ সমগ্র ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে সাম্যবাদী ভাব নিয়ে বিশ্বজনীনতার দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশনা বিদ্যমান।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে পাই, পূর্বপুরুষের প্রতি উত্তরপুরুষের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের এক অনন্য প্রক্রিয়া এই মহালয়ার ‘তর্পণ’। তাছাড়া মহালয়ার এ তর্পণের মাধ্যমে উত্তরপুরুষ তার শেকড়ের সন্ধানে গিয়ে পূর্বপুরুষের সাথে আমৃত্যু যোগসূত্র স্থাপনেরও একটি সূত্র খুঁজে পায়।
‘কৃতজ্ঞতা মহৎ গুণে মানুষ চেনা যাবে/ অকৃতজ্ঞ বন্ধু হলে দুঃখই শুধু পাবে।- ছন্দোবদ্ধ পংক্তিদ্বয় আজকের বাস্তবতা। বর্তমানে পরিবার, সমাজ থেকে শুরু করে সবখানেই স্বার্থপর অকৃতজ্ঞ মানুষের বিচরণ, ফলে পারস্পরিক আন্তরিকতা কমে আসছে, নিকটজনদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রের উপকারী মানুষগুলো কষ্ট পেয়ে চুপসে যাচ্ছে, অশান্তি ও বিবাদসহ নানামুখী সমস্যার ক্ষেত্র রচিত হচ্ছে, যা আমাদের জন্য মোটেও সুখকর নয়। মহালয়ার ‘তর্পণ’ বিষয়টি থেকেও ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশের শিক্ষা নেওয়া যায়।
এই মুহূর্তে মর্ত্যকুলের বিশ্বমানব কতিপয় অসুরসম মানুষের কাছে সাধারণ মানুষ জিম্মি হচ্ছে প্রতিদিন। মানুষ নামধারী অসুর কর্তৃক নারী ও পুরুষ নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন, চিরচেনা ও নিত্যনতুন বৈষম্যের যাঁতাকলে নিষ্পেষণ, বৃদ্ধ মাতা-পিতার প্রতি অবজ্ঞা ও তাঁদের বৃদ্ধাশ্রমে প্রেরণ, খুন, সন্ত্রাস, প্রতারণা, ভেজালের কালো উৎসব, মুনাফালোভীদের অপতৎপরতা, উঁচু থেকে নিচুস্তরে দূর্নীতির করাল গ্রাস, ঘুষখোরদের আস্ফালন, ধর্ম ব্যবসায়ীদের অমানবিক উৎপাত, চরিত্রহীনদের ব্যভিচার, লুটেরাদের অনৈতিক প্রভাব, সবলের নির্যাতনে দুর্বলের আর্ত-চিৎকার, মাদকের ভয়াল থাবা ইত্যাদি অগণন সমস্যা ও দুর্গতির অতল গহ্বরে সাধারণ মানুষকে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। দুষ্টের দমন, সামগ্রিক দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তি লাভ ও কল্যাণময় জীবন পেতে মহালয়ার এ পুণ্যলগ্নে আদ্যাশক্তি মহামায়া দেবী দুর্গার করুণা প্রার্থনা করছি।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক