জীবন ‘বাঁচানোর যুদ্ধে’ ‘জীবনদান’ চিরস্মরণীয়

16

‘জীবন বাঁচাতে জীবন দিয়েছে/ নিজেরা গিয়েছে মরে/পালিয়ে যায়নি যুদ্ধ করতে/ জেগেছে নতুন ভোরে’। হ্যাঁ জীবন বাঁচাতেই ‘জীবনযুদ্ধে’ নেমেছিলেন চিকিৎসকরা। তাও আবার নিজের জীবনকে একেবারে তুচ্ছ করে অন্যের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে। অণু-পরমাণুসম একরত্তি করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে সারা দুনিয়া যখন ঘরে বন্দি। তখন সামনের সারির যোদ্ধা চিকিৎসকগণ (অধিকাংশ ক্ষেত্রে) সাধারণ মানুষদেরকে বলেছিলেন ‘জীবন খুঁজে পাবি ছুটে ছুটে আয়’। পঙ্গপালের মতো মানুষ কিন্তু ছুটে এসেছিলেন এ চিকিৎসকদের কাছেই। তাবৎ বিশ্বের প্রায় সাতশ’ কোটি মানুষের বেশির ভাগ এখন হয়তো করোনা মহামারি বা মৃত্যু নিয়ে ভেবেই সময় কাটাচ্ছেন। করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ অন্তত এই একটি বিষয়ে বিশ্ববাসীকে একমতে আনতে সক্ষম হয়েছে। এর আগে সম্ভবত বিশ্ববাসী কখনও অন্তত একটা বিষয়ে এক হতে পারেননি। করোনায় সবাই এক হয়েছি, ঘরে থাকছি, পরস্পরে সহমর্মী হয়েছি, স্রষ্টাকে স্মরণ করছি।
চীনের উহানে এ ভাইরাস প্রথম বাসা বেধেঁছিল। এরপর মৃত্যুর বিভীষিকাকে সাথে করে দোর্দন্ড প্রতাপে ছড়িয়ে গেল সবখানে। এখনও শাসন করছে পুরো পৃথিবীকে। প্রাণঘাতি একটি ভাইরাস পৃথিবীময় ছড়ানোর রেকর্ড এ-ই প্রথম। এত ক্ষুদ্র এক ভাইরাস সারা দুনিয়ার মানুষকে সুনসান করে দিতে পারে- এ অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। করোনা ভাইরাসের থাবায় মানুষের জীবন থমকে দাঁড়ায়।জীবনের আলো নিভে যায় হাজারো লক্ষ মানুষের। রাস্তা, মাঠ, ঘাট, বাজার, শহর, বন্দর, গ্রামের জীবনযাত্রা থমকে যায়। জীবন চলার চিরায়ত ছন্দেও পতন আসে। সবখানে ফাঁকা। সুনসান নীরবতা। আতঙ্ক। রোগি নিয়ে ছুটোছুটি। অক্সিজেনের অভাবে পিতা-মাতার কোলেই সন্তানের মৃত্যু। সন্তানের কোলেই আবার মৃত্যুর কোলে পিতা-মাতা। অসুস্থ হলেই আক্রান্ত হওয়ার আশংকায় গর্ভধারিণী মাকে ঘর থেকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে সন্তানরা। মরে ঘরের ভেতরে পড়ে থাকা লাশের গন্ধও অমানবিকতা স্মরণ করিয়ে দেয়। চারদিক নিথর নিস্তব্দ। চিকিৎসার জন্য রাস্তায় রাস্তায় ছুটোছুটিতেই অনেক সম্ভাবনার মৃত্যু। ভুতুড়ে এক মৃত্যুপুরির পরিবেশ পরিগ্রহ করেছিল প্রকৃতি। আকাশে বাতাসে শুধু আতঙ্ক, বিচ্ছেদের সুর, শোকের বারতা, মানবতার হাহাকার ও অন্যরকম নিরবতা। কি হবে? কখন থামবে মৃত্যুর মিছিল? কবে পাব আতঙ্কহীন স্নিগ্ধ প্রভাত? এমনই এক পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা জীবনবাজি রেখেছিলেন এ জাতির জন্য। মৃত্যুর দুয়ারে বসে থেকে মৃত্যুকে তুচ্ছ করেছিলেন জীবনকে বাঁচাতে। বাঁচাতে মানুষকে। অকাতরে নিজেরা জীবন দিয়ে সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছেন জাতির যেকোনো দুর্যোগে পেছনে নয়, সামনে থেকেই লড়াই করতে হয়। এসব ডাক্তারদের ঋণ কি একজনমে শোধ করা যাবে? মৃত্যুর মিছিল, শহর নগর, জনপথ বিস্তীর্ণ ভূমিতে, চীন থেকে সেই দারুচিনি দ্বীপে। এশিয়া মাইনর ও পুষ্পিত ইরান সবকিছু যেন বিরান। ইতালি আজ মিতালী করে মৃত্যুর সাথে অনায়াসে ও সমগ্র ইউরোপ যেন প্রেতের নগরী, মৃত্যুপুরী, ভেঙে পড়ে ধীরে মানব সভ্যতা করোনা সন্ত্রাসে। পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় প্রাণঘাতি বোমা ফেলতে ওস্তাদ আমেরিকাও করোনা বোমায় কাবু।
