জীবন-সংকট

2

সুরুজদের বাড়ির সামনে নিজেদের রাস্তার ধারে প্রচুর ছোট ছোট কচুশাক জন্মে। তবে এই কচুশাক বেশি বড় হতে পারে না কখনো। একটু মাথা তুলে দাঁড়াতেই কারা যেন কেটে নিয়ে যায়। যারা নেয়তাদের কেউ সিদ্ধ করেখায়, কেউ ভাতেরসাথেওখায়। সুরুজরা খুব কমই এই কচুশাকখেতে পারে। চারদিকে বেশ অভাব। মানুষজন রাতের আঁধারে শাকপাতা তুলে নিয়ে যায়। বলার কিছু নেই। সুরুজদেরও যে অভাব নেই, তা নয়। তবে তারা দু-মুঠো ভাত অন্তত খেতে পারে। অনেকে তো তাও পারেনা।
কথাগুলো এখনকার নয়। সুরুজের ছোট বেলার। নব্বই সালের আগেকার। তার মোটামুটি এই সব স্মৃতি মনে আছে। তার মাসকালে পান্তাভাত খাওয়ার জন্য ডিমভাজি করত। তারা ঘরে চার ভাই বোনছিল। সুরুজ ছিল সবার ছোট। মা-বাবা মিলে ছয় জন। সুরুজের মাতিনটা ডিম গুলে পেঁজ-মরিচ দিয়ে ভাজি করে প্রত্যেকটাকে দুই ভাগ করে সবাইকে একভাগ করে দিত। পান্তাভাতে একটা ডিমের হাফ-পিচের বেশি কারো লাগতনা। যদি কারো বেশি কিছু লাগত-তাহলো দুই চিমটি লবণ আর একটা শুকনো পোড়া মরিচ।
এগুলো শুধু সুরুজদের পরিবারেরই ছবি ছিল না। তখন গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে এ রকম ছবি। ছোট বেলার এই সব স্মৃতি সে কয়েক বছরের জীবন যাত্রায় প্রায় ভুলেই গিয়ে ছিল। কিন্তু ২০২০ সালে এসে যে তাকে আবার সেই পুরোনো ছবির আল্পনায় ফিরে যেতে হবে সে তা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। সুরুজ মিয়া লেখাপড়া শেষ করে চট্টগ্রামের একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে ভালো চাকরি পায়। মন দিয়ে চাকরি করতে থাকে। জীবনের দিনগুলি তার রঙিন হয়ে ওঠে। মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যে তার দিন চলে যায়। হঠাৎ ২০১৮ সালের শেষের দিকে ঢাকার একটি কোম্পানি তাকে ডেকে এনে চাকরি দেয়। এখানে আসার পরে সে বিয়ের কাজটিও সেরে ফেলে। বছর ঘুরে তার ঘরে আসে এক কন্যা। কিন্তু কন্যা আসার আগেই তার চলার একমাত্র সম্বল এই চাকরিটা করোনা পরিস্থিতির কারণে চলে যায়। সব থেকে ব্যয় বহুল জীবন যাত্রার এই শহরে একটি চাকরি চলে যাওয়া যে কতটা কষ্টের, কতটা অসুবিধার, কতটা অসহায়ত্বের দিকে চলে যাওয়া তা শুধু যাদের চাকরি গেছে তারাই জানে।
প্রায় চার মাস হলো সে বেকার। কোনো কাজ নেই। শ্বশুরের বাসায় ছিল এতদিন। কিন্তু কত দিন আর সেখানে থাকা যায়। সেখানে এই দীর্ঘবাসের কারণে শ্বশুর পক্ষের প্রায় সবাই তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছে। বিষয়টা সে একবার নয়, বার বার স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে। তার নামে অনেকে অনেক কথাও বলেছে। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে থাকা আর সম্ভব নয়। শ্বশুরের বাসায় দুই-চারদিন থাকা যায়। প্রতিদিন স্ত্রীর হাজারটা প্রশ্ন শুনতে হয়, কী করবেনা করবে সে বিষয়ে। অবশেষে নিজের বাসায় সে চলে এসেছে। শ্বশুরের বাসায় মাসের পরে মাস থাকা যায় না, দেখতে সুন্দর লাগে না। বিষয়টা সবাই যে ভালোভাবে নেয়না, সুরুজ মিয়া সেটা বেশ ভালো করেই জানে। তারপরও বিভিন্ন জায়গায় সিভি জমা দেওয়া ছিল বিধায় চাকরির আশায় আশায় এই দিনগুলো সেখানে থাকা হয়। কিন্তু সবাই তো আর সব কিছু বুঝবে না।
