জ্বলছে বিদ্রোহের আগুন

66

ফিরিঙ্গিবাজার ওয়ার্ডে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে পোস্টার ছেড়ার অভিযোগে এক প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মারধর করে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সমর্থকরা। লালখানবাজার ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী নিজ দলের এক আওয়ামী লীগ নেতাকে নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে সরানোর আহব্বান জানিয়েছেন। পাঠানটুলি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলিতে প্রাণ হারিয়েছে একজন। এই তিন ওয়ার্ডের মতো নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ছোটখাট ঘটনা ঘটছেই। সংঘটিত এসব ঘটনার বেশিরভাগই ঘটছে সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের দ্বন্দ্বে। দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাড়তে থাকায় নির্বাচন কমিশনেও বাড়ছে অভিযোগের পাহাড়। প্রচারণা শুরুর গত ছয়দিনে সবমিলে ১২টি অভিযোগ জমা পড়েছে ইসিতে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হাসানুজ্জামান পূর্বদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনী পরিবেশ ও আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণে ১৪ জন ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে আছেন। তারা প্রতিনিয়ত নির্বাচনী পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছেন। ইতোমধ্যে প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ দিয়েছেন। এসব অভিযোগ আমরা সংশ্লিষ্ট থানায় তদন্ত করতে পাঠিয়েছি। কিছু কিছু অভিযোগে থানার পক্ষ থেকে প্রতিবেদনও দেয়া হয়েছে।’
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সাতজন মেয়র প্রার্থী, ৫৭ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও ১৭২ জন সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। এসব ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীই আছেন কমপক্ষে ৮০ জন। এরমধ্যে গত চসিক নির্বাচনে জয়ী হওয়া ১২ জন সাধারণ ও চারজন সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও আছেন। এই ১৬ ওয়ার্ডেই মূলত নির্বাচনে জমজমাট লড়াই হবে বলে ধারণা করছেন ভোটাররা। আছে সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কাও।
সংশ্লিষ্টরা জানান, যেসব ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলররা বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচন করছেন সেসব ওয়ার্ডে নির্বাচনের পরিবেশ বিনষ্টের আশঙ্কা আছে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর পর থেকে এসব ওয়ার্ডেই প্রতিনিয়ত হামলা-মামলার ঘটনা ঘটছে। ইতোমধ্যে ২৮ নং পাঠানটুলি ওয়ার্ডে ঘটেছে রক্তপাত। গোলাগুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন আজগর আলী বাবুল নামে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর এক কর্মী। নির্বাচনে আগে এমন হত্যার ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সে ওয়ার্ডের বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল কাদেরসহ ২৬ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিদ্রোহী আছে এমন ওয়ার্ডগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে এরমধ্যেই উত্তাপ ছড়িয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী আছে এমন ওয়ার্ডগুলোতে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক বিদ্রোহী প্রার্থী পূর্বদেশকে বলেন, ‘পাঠানটুলির ঘটনাটি দুঃখজনক। এ ঘটনায় আমরা যারা দলীয় প্রার্থীর বাইরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি সবার জন্য বিব্রতকর। আমরা চেয়েছিলাম নির্বাচনের সুষ্ঠূ পরিবেশ। এ ঘটনার প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন ওয়ার্ডে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দল আমাদেরকে এখন ভিন্ন চোখে দেখছে।’
ইসিতে ১২ অভিযোগ : ১০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিন থেকে আচরণবিধির ১৫ ও ১৬ ধারা ভঙ্গ করেছেন বলে অভিযোগ করেন চট্টগ্রাম নাগরিক ঐক্য পরিষদ। ১১ জানুয়ারি বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী শাহাদাত হোসেন ১৮ নং ওয়ার্ডে নির্বাচনী প্রচারণার পোস্টার ছেড়া ও গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী জনৈক মো. ফারুক ও মানিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর পক্ষে নগর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক হাসান মাহমুদ শমসের বিএনপির দলীয় কার্যালয় নসিমন ভবনের পাশে নির্বাচনী প্রচারণার পোস্টার ছেড়ার একটি অভিযোগ দিয়েছেন। এতে ডা. শাহাদাত হোসেনকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়েছে। ১১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. নুরুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অধ্যাপক মো. ইসমাইল কর্তৃক হুমকি ও নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টির প্রতিবাদ ও যথাযথ আইনগত ব্যবস্থার অভিযোগ দিয়েছেন।
১২ জানুয়ারি ১৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী মনোয়ারা বেগম প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থীর কর্মীদের বিরুদ্ধে গণসংযোগে হামলা, টাকাসহ ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাই, মহিলা কর্মীদের শ্লীলতাহানি ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ আনা হয়। তবে এ ঘটনায় সত্যতা পায়নি পুলিশ। ১৭ নং পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ডে মোহাম্মদ সোমেন খালেদ প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থী মো. শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে দলীয় প্রধানের ছবি সম্বলিত পোস্টার ছাপানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। ২৩ নং উত্তর পাঠানটুলি ওয়ার্ডে হাজী মোহা. মহসীন ধনিয়ালা পাড়ায় নির্বাচনী প্রচারণার পোস্টার ছেড়া ও কর্মী সমর্থকদের উপর হামলার অভিযোগ দিয়েছেন। ২৮ নং পাঠানটুলি ওয়ার্ডে গোলাগুলির ঘটনার আগে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল কাদের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে নির্বাচনী পোস্টার ছেড়া, গণসংযোগে বাধা ও হামলার অভিযোগ দেন। চট্টগ্রাম নাগরিক ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী কর্তৃক নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেন।
১৩ জানুয়ারি ১১ নং দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী মোরশেদ আকতার চৌধুরী প্রতিদ্ব›দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থী মো. ইসমাইলের বিরুদ্ধে প্রচারণার ব্যানার ফেস্টুন, পোস্টার, লিফলেট বিনষ্ট করার অভিযোগ তুলেন। ৬নং পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী মো. হাসান লিটন প্রতিদ্ব›দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থী আশরাফুল আলম ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে প্রচারণার সময় হ্যান্ডমাইক কেড়ে নেয়াসহ কর্মী সমর্থকদের মারধরের অভিযোগ আনেন। ১২ নং সরাইপাড়া ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী সাবের আহমদ সওদাগর প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থী নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ দেন।