মৃত্যু কি সহজ, কি নিঃশব্দে আসে তা দেখাল অনুসম একরত্তি করোনা ভাইরাস। ফ্রন্টলাইনার হিসেবে চিকিৎসকদের অকাতরে মৃত্যু এদেশের জন্য চট্টগ্রামের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। করোনায় মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা ডা. মাহমুদ মনোয়ার লিখেছিলেন ‘একজনের মৃত্যু মানে একটি ট্র্যাজেডি। যখন মৃত্যুর সংখ্যা লাখ ছাড়ায়, তখন তা শুধুই পরিসংখ্যান’। কতগুলো পরিবারে নেমে এসেছে স্বজন হারানোর শোকের আঁধার। কত সন্তান হলো বাবা-হারা, মা-হারা, কত মা সন্তান হারা হলেন তার হিসেব নেই।
করোনায় চট্টগ্রামেও চিকিৎকরা অকাতরে জীবন দিয়েছেন। একজন দুইজন নন। গুনে গুনে ১৫ জন। মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের পরিবার সন্তানকে তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। পরিবার-পরিজনের চেয়ে দেশের জন্য দায়িত্ববোধকে প্রাধান্য দিয়ে যারা চট্টগ্রামে প্রাণ দিয়েছেন সেসব চিকিৎসকদের অভাব কখনও পূরণ হবার নয়। উপার্জক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে ভবিষ্যত চিন্তায় অস্থির ১৫ চিকিৎসকের পরিবার। আমরা হারালাম চট্টগ্রামের মানবিক চিকিৎসকদের। রাষ্ট্র কি দায়িত্ব নেবে তাদের?
ডা. সমিরুল ইসলাম বাবু :
খবরটা অবিশ্বাস্য ছিল! চট্টগ্রামসহ সারাদেশে নামকরা অর্থোপেডিক সার্জন ডা. সমিরুল ইসলাম বাবু’র মৃত্যু সংবাদটি। গত বছরের ২৪ জুন দুপুর ২ টায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। করোনামুক্ত হওয়ার পর খানিকটা সেরে উঠায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল থেকে মেট্রোপলিটন হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল মৃত্যুর কয়েকদিন আগে। সেখানে একটি কেবিনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন ডা. সমিরুল ইসলাম। করোনা আক্রান্ত হয়ে গত বছরের ২১ মে থেকে চমেক হাসপাতালের একটি কেবিনে চিকিৎসাধীন ছিলেন ডা. সমির। অক্সিজেন সেচুরেশন কমে গেলে ২৬ মে করোনা রোগী হিসেবে চট্টগ্রামে প্রথম প্লাজমা থেরাপি দেওয়া হয় তাকে। মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষের নেতৃত্বে ঢাকার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে একটি বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করে তার চিকিৎসা দেওয়া হয়। করোনার চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত আলোচিত সবগুলো চিকিৎসাই তার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার পরও ধরে রাখা যায়নি তাকে। সৃষ্টিকর্তার ডাকেই তিনি সাড়া দেন। ভালো এবং মানবিক আচরণের জন্য চট্টগ্রামের আপামর মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন চিকিৎসক সমিরুল ইসলাম। পরিচিতজন ও আর্থিকভাবে অক্ষম মানুষের কাছ থেকে চিকিৎসা খরচ না নেয়ার বিষয়টিকে তিনি স্বভাবই করে নিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ অর্থোপেডিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সমিরুলের স্ত্রী চমেকের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুনা ইসলাম এবং দুই সন্তানও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু বাসায় চিকিৎসা নিয়ে তারা সুস্থ হয়ে যান। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পরও তিনি চিকিৎসা বন্ধ করেননি। মানুষকে বিমুখ করেননি। নিয়মিত হাসপাতালে গেছেন এবং রোগীদের সেবা দিয়েছেন। রোগীদের অস্ত্রোপচারেও অংশ নিয়েছেন। মানবিক চিকিৎসার অসংখ্য বাস্তবতার নায়ক ডাক্তার সমিরুল টাকার পেছনে ছুটলে টাকার পাহাড় হয়ে যেত। কিন্তু তিনি ছুটেছেন সুনামের দিকে।