চারদিকে তার অনেক দেনা হয়ে গেছে। কোথাও চাকরি হচ্ছে না বা কোনো কাজও পাচ্ছে না। মুদি দোকানে, ওষুধের দোকানে বাকি পড়ে আছে। ঘরভাড়া পড়ে আছে দুই মাসের। প্রতিদিন তার কিছু ওষুধ খেতে হয়। ওষুধ ছাড়াচলাযায়না। কিন্তু ওষুধ কেনার অর্থও তার কাছে নেই। ধারকরে ওষুধ কিনতে হয়।
এভাবে আর কত দিন? কোথায় কী করবে কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। প্রতিদিন সে বাইরে যায়, ঘুরে আসে; কিন্তু কোথাও কিচ্ছু হচ্ছে না। এই অভাবের দিনে যে সে একটা অটো চালাবে তারও উপায় নেই। এই শহরে কোনো গ্যারেজ মালিক তাকে একটা অটো দিতে চায় না। ছোটখাটো ব্যবসা করার জন্য হাজার দশেক টাকাও পাচ্ছে না কারো কাছে।
প্রতিদিন সকাল হয়, সূর্য ওঠে। তার জীবনেও এতদিন সূর্য ছিল, ছিল সূর্যের ঝলমলে আলো। করোনার কারণে আজ সব আলো প্রায় নিভে গেছে। পৃথিবীতে সদ্য আসা মেয়েটার মুখ খানাও সে আর প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছেনা। আজ সারা রাত বৃষ্টি হয়েছে। সকালে উঠে কয়টা ভাত রান্না করেছে। তরকারি, মাছ-মাংস কিছুই নেই। দুই-তিনটা ডিম আছে মাত্র। একটা ডিম গুলে পেঁজ-মরিচ দিয়ে সে ভাজি করল। ভাজি করার পরে মনেরই অজান্তে কড়াইতে রেখে খুনতি দিয়ে রুটিস মান ডিমটাকে মাঝখান থেকে কেটে ফেলে। ডিম দুইপিচ প্লেট ভর্তি ভাতের ওপরে নিয়ে খেতে বসে।
কিন্তু প্লেট নিয়ে বসতেই মনটা তার হঠাৎ ঘুরে গেল প্রায় ত্রিশ বছর আগের দিনগুলোর দিকে। তার মনের পর্দায় ভেসে উঠল পুরোনো ছবি। সে থমকে যায়, ভাত মাখার শক্তি হঠাৎ হারিয়ে ফেলে। সে কল্পনায় দেখতে পায়, তার মা এ রকম একটা ডিমের পুরোটা নয়, মাত্র হাফ পিচ ডিম ভাজি সকাল বেলা পাতে দিত। সাথে একটা পোড়া মরিচ আর একটু মোটা দানার কাচা লবণও থাকত। তা দিয়েই তাদের খাওয়া হয়ে যেত। এই স্মৃতির আক্রমণে আর বর্তমান দিনের নিপীড়নের কারণে সাথে সাথে সে হাফ পিচ ডিম ভাজি আর হাফ প্লেটেরও বেশি ভাত তুলে রাখে। বাকি হাফ পিচ ডিম ভাজি দিয়ে দুপুরে খাওয়া যাবে। হায়রে ভাত! এই ভাতের জন্যই তো মানুষের এত শ্রম, এত সংগ্রাম!
সুরুজ মিয়ার সংসারে গড়ে প্রতিদিন প্রায় সাতশো টাকার মতো লাগত। কিন্তু আজ সুরুজ মিয়ার একটা টাকাও সারাদিনে ইনকাম নেই। যেখানে সুরুজ মিয়ার এই করোনার চরম দিনে চাকরি নেই, হাতে অর্থ নেই, ঘরে বাজার নেই, তরকারি নেই, সেখানে পুরো একটা ডিম ভাজি দিয়ে পুরো এক প্লেট ভাত খাওয়ার সাহসও আজ তার নেই।
চাকরি হারানো লক্ষ-কোটি সুরুজ মিয়ার বুকভাঙা জীবনে জানি না কবে আবার সুদিন ফিরে আসবে এই বাংলায়?