জেগে উঠা চর নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখছে কুতুবদিয়াবাসী

11

লিটন কুতুবী, কুতুবদিয়া

বঙ্গোপসাগরে জেগে উঠা বিশাল আকৃতির চরে উপকূলীয় বন বিভাগ কুতুবদিয়া রেঞ্জ অফিস গত ২৬ ফেব্রæয়ারি সোমবার বিকালে প্রায় তিনশত বাইন চারা পরীক্ষামূলক রোপণের মাধ্যমে বনায়নের শুভ সুচনা করেন।
উপকূলীয় বন বিভাগের কুতুবদিয়া উপজেলা রেঞ্জ অফিসার আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে কুতুবদিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. গোলাম কবির, ওসি তদন্ত কানন সরকার, বড়ঘোপ ইউপির চেয়ারম্যান আবুল কালাম, কৈয়ারবির ইউপির চেয়ারম্যান আলহাজ আজমগীর মাতবর, কুতুবদিয়া উপজেলা প্রেসক্লাব সভাপতি এস কে লিটন কুতুবী, বনকর্মীসহ অনেকেই এ চারা রোপণে অংশগ্রহণ করেন।
সাগরের ভূ-গর্বে বিলীন হয়ে যাওয়া সম্পদ ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে কুতুবদিয়া দ্বীপের মানুষ। নদী আর সাগর কূলের মানুষের চিরন্তন সত্যের বাণী ‘নদীর এ কুল ভাঙ্গে আর ঐ কুল গড়ে’ ঠিক তেমনি বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে উঠা চরের ভূ-সম্পদ ফিরিয়ে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন দ্বীপের মানুষ। দৃশ্যমান জেগে উঠা চরের চিত্রটি চোখে পড়ে পর্যটন নগরীর কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া উপকূলের পশ্চিমে। সমুদ্র তীরবর্তী কূল ভাঙলেও দ্বীপের মূল ভূখন্ড থেকে অর্ধ কিলোমিটার পশ্চিমে বিশাল চর জেগে উঠেছে। উত্তর দক্ষিণ প্রায় সাত কিলোমিটার লম্বা, পূর্ব পশ্চিম স্থান ভেদে প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার চর দৃশ্যমান। ঐ চরে প্রতিনিয়তই ক্রীড়া প্রেমিক শিশু কিশোর যুবকরা ফুটবল খেলতে যায়। দৈনিক জেলেরা মাছ ধরতে ভীড় জমায় চরে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, কুতুবদিয়া দ্বীপের উপর দিয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাসে ভূ-খন্ডের হাজার হাজার একর ভূমি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। বিগত ৫শত বছর পূর্বে বঙ্গোপসাগরে জেগে উঠা সৃষ্ট চর কুতুবদিয়া দ্বীপ নাম করণের মধ্যদিয়ে জনবসতি শুরু করে। ভূ-সম্পদ বিস্তারে ক্ষণে ক্ষণে গত শতাব্দির ৬০ দশকের দিকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে দীর্ঘ ৬ যুগ থেকে ধারাবাহিকভাবে উপকূল ভেঙে ছোট হয়ে আসছে। বিগত ১৯৩৮ সনের একটি জরীপে দেখা গেছে, কুতুবদিয়া দ্বীপের আয়তন ছিল ১২০ বর্গ কিলোমিটার। ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বর্তমানে ৪০ বর্গ কিলোমিটারে এসে ঠেকেছে। তার সাথে দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে বসবাসরত মানুষ গৃহহারা হয়ে এতদ্ব অঞ্চলের আপন ঠিকানা হারিয়ে অন্যত্রে মূল ভূ-খন্ডের উপকূলে, পাহাড়,পর্বত,সমতল অঞ্চলে মাথা গুজার ঠাই করে নিয়েছে। সাগরের সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা মানুষ বিভিন্ন পেশায় জড়িয়ে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তবে ঘূর্ণিদূর্গত কুতুবদিয়া দ্বীপের মানুষ জীবন সংগ্রামে শিক্ষার হারে জেলার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
