জ্বালানি তেল খালাসে আধুনিক যুগে বাংলাদেশ

26

হারুনর রশিদ, মহেশখালী

বিদেশ থেকে আমদানি করা পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল খালাস এবং পরিবহনে আধুনিক প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করছে যাচ্ছে দেশ। মহেশখালীতে গভীর সমুদ্রে উন্নত দেশগুলোর মতো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে ইন্সটলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্প। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশে ১ লাখ টন ধারণক্ষমতার তেলবাহী জাহাজ গভীর সমুদ্রে খালাসে সময় লাগবে ২-৩ দিন। যা আগে খালাসে সময় লাগত ১২ দিন। কমবে তেল চুরি ও সিস্টেম লস। বছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সাশ্রয় হবে অন্তত ৮০০ কোটি টাকা প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে জি-টু-জি ভিত্তিতে এই এসপিএম প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) পক্ষে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড এটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের ইপিসি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লি. এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জার্মানির আইএলএফ কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ারস। চায়না এক্সিম ব্যাংক প্রকল্পে বৈদেশিক সহায়তা দিচ্ছে।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, ইতোমধ্যে প্রকল্পটির কাজ ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২২ সালের আগস্টে গভীর সমুদ্রে জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল খালাসে এসপিএম প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হবে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে গভীর সমুদ্রে বড় জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল খালাসে লাইটার জাহাজের প্রয়োজন হবে না।
বিপিসি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং কর্ণফুলী নদীর চ্যানেলের নাব্যতা কম হওয়ায় তেলবাহী বড় জাহাজগুলোর সরাসরি জেটিতে এসে তেল খালাস করা সম্ভব হয় না। এসব জাহাজ গভীর সমুদ্রে নোঙর করে ছোট লাইটারেজের মাধ্যমে তেল খালাস করে। এতে এক লাখ টন ধারণক্ষমতার তেলবাহী জাহাজ খালাসে সময় লাগে ১০ থেকে ১২ দিন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসপিএম প্রকল্পটি মহেশখালী দ্বীপের পশ্চিম পাশে সাগরে স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে জাহাজ থেকে তেল সরাসরি পাম্প করা হবে, যা এসপিএম হয়ে অফশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে মাতারবাড়ীর যেখানে ল্যান্ড টার্মিনাল শেষ হয়েছে সেখানে পৌঁছাবে। পরে সেখান থেকে অনশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালী এলাকায় নির্মিতব্য স্টোরেজ ট্যাংকে জমা হবে।
এসপিএম থেকে ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের দুটি পৃথক পাইপলাইনের মাধ্যমে ক্রুড অয়েল ও ডিজেল আনলোড করা হবে। ট্যাংক থেকে পাম্পিংয়ের মাধ্যমে তেল প্রথমে অনশোর ও পরে অফশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের গহিরা ল্যান্ড টার্মিনালের শেষ পর্যন্ত আসবে। সেখান থেকে পুনরায় অনশোর পাইপলাইনের মাধ্যমে কর্ণফুলী ইপিজেডের ভিতর দিয়ে ডাঙার চর পর্যন্ত এসে কর্ণফুলী নদী এইচডিডি পদ্ধতিতে অতিক্রম করে পদ্মা অয়েল কোম্পানির ভিতর দিয়ে ইআরএলে (ইস্টার্ন রিফাইনারি লি.) পাঠানো হবে। ট্যাংক ফার্ম থেকে ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের দুটি পৃথক পাইপলাইনের মাধ্যমে ডেলিভারি করা হবে ক্রুড অয়েল ও ডিজেল।
জানা যায়, প্রকল্পে মোট অফশোর পাইপলাইন ১৩৫ কিলোমিটার। এ ছাড়া এইচডিডি ক্রসিংয়ের অফশোর অংশ ১১ কিমিসহ মোট ১৪৬ কিমি। এ ছাড়া অনশোর পাইপলাইন ৭৪ কিমি। ১৮ ইঞ্চি ও ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপলাইন প্রায় ২২০ কিমি। এসপিএম প্রকল্পের আওতায় মহেশখালী এলাকায় স্টোরেজ ট্যাংক ও পাম্পিং ট্যাংক স্থাপন হবে তিনটি ক্রুড অয়েল (প্রতিটির নেট ধারণক্ষমতা ৫০ হাজার ঘন মিটার) এবং তিনটি ডিজেল ট্যাংক (প্রতিটির নেট ধারণক্ষমতা ৩০ হাজার ঘনমিটার)। আরও থাকবে স্কাডা, প্রধান পাম্প, বুস্টার পাম্প, জেনারেটর, মিটারিং স্টেশন, পিগিং স্টেশন, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা।
প্রকল্পের পাম্পিং স্টেশন ও ট্যাংক ফার্ম নির্মাণের জন্য মহেশখালীতে নির্বাচিত এলাকায় ভূমি উন্নয়নের কাজ প্রায় ৯৩ শতাংশ শেষ হয়েছে। স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণের কাজ চলমান আছে। এরই মধ্যে ছয়টি ট্যাংকের মেকানিক্যাল কাজ অনেকাংশে শেষ হয়েছে। কুতুবদিয়া চ্যানেল ও মাতারবাড়ী অ্যাপ্রোচ অংশে ডিপ পোচ ট্রেসিং পদ্ধতিতে চারটি পাইপলাইন নির্ধারিত গভীরতায় স্থাপনের কাজও শেষ।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বার্ষিক জ্বালানি তেল আনলোডিং ক্ষমতা হবে ৯.০ মিলিয়ন টন। ১ লাখ ২০ হাজার ডিডবিøউটি ক্রুড অয়েল ট্যাংকার ৪৮ ঘণ্টায় এবং ৭০ হাজার ডিডবিøউটি ডিজেল ট্যাংকার মাত্র ২৮ ঘণ্টায় খালাস হবে।
কালামারছড়া ইউপির চেয়ারম্যান তারেক বিন ওসমান শরীফ জানান, এসপিএম প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে এ অঞ্চলের মানুষের জীবন মান পাল্টে যাবে।