মানবিক এ ডাক্তারের পরিবারের জন্য আমাদের অনেক কিছু করার আছে বললেন ডা. সমিরুলের বন্ধু স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান। তিনি বলেন, এরকম মানুষ হয় না। জীবনে এত মানুষের বিপদে আপদে এগিয়ে এসেছেন, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। অনেক ডাক্তার অনেক পাবো। কিন্তু এমন মানুষ পাওয়া মুশকিল। চিকিৎসাজগতে অর্থোপেডিকের ডাক্তার হিসেবে আরেকজন সমিরুল তৈরি হতে অনেক সময় লাগবে।
কবি ও সাংবাদিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেছেন ‘একজন অপরিচিত লোক কী করে প্রথম পরিচয়ে আত্মীয় হয়ে উঠতে পারে ডা. সমিরুলকে দেখে বুঝেছিলাম! চট্টগ্রামের মানুষের শোকার্ত উচ্চারণে এই চিকিৎসকের প্রকৃত চেহারাটা যেন নতুন করে দেখা হলো। মানুষের জীবনে মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী আছে! সেটা পেয়েছেন সমিরুল। বড় আক্ষেপ, চলে যাওয়ার জন্য ৫০ থেকে ৫২ বছর বয়সটা এমন সম্ভাবনাময় একটা মানুষের জন্য নেহাত অল্প সময়। বন্ধু, সহকর্মী, রোগী, ছাত্রছাত্রী সবাই তাই অঝোরে কেঁদেছেন এ মানুষটির জন্য।
সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক বেদারুল আলম চৌধুরী বেদার লিখেছেন, হাসিমুখে রোগীদের সহযোগিতার আবদার পূরণে আপনি অদ্বিতীয়ই থেকে গেলেন। রোগে-শোকে তাহলে কার কাছে যাব আমরা?
ডা. জাফর হোসেন রুমি :
গত বছরের ২৫ মে (ঈদের দিন) ভোরে চট্টগ্রামে করোনা ভাইরাসে প্রথম মৃত্যুবরণ করেন ডা. এসএম জাফর হোসেন রুমি। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যেতে না পারার আক্ষেপ বুকে নিয়ে অবশেষে চট্টগ্রামেই মারা গেলেন চিকিৎসক জাফর হোসেন রুমি (৩৪)। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যাওয়া ডা. রুমি বেশ কিছুদিন ধরে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন। শ্বাসকষ্ট থাকায় নমুনা নিয়ে করোনা পরীক্ষা করা হয় কিন্তু নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টে তার করোনা নেগেটিভ এসেছিল।
এরপরই ডা. রুমিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেয় মা ও শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ইমপ্রেস এভিয়েশনের একটি হেলিকপ্টারও ঠিক করা হয়। গত ১৭ মে হেলিকপ্টারটি রোগী নিতে হাসপাতালের নিকটবর্তী এক স্কুল মাঠে নামে। তবে বিকেলে মাঠে নামলেও রোগী না নিয়েই হেলিকপ্টারটি ফের ঢাকার উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়। করোনা নেগেটিভ আসলেও এক চিকিৎসক নেতার ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে ডা. রুমির শরীরে করোনা উপসর্গের কথা উল্লেখ করেছেন। বিষয়টি জেনে শেষ মুহূর্তে ডা. রুমিকে না নিয়েই হেলিকপ্টারটি ফিরে যায়। যার ফলে উন্নত চিকিৎসার জন্য আর ঢাকায় যাওয়া হয়নি ডা. রুমির। ঢাকায় যেতে না পারার এমন আক্ষেপ বুকে নিয়ে অবশেষে চট্টগ্রামেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। করোনা উপসর্গে মারা যাওয়া চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. জাফর হোসেন রুমির পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ডা. রুমির বাবাকে ৩ লাখ এবং স্ত্রীকে ২ লাখ এবং ভাইকে হাসপাতালের অফিস সহকারী পদে নিয়োগ দিয়েছে।
ডা. এহসানুল করিম :
করোনায় মহাজাগতিক সফরে যাত্রা করেছেন চট্টগ্রামের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এহসানুল করিম। চট্টগ্রাম মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত বছরের ৩ জুন দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৪৩ বছর। ডা. এহসানুল করিম ছিলেন কোয়ান্টাম পরিবারের একজন আন্তরিক শুভানুধ্যায়ী। বান্দরবান লামার কোয়ান্টাম ও রাজবিলা থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্যে চট্টগ্রামে পাঠানো অগণিত রোগীকে সাধ্যমতো সুচিকিৎসা দিয়েছেন তিনি। এমনও নজির আছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একজন রোগীকেই তিনি প্রায় একঘণ্টা সময় নিয়ে দেখেছেন! তিনি বøাড ক্যান্সারে (প্রোমায়েলোসাইটিক লিউকেমিয়া) ভুগছিলেন। নিজের গুরুতর অসুস্থতাকে উপেক্ষা করে একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি। এমনকি চট্টগ্রামে করোনা পরিস্থিতিতে অধিকাংশ চেম্বার ও হাসপাতাল বন্ধ থাকলেও ঝুঁকি নিয়ে চেম্বার খোলা রেখে তিনি রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছিলেন।
শিক্ষাজীবনে ডা. এহসানুল করিম বরাবরই মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চট্টগ্রামের (ইউএসটিসি) নবম ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ছিলেন এবং তার ব্যাচে চূড়ান্ত এমবিবিএস পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। মৃত্যুকালে নিজ ছাত্র ডা. নুর উদ্দিনের হাতেই ছিল ডা. এহসানের হাত। ভেন্টিলেটরযুক্ত আইসিইউ স্ক্রিন জানান দিচ্ছিল এহসানের প্রাণপ্রদীপের শেষ সিগন্যাল। নিভে যাওয়ার আগ-মুহুর্তেও ছাত্রের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। ছাত্রকে বলেছেন, পাশে থাকতে। যেন তার যন্ত্রণাহীন মৃত্যু নিশ্চিত হয়। এই কথা বলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন চট্টগ্রামের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এহসানুল করিম।
ডা. মফিদুল হাসান :
গত বছরের ৪ জুন সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডা. মহিদুল হাসানের মৃত্যু হয়। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার ছিলেন। ঈদের পরে করোনা শনাক্ত হয়ে চিকিৎসক মহিদুল হাসান আমাদের হাসপাতালের কেবিনে ভর্তি হয়েছিলেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস ৩০তম ব্যাচের স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ছিলেন ডা. মহিদুল হাসান। তিনি কর্মজীবনে একজন সৎ, অমায়িক, দক্ষ এবং কর্তব্যপরায়ণ কর্মকর্তা হিসেবে সমাদৃত ছিলেন। জাতির ক্রান্তিলগ্নে করোনা যোদ্ধা ডা. মহিদুল হাসান এর আত্মত্যাগের উদাহরণ হয়ে থাকবে চিরদিন। তার স্ত্রী ও দুই কন্যা সন্তান রয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৪১তম ব্যাচের ছাত্র।
ডা. আরিফ হাসান :
করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে গত বছরের ১২ জুন রাত সাড়ে ৯ টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে ডা. আরিফ হাসান মারা যান। ডা. আরিফ হাসান ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৪৯ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। এক সপ্তাহ ধরে ডা. আরিফ জ্বরে ভুগছিলেন। নগরীর লাভলেইন আবেদীন কলোনিতে তিনি পরিবারের সাথে থাকতেন। পাহাড়তলী এলাকায় প্রাইভেট প্র্যাকটিশনার ছিলেন। মেধাবি এ চিকিৎসক করোনাকালে সেবা দিয়েছেন অবারিতভাবে। নিজের জীবনের চিন্তা মাথায় না রেখে রেখেছেন রোগীদের চিন্তা। সম্ভাবনাময় এ চিকিৎসকের শূন্যতা কিভাবে পূরণ হবে?