বড়ঘোপ ইউপির চেয়ারম্যান আবুল কালাম জানান, কুতুবদিয়া দ্বীপের পশ্চিমে বসবাসরত মানুষের জীবন জীবিকা অনেকাংশেই বিধ্বংসীর মতোই। বিগত শতাব্দির ৬০ দশকের ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ¡াসে শত শত পরিবার গৃহহারা হয়ে পড়েছিল। ক্ষেত্র বিশেষে কিছু সংখ্যক পরিবারকে সেই সময়ে পূর্নবাসন করে। তারা বর্তমানে আজম কলোনী গ্রামে বসবাস করছে। তাদের ঘরবাড়ি সাগরে লন্ডভন্ড হয়েছিল। দ্বীপের পশ্চিমে দৃশ্যমান জেগে উঠা চর সরকারিভাবে উদ্ধার হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের পৈত্রিক ভিটিবাড়ি ফিরে পেতে পারে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ যেই সুপার ডাইক বেড়িবাঁধ নির্মাণের জরীপ কাজ শুরু করেছেন, এ জরীপে বিলীন হয়ে যাওয়া ভূ-সম্পদ ফিরিয়ে এনে সুপার ডাইক বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য পাউবো কর্তৃপক্ষের নিকট অনুরোধ জানান।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এডভোকেট ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দ্বীপ রক্ষা এবং সুপার ডাইক বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবির মুখে স্থানীয়, আঞ্চলিক, জাতীয় পর্যায়ে দ্বীপবাসী সংগ্রাম করলে তা বর্তমান সরকার বাস্তবায়নের লক্ষে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। মডেল হিসেবে পতেঙ্গা সৈকতের আদলে সুপার ডাইক বেড়িবাঁধ নির্মানের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ মাঠ জরীপ করে গেছেন। ইতিমধ্যে তা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে। এ মহাপরিকল্পনায় বিগত ৫০ বছরে সাগর গর্বে বিলীন হয়ে যাওয়া ভূ-সম্পদ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
সাগর গর্বে বিলীন হয়ে যাওয়া ঘরবাড়িসহ সম্পদের মালিক মোহাম্মদ মুছা জানান, বর্তমানে সাগরে জেগে উঠা চর এলাকার পাশে তাদের পৈত্রিক নিবাস ছিল। বিগত শতাব্দির ৬০ দশকের দিকে ঘূর্ণিঝড়ে তাদের ঘরবাড়ি লÐভÐ হয়ে যায়, ঐ সময়ে ভিটিসহ ভূ-সম্পদ হারিয়ে বর্তমানে বড়ঘোপ ইউনিয়নের আজম কলোনী গ্রামে পরিবার, আতœীয় স্বজন নিয়ে বসবাস করে আসছেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুতুবদিয়া উপজেলা শাখার সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, দ্বীপের পশ্চিমে হারিয়ে যাওয়া ভূমি ফিরিয়ে পেতে যাচ্ছে। জেগে উঠা চরে বন বিভাগ কতৃপক্ষ বনায়ন করলে দ্রæতগতিতে চরটি ভরাট হয়ে বিশাল আকার ধারণ করে ক্রমান্বয়ে মূল ভূখন্ডের সাথে সামিল হয়ে যেত।
কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, কুতুবদিয়ায় কর্মরত বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে জেগে উঠা চর পরিদর্শন করেন। এমনকি পরিদর্শনকালে দুই দল হয়ে ফুটবল ম্যাচ খেলেছেন। অদূর ভবিষ্যতে কুতুবদিয়া দ্বীপের মানুষের পূর্ব পুরুষের হারিয়ে যাওয়া ভূ-সম্পদ ফিরে পেতে পারে।
দুবাই প্রবাসী এনামুল হক বলেন, আরব আমিরাত দুবাই রাষ্ট্রের শেখ, রাজা, বাদশারা সেই দেশের আরব সাগরে কৃত্রিমভাবে ভরাটের মাধ্যমে চর সৃষ্টি করে দৃষ্টি নন্দন পার্ক ও বিনোদন স্পষ্ট, বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণ করে থাকে। খোদাই প্রদত্ত কুতুবদিয়া দ্বীপের পশ্চিমে প্রাকৃতিকভাবে জেগে উঠা চর কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র,মাঝারি, শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলা যেত। কুতুবদিয়া দ্বীপের পার্শ্ববর্তী মাতারবাড়িতে দেশের সর্ববৃহৎ গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপন করা হচ্ছে। সেই হিসেবে এ চর এক সময় এলাকা উন্নয়নের দুয়ারে মাইল ফলক হিসেবে দেশের বৃহৎ অর্থনৈতিক যোগান দেবে।