জালে ধরা পড়ছে ইলিশ তবুও কমছে না দাম

118

সমুদ্রে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে রূপালি ইলিশ। এতে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আড়ৎ ও খুচরা বাজারে বেড়েছে ইলিশের সরবরাহ। ফলে ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁক-ডাক ও দর কষাকষিতে প্রতিদিন মুখর হচ্ছে ইলিশের বাজার। পর্যাপ্ত ইলিশ মাছ ধরা পড়লেও হাজার টাকার নিচে নামছে না দাম।
খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, ঢাকাসহ উত্তরবঙ্গের আড়তদাররা বেশি দামে ইলিশ কিনে নিয়ে যাওয়ায় চাপ পড়েছে বন্দরনগরীতে। ফলে খুচরা বাজারে মাঝারি সাইজের ইলিশ কিনতে হচ্ছে প্রতি কেজি এক হাজার টাকার উপর।
কিন্তু জেলেদের দাবি, খরচের তুলনায় জালে পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়ছে না, তাই দাম একটু বেশি। গতকাল সোমবার ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ফিশারিঘাট এলাকায় অবস্থান করে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
সরেজমিন দেখা যায়, ২০ থেকে ২৫টি ইলিশ এবং লইট্টা মাছ ভর্তি ট্রলার আসে চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটে। যার মধ্যে লইট্টা মাছের ট্রাক হবে ১৫ থেকে ১৮টি, বাকিগুলো ইলিশের। যেখানে দেখা মেলে বিভিন্ন সাইজের রূপালী ইলিশের। প্রত্যেকটির ওজন হবে সাতশ গ্রাম থেকে দুই কেজি একশ গ্রাম পর্যন্ত।
প্রত্যেক ট্রলারের ইলিশগুলো ঠেলাগাড়ির মাধ্যমে নিয়ে আসা হয় মূল বাজারে। সেখানেই বিভিন্ন সাইজের ইলিশ ভাগ করা হয়। আর সাইজ অনুযায়ী নির্ধারিত হয় ইলিশের দাম।
গতকাল পাইকারি বাজারে সাইজ অনুযায়ী প্রতি মণ ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৪ হাজার থেকে ৩২ হাজার টাকায়। যা প্রতি কেজিতে দাঁড়ায় ৩৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত। সুতরাং খুচরা পর্যায়ে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকারও বেশি।
সমুদ্র থেকে ইলিশ নিয়ে আসা কয়েকজন জেলের সাথে কথা বলে জানা যায়, ছয় থেকে নয়দিনের জন্য ইলিশ ধরতে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করতে হয় তাদের। কিন্তু ট্রলারে খাবার এবং জ্বালানি খরচে চলে যায় প্রায় দুই লাখ টাকার উপর। সে তুলনায় মাছ ধরা পড়ে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পরিমাণের। মাঝে মাঝে এমনও দিন যায় সমুদ্রে ইলিশ মাছ না পাওয়ায় খালি হাতে ফিরতে হয়। পরের বার গেলে আবার সেটি বিক্রি করে পুষিয়ে নিতে হয়।
জেলে মো. দিদার হোসেন (৪৫) পূর্বদেশকে বলেন, পাঁচ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করলে তিন লাখ টাকা চলে যায় জ্বালানিতে। বাকিগুলো দিয়ে কোনভাবে টেনে নিতে হয়। আবার যদি পর্যাপ্ত মাছ পাই, তাহলে পুষিয়ে নিতে পারি। তবে এখন ইলিশের মৌসুম চলছে, আমরা আগামীকাল (মঙ্গলবার) আবার সমুদ্রে চলে যাবো। বেশি মাছ ধরতে পারলে ততদিনে দাম আরও কমবে।
আরেক জেলে মো. মিজান (২৫) বলেন, ফিশারিঘাটে যেদিন ইলিশের ট্রলার বেশি আসবে, সেদিন দাম থাকবে কম। আবার যেদিন কম আসবে, সেদিন হবে বেশি। এইতো গত দুই দিন আগে প্রতি মণ মাঝারি সাইজের ইলিশ ১২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু সেগুলো বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেছে পাঁচ থেকে ছয়শ টাকা কেজিতে।
এদিকে সরবরাহ বাড়লেও তুলনামূলক ইলিশের বাজার চড়া। আবার পাইকারি ও খুচরা বাজারে দামে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। পাইকারি বাজারে ছোট ইলিশ ৬০০ টাকা, বড় ইলিশ ১৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে দ্বিগুণ দামে। অথচ ট্রলার থেকে নামানোর পরে ছোট ইলিশের দাম পড়ে ২০০ থেকে ২২০ টাকা, আর বড়গুলো ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি।
কয়েকজন জেলে অভিযোগ করে বলেন, অতিরিক্ত মুনাফার জন্য ফিশারিঘাটের বড় বড় ব্যবসায়ীরা দাম ধরে রাখছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো, তা নয়। আবার ঢাকাসহ উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীরা ইলিশ মাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছে বিধায় চট্টগ্রামে ইলিশের দাম বেশি।
ইলিশ ব্যবসায়ী ছালেহ আহমদ বলেন, সমুদ্রে যদি তুফান থাকে, তখন মাছ তো পাব না। এখানে আমরা কেন মাছের দাম ধরে রাখবো? আমরা তো চাই মাছ জালে ধরা পড়ুক। অনেক সময় ক্রেতাদের চাহিদা থাকার পরও দিতে পারছি না। কারণ ট্রলারে যদি ইলিশ ধরা না পড়ে, সেখানে ব্যবসায়ীদের দোষ কোথায়? তবে আমরা চেষ্টা করি পদ্মা নদীর ইলিশ কিনে এনে বাজারের চাহিদা মেটাতে। কিন্তু পদ্মার ইলিশ তো সমুদ্রের ইলিশের চেয়ে তিনগুণ বেশি দামে কিনতে হয়। ধরুন, কিছুক্ষণ আগে পদ্মার ইলিশ কিনেছি (আটশ-নয়শ গ্রাম সাইজের) ৩৮ হাজার টাকা দিয়ে প্রতি মণ। আবার দুই হাজার টাকা লাভে তা বিক্রি করলাম ৪০ হাজার টাকায়। তেমনি দুই কেজি একশ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৭০ হাজার টাকা দিয়ে কিনে ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে বিক্রি করলাম। তাহলে সমুদ্রের ইলিশ পর্যাপ্ত থাকলে তো পদ্মার ইলিশ বিক্রি করতাম না।
সোনালী যান্ত্রিক মৎস্য শিল্প সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবুল সরকার বলেন, ফিশারিঘাটে ইলিশ মাছই নেই। ইলিশ থাকলে দাম বাড়তো না। আর আমরাও চাই সাধারণের হাতের নাগালে চলে আসুক দাম। ট্রলার থেকে ইলিশ নামানোর পর পাইকাররা কিনে নিয়ে যান, তারপর তারা বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করেন।
উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীরা ইলিশ নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের মত ঢাকাসহ অন্যান্য এলাকা থেকে মৎস্য ব্যবসায়ীরা আসেন। তাদের কাছেও একই নিয়মে ইলিশ বিক্রি করা হয়। যদি উত্তরবঙ্গের ব্যবসায়ীরা বেশি ইলিশ নিয়ে যান, তাহলে চট্টগ্রামে ইলিশ একটু কম পাওয়া যাবে। এতে সমবায় সমিতির হাত নেই।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মুমিনুল হক বলেন, গত ১৫ দিন ধরে প্রবল বর্ষণ ও সৃষ্ট বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন পুকুর ডুবে যায়। ফলে মিঠা পানির মাছের কৃত্রিম সংকট দেখা গেছে। এতে চাপটা পড়েছে সামুদ্রিক মাছের উপর। তাই ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের দাম একটু বেশি।
তিনি আরও বলেন, জেলেরা যখন সমুদ্রে যান, এরপর তারা ১০ থেকে ১২ দিন পর ঘাটে ফিরেন। তারা সবাই যদি চলে আসেন, তখন দেখা যাবে ইলিশের দাম কমে গেছে। আশা করি, দুই-চারদিনের মধ্যে মধ্যবিত্তের হাতের নাগালে চলে আসবে ইলিশের দাম। তবে অন্য ব্যবসায়ীরা জানান, সামনের পূর্ণিমার জোয়ারকে কেন্দ্র করে ইলিশ আরও বেশি আসবে বলে তারা আশা করছেন।