ডা. সাদেকুর রহমান :
প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকদের মৃত্যু মিছিলে যোগ হয় ডা. সাদেকুর রহমানের নাম। প্রতিদিনই এ সারিতে নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন করোনা যুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধা চিকিৎসকরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ১৭তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. সাদেকুর রহমান। গত বছরের ১৪ জুন ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ডা. সাদেকুর রহমান চট্টগ্রামের জেমিসন রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালের সনোলজিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন।
ডা. নুরুল হক :
মেট্রোপলিটন হাসপাতালের চিকিৎসক নুরুল হক। গত ১৯ বছর ধরে চট্টগ্রামের সাংবাদিকদের পরম বন্ধু হয়ে সবসময় পাশে ছিলেন। মহামারি করোনায় চলে গেলেন তিনিও। গত বছরের ১৭ জুন ভোরে নিজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ডা. নুরুল হক। ৪৪ বছর বয়সী এই চিকিৎসকের বাড়ি কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায়। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। ১৯ বছর ধরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। করোনা পরিস্থিতি শুরুর পর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি অন্তত ২০ রোগীকে সেবা দেন ডা. নূরুল হক। সেখান থেকেই করোনা পজিটিভ হন বলে অসুস্থতার সময় ডা নূরুল হক নিজেই আশংকার কথা জানিয়েছিলেন।
নূরুল হকের স্ত্রী, ৫ বছর বয়সী ও আড়াই বছর বয়সী সন্তান ছাড়াও মা, এক ভাই ও ৫ বোন রয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৩৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. নুরুল হক মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম দৈয়ার পাড়ার সন্তান। বর্তমানে তিনি কক্সবাজারের উত্তর আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা। মানবিক চিকিৎসক হিসেবে ডা. সমিরুল ইসলাম বাবুর মতো ডা. নুরুল হকের সুনাম ছিল সর্বত্র। তাঁর শূন্যস্থান পূরণ হবার নয় বললেন সহকর্মীরা।
ডা. ললিত কুমার দত্ত :
করোনা যুদ্ধে হার মানলেন প্রখ্যাত ইএনটি বিশেষজ্ঞ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. ললিত কুমার দত্ত। গত বছরের ২১ জুন রাত ১১ টায় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মারা যাওয়ার পর তাকে সৎকারের আগে তাকে গার্ড অব অনার দেয়া হয়। তার মরদেহ যথাযোগ্য মর্যাদায় সৎকারের ব্যবস্থা করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম সেন্টারের দাফন টিম। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ ডা. ললিত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী। তার পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গহিরা এলাকায়। তিনি নগরীর সদরঘাট থানার দক্ষিণ নালাপাড়া এলাকায় থাকতেন।
ডা. শহীদুল আনোয়ার :
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. শহীদুল আনোয়ার। গত বছরের ২৪ জুন রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। চট্টগ্রাম আই ইনফার্মারির সাবেক এ চিকিৎসককে প্লাজমা থেরাপি দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। ডা. শহীদুল চান্দগাঁওয়ে বণি হাসান চক্ষু হাসপাতালের কনসালটেন্ট ছিলেন। নগরের জামালখান এলাকায় ব্যক্তিগত চেম্বারেও রোগী দেখতেন। তাকে দাফন করা হয় ফটিকছড়ির গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী।
তার ছেলে আব্দুল আহাদ জানান, ‘একমাসের বেশি সময় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন আব্বা। এ একমাস শত চেষ্টা করেও বাবার করোনা টেস্ট করতে পারিনি। দেশের একজন স্বনামধন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞ হয়েও তিনি যথাযথ চিকিৎসা পাননি’।
ডা. মোহাম্মদ হোসেন :
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) অবসরপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার ডা. মোহাম্মদ হোসেন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান গত বছরের ২৬ জুন রাত ১১ টায়। অবসর নেয়ার পর নগরীর ষোলশহরে জেনারেল প্র্যাকটিশনার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন ডা. মোহাম্মদ হোসেন। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ১৭তম ব্যাচেরশিক্ষার্থী।
ডা. সুলতানা লতিফা জামান আইরিন :
গত বছরের ১৪ জুলাই করোনায় মারা যান আরেক সম্মুখসারির যোদ্ধা চিকিৎসক সুলতানা লতিফা জামান আইরিন (৩৪)। আইরিন চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের রেজিস্ট্রার ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রামের সাংগঠনিক সম্পাদক মইজ্জুল আকবরের স্ত্রী। এই দম্পতির একটি মেয়ে সন্তান রয়েছে। কোভিড-১৯ পজিটিভ হওয়ার পর আইরিন বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। আইরিন চমেকে উচ্চতর কোর্সে পড়াশোনা করছিলেন বলে জানা গেছে। চিকিৎসক ও মানুষ হিসেবে ডা. আইরিন ছিলেন সদা দায়িত্বপ্রবণ। মানুষের প্রতি মমত্ববোধের বিষয়টি ছিল তার মাঝে। তাকে হারিয়ে একমাত্র ফুটফুটে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় আছেন তার পরিবার।
ডা. মৌসুমী রায় :
করোনা সংক্রমণ পরবর্তী জটিলতায় মারা গেছেন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের এমএস (গাইনি) ফেজ ‘বি’ পরীক্ষার্থী ডা. মৌসুমি রায়। গত বছরের ৫ নভেম্বর মারা যান তিনি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (সিএমসি) থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করা ডা. মৌসুমি রায় ছিলেন সিএমসির ৪৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। পরে ৩৩তম বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি।
ডা. কাউসার আহমদ মজুমদার :
বিশিষ্ট এনেসথেশিওলজিস্ট ও চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতালের ডেপুটি সিএমও ডা. কাউসার আহমদ মজুমদার মারা যান করোনা ভাইরাস সংক্রমণে। গত বছরের ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম পার্কভিউ হাসপাতালে তিনি মারা যান। ডা. কাউসার আহমদ মজুমদার সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ (সিওমেক) থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। তিনি ছিলেন চমেকের ২৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তার পুরো পরিবারও কোভিড আক্রান্ত ছিলেন। চাঁদপুরের কচুয়ায় জন্ম বিশিষ্ট এ চিকিৎসকের।
ডা. হাসান মুরাদ :
করোনায় আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে মৃত্যুবরণ করেন ডা. মোহাম্মদ হাসান মুরাদ। গত বছরের ২১ ডিসেম্বর ভোরে পার্কভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) কোভিড শনাক্তকরণ আরটিপিসিআর ল্যাবের এ চিকিৎসক। গরীবের ডাক্তারখ্যাত মোহাম্মদ হাসান মুরাদের মৃত্যু নিয়ে পার্কভিউ হাসপাতালের এমডি ডা. রেজাউল করিম জানান, বেশ কয়েকদিন ধরে তিনি পার্কভিউ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাঁকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেয়া হয়। চমেকের আরটিপিসিআর ল্যাবে দায়িত্বরত ছিলেন ডা. হাসান মুরাদ। এছাড়া তিনি মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রভাষকও ছিলেন।
তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৩৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের আরটি-পিসিআর ল্যাবে (করোনা পরীক্ষাগার) কর্মরত ডা. হাসান মুরাদ মারা (৪৬) গেছেন। গত ২০ ডিসেম্বর (রবিবার) দিবাগত রাত চারটার দিকে বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ডা. হাসান মুরাদ সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মওলা পাড়ার নুরু মাস্টার বাড়ির আবদুল মোনাফের সন্তান। আক্রান্ত হওয়ার পর কোভিড জীবাণু তাঁর মস্তিষ্কের কোষে বাসা বাঁধে। ফলে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তিনিই চট্টগ্রামে কোভিড অ্যানসিফেলোপ্যাথি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতুবরণকারী প্রথম রোগী।
ডা. নজরুল হক :
চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. নজরুল হক (৬২) করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ১৯তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন ডা. নজরুল হক। গত বছরের ২০ জুলাই তিনি মারা যান।