জেলেদের খাদ্য সহায়তা কার পেটে যাচ্ছে?

17

 

দেশের সামুদ্রিক জলসীমায় মাছের সুষ্ঠূ প্রজনন, উৎপাদন এবং সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সাগরে মৎস্য আহরণে টানা ৬৫ দিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে সরকারের অতি দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরিতে ভারনারেবল গ্রূপ ফিডিং বা ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা হিসেবে উপকূলীয় এলাকার নিবন্ধিত ও ভিজিএফ কার্ডধারী জেলেদের অনুক‚লে চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে সরকারের খাদ্য সহায়তা পাচ্ছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ প্রকৃত জেলে। বাকি খাদ্য সহায়তা জেলে পরিচয়ে অন্য পেশার লোকদের পেটে চলে যাচ্ছে। এতে প্রকৃত জেলেরা খাদ্য সহায়তা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালী, আনোয়ারা, সন্দ্বীপ, মিরসরাই, সীতাকুন্ড, কর্ণফুলী ও মহানগরে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২৬ হাজার নয়শ’ ৯২ জন। বংশ পরম্পরায় সাগরে মাছ শিকারই তাদের একমাত্র পেশা। সমুদ্রে মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে তখন জাল বুনে ও নৌকা মেরামত করেই তাদের দিন কাটে। জাল বুনে জেলেদের সামান্য যেটুকু আয়-রোজগার হয়, তাতে তাদের সংসার চলে না। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই জেলেদের অনেকেই এসময় মহাজনদের ঋণের ফাঁদে পা বাড়ায়। কেউ একবার ঋণের ফাঁদে জড়ালে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার আর কোনও উপায় থাকে না।
নগরীর ফিশারিঘাট এলাকার জেলেপাড়ার বাসিন্দা অনিল জলদাস পূর্বদেশকে বলেন, যারা কোনও দিন এ পেশায় আসেননি তাদের নামও জেলে হিসেবে তালিকায় নিবন্ধিত হয়েছে। আবার নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে অনেকে কয়েক মৌসুম আগে পেশা ছেড়ে দিলেও তাদের নাম সরকারি তালিকায় এখনও রয়ে গেছে। এ কারণে প্রকৃত জেলেরা সরকারের খাদ্য সহায়তা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জেলেদের নামে বরাদ্দকৃত খাদ্য সহায়তা অন্য পেশার লোকজনের পেটে চলে যাচ্ছে। অথচ উপক‚লের জেলেপাড়ায় বসবাসকারী শত শত প্রকৃত জেলে পরিবার কর্মহীন অবস্থায় নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান বলেন, নিবন্ধিত ও কার্ডধারী জেলেদের জন্য যে খাদ্য সহায়তা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, তা অন্য কোনও পেশার লোকজনের মাঝে বিতরণ করার সুযোগ নেই। এবার নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে উপক‚লীয় এলাকার প্রত্যেক নিবন্ধিত ও কার্ডধারী জেলের জন্য চাল ছাড়াও প্রতিটি ইউনিয়নে আড়াই লাখ টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তাও দেয়া হয়েছে। সরকারের সহায়তা যথাযথভাবে সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জেলেদের মধ্যে এসব চাল ও অর্থ বিতরণ কার্যক্রম তদারকি করছেন। নিবন্ধিত ও কার্ডধারী জেলে ছাড়া অন্য পেশার কেউ সহায়তা পেয়ে থাকলে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত অভিযোগ করতে পারেন। মৎস্য অধিদপ্তর এ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো তদন্ত করবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এর আগে গত ১৩ এপ্রিল সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে দেশের সামুদ্রিক জলসীমায় মাছের সুষ্ঠূ প্রজনন, উৎপাদন এবং সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সামুদ্রিক মৎস্য আইন- ২০২০ অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ২০ মে থেকে আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত টানা ৬৫ দিন সামুদ্রিক জলসীমায় সব ধরনের মৎস্য আহরণের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকাকালে উপকূলীয় এলাকার নিবন্ধিত ও কার্ডধারী জেলেদের মাঝে বিতরণের জন্য চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মাধ্যমে প্রতিটি জেলে পরিবার প্রথম ধাপে চলতি বছরের ২০ মে থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত মাসিক ৪০ কেজি হারে ৪২ দিনের জন্য মোট ৫৬ কেজি চাল পাবে। গত ১২ মে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে এ সংক্রান্ত মঞ্জুরি আদেশ জারি করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। সরকারি গুদাম থেকে ১০ জুনের মধ্যে এসব চাল উত্তোলনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে সমুদ্রে মাছ আহরণ থেকে বিরত থাকা নিবন্ধিত জেলেদের মধ্যে তা বিতরণের নির্দেশনা দেয়া হয়। নিবন্ধিত ও কার্ডধারী জেলে ছাড়া অন্য কাউকে এ খাদ্য সহায়তা প্রদান করা যাবে না বলে মঞ্জুরি